ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর ২০১৯, ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
২১ °সে


গ্রাফিতি :প্রতিবাদের অনন্য ভাষা

গ্রাফিতি :প্রতিবাদের অনন্য ভাষা
ফাইল ছবি

আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের আন্দোলনের পর আপাতত বুয়েট এখন শান্ত। গতকাল শুক্রবার ছুটির দিন সকালটা যেন আরো বেশি নির্জন। পথচলতি মানষ আর বুয়েটের দুই-একজন শিক্ষার্থী ছাড়া কোথাও কেউ নেই। শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নেই, নেই সেই স্লোগান; কিন্তু দেওয়াল ঢেকে গেছে স্লোগানে স্লোগানে। রয়েছে দেওয়াল অঙ্কন বা গ্রাফিতি। তিতুমীর হলের দেওয়াল, বুয়েটে প্রবেশপথের ডান দিকের দেওয়াল, ক্যাফেটেরিয়ার দেওয়ালগুলো ঢেকে গেছে প্রতিবাদের স্লোগানে। শিক্ষার্থীদের তীব্র চিত্কার নেই, কিন্তু চত্বর জড়ে সুতীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছে এই গ্রাফিতি, দেওয়াললিখন।

সমসাময়িক গ্রাফিতি প্রধানত হিপহপ দ্বারা প্রভাবিত। হিপহপ ধারা হচ্ছে সমকালীন ঘটনা, সংঘাত এবং বৈপরীত্যের বিপরীতে তরুণদের গানে গানে প্রতিবাদ কিংবা সেই বৈষম্যের জীবনকে মানুষের সামনে গানে গানে তুলে ধরা। গানের সেই হিপহপ ধারণাকেই শিল্পীরা তুলে এনেছেন নগরীর দেওয়াল ক্যানভাসে। বাংলাদেশেও ‘সুবোধ’-এর গ্রাফিতি দিয়েই তার যাত্রা শুরু হতে দেখা যায়। বুয়েটের দেওয়ালে সেই গ্রাফিতি ভিন্ন মাত্রা নিয়ে উঠে এসেছে।

দেওয়ালে স্লোগান লেখার এক দীর্ঘ সংস্কৃতি রয়েছে বাংলার। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে স্বাধিকার ও স্বাধীনতার আন্দোলন, পরবর্তীকালে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও রাজনৈতিক স্লোগানে রাস্তার পাশের দেওয়ালগুলো ঢেকে গেছে। বাংলায় এই দেওয়াললিখনকে কথ্য ভাষায় বলা হয় চিকা মারা। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে দেওয়াললিখনে নিষেধাজ্ঞা ছিল। সেই নিষেধাজ্ঞার কারণেই রাতের বেলায় লুকিয়ে দেওয়ালে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক সেই সব স্লোগান লেখা হতো। জিগা গাছের ডাল কিংবা খেজুরের ডাল থেঁতলে নিয়ে আলকাতরা দিয়ে লেখা হতো সেই সব স্লোগান। এমন কথা চালু আছে, হঠাত্ পুলিশের নজরে পড়ে গেলে যে রাজনৈতিক কর্মীরা দেওয়াল লিখছিলেন, তারাই ডাল দিয়ে দেওয়ালে বাড়ি দিতেন। পুলিশ জিগ্যেস করলে বলা হতো, বাড়িতে চিকার উপদ্রব বেড়ে গেছে, তাই মারার জন্য লাঠি নিয়ে বাইরে এসেছেন তারা। সম্ভবত চিকা মারা নামটির উত্পত্তি সেখান থেকেই।

বিভিন্ন সময়েই রাজনৈতিক বক্তব্য, নির্বাচনী প্রচার, ধর্মীয় বাণী, মিছিলের স্লোগান থেকে শুরু করে কবিতা অথবা ব্যক্তিগত কষ্টের কথা তুলে ধরা হয় এই দেওয়াললিখনে। ‘এখন যৌবন যার, মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’—এমনি রাজনৈতিক স্লোগানের পাশাপাশি সমসাময়িক রাজনীতি ও মানুষের অধিকারের কথা উঠে আসে দেওয়ালে দেওয়ালে। রাজধানীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়ালগুলো এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়াল ছিল এই রাজনৈতিক স্লোগান লেখার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়ালটি এখন আর নেই। এসব স্লোগানে সমসাময়িক রাজনৈতিক দাবি, মানুষের চাহিদা এবং ক্ষোভ ও বঞ্চনার ঝাঁজালো উচ্চারণ মানুষকে আকর্ষণ করত। সেই সঙ্গে রেখার নান্দনিকতাও খুব দৃষ্টিনন্দন বিষয় ছিল।

দেওয়াললিখনের পর বিশ্ব জুড়েই এখন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে দেওয়াল অঙ্কন বা গ্রাফিতি। গ্রাফিতি এখন কাউন্টার-কালচারের নাম। এই শিল্পীদের কাছে পথিবীর সব দেওয়ালই একেকটা ক্যানভাস। প্রচলিত নীতি বা সিদ্ধান্তের শৈল্পিক প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে চলমান ইস্যুকে সবার নজরে আনতে গ্রাফিতির বড়ো ভূমিকা রয়েছে। সময়ের গতি-প্রকৃতিকে পরিহাস করা একেকটা গ্রাফিতি যেন শহরের শরীরে খোদাই করা একেকেটা প্রতিবাদী শিল্পকর্ম। এই কারিগরদের অনেক দেশে বলা হয় ‘গেরিলা আর্টিস্ট’। গেরিলা যোদ্ধাদের মতো তাদেরও ঝোপ বুঝে কোপ মারতে হয়। রাতের আঁধারে টার্গেট করা দেওয়ালের গায়ে আর্টওয়ার্ক সাঁটিয়ে দিয়েই চম্পট দিতে ওস্তাদ এই শিল্পীরা।

গ্রাফিতি ইটালিয়ান শব্দ, যার অর্থ ‘খচিত’। গ্রাফিতি শব্দটি শিলালিপি, ছবি আঁকা এবং এ ধরনের শিল্পকেই বোঝায়। প্রাচীন সমাধি বা ধ্বংসাবশেষের দেওয়ালের মধ্যে এই গ্রাফিতি খুঁজে পাওয়া যায়। গ্রাফিতি হচ্ছে দেওয়ালে বা যে কোনো সারফেসে আঁকা কোনো চিত্র, যার বিষয়বস্তু থাকবে সহজ ও একমুখী; কিন্তু বোধটা থাকবে জোরালো, যা মানুষকে নাড়া দেবে। মানুষকে সহজেই আলোড়িত করবে।

দেওয়ালে চিকা মারার পাশাপাশি বাংলাদেশেও গ্রাফিতি কিছু কিছু চোখে পড়ছে। বাংলাদেশে ২০১৭ সালের দিকে আলোচনায় আসে সুবোধের গ্রাফিতি। আগারগাঁও এবং মিরপুরের কয়েকটি দেওয়ালে ‘সুবোধ’-এর গ্রাফিতি মানুষের নজরে আসে। এই দেওয়ালচিত্রগুলোর একমাত্র চরিত্র ছিল ‘সুবোধ’। এর সব কটিতে লেখা ছিল :‘সুবোধ তুই পালিয়ে যা, এখন সময় পক্ষে না’। ‘সুবোধ তুই পালিয়ে যা, মানুষ ভালোবাসতে ভুলে গেছে’। ‘সুবোধ তুই পালিয়ে যা, তোর ভাগ্যে কিছু নেই’। ‘সুবোধ এখন জেলে, পাপবোধ নিশ্চিন্তে বাস করছে মানুষের মনে’। সেই দেওয়ালচিত্রের লোগো হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে ‘হবেকি’ শব্দটি। ‘সুবোধ’-এর এই দেওয়ালচিত্র অনেক মানুষের আগ্রহের বিষয়ে পরিণত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকেও ছড়িয়ে পড়েছিল এই চিত্রগুলো।

কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এখনো এর সম্পর্কে কেউ কিছু জানেনি। কে এই সুবোধ? কারা আঁকল? কেন আঁকল? গ্রাফিতির চরিত্র এটাই, তারা নিজেদের প্রকাশ করবে না, কিন্তু মানুষকে ভাবতে প্রশ্ন ও চিন্তা ছুড়ে দেবে।

আরো পড়ুন : বাবরি মসজিদ: ভূমির ‘দাবি ছাড়তে প্রস্তুত’ সুন্নি ওয়াকফ বোর্ড

এর পরের বছরই কাকলীর ওভারপাসের পাশের দেওয়ালে ‘সুবোধ’ সিরিজের নতুন দেওয়াললিখন চোখে পড়ে ‘লাল-সবুজই শেষ সম্বল’। সাদা দেওয়ালের জমিনে প্রাচীরের ক্যানভাসে আঁকা বিষাদগ্রস্ত এক কিশোরীর অবয়ব। নকশাদার ফ্রেমে বাঁধানো লাল-সবুজ পতাকা। পতাকার গায়ে খুব হালকা কালো ছায়া পড়েছে। কিশোরী ফ্রেমসহ সেই পতাকা বুকে আঁকড়ে ধরে আছে পরম মমতায়। ছবির পাশে লেখা ‘দিস ইজ মাই মাস্টারপিস’। কোনো রাজনৈতিক কিংবা সামাজিক বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার শিল্পিত একটা মাধ্যম হিসেবে গ্রাফিতি অনেক দেশেই সমাদৃত।

গ্রাফিতি হলো জনসাধারণের অভিমতকে শিল্পিত উপায়ে দেওয়ালের ওপরে লেখনী কিংবা অঙ্কনের মাধ্যমে তুলে ধরা। স্প্রে পেইন্ট বা মার্কার পেন গ্রাফিতি তৈরির প্রদান উপকরণ। আমাদের দেশে গ্রাফিতি করতে স্টেনসিল ও পেইন্ট ব্যবহার করা হচ্ছে।

অনেক গ্রাফিতিশিল্পী তাদের পরিচয় গোপন করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। বাংসি হলেন সর্বজনবিদিত ও বিখ্যাত একজন পথগ্রাফিতিশিল্পী, যিনি আজও জনসাধারণের কাছে অজ্ঞাত। তিনি ইংল্যান্ডের ব্রিস্টলে রাজনৈতিক ও যুদ্ধবিরোধী গ্রাফিতির জন্য বিখ্যাত। কিন্তু তার গ্রাফিতি লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে প্যালেস্টাইন সর্বত্র দেখা যায়। বাংসি শৈল্পিক আন্দোলনের জন্য সর্বজনস্বীকৃত এবং পরিচয় গোপন করেন গ্রেফতার এড়ানোর জন্য।

গ্রাফিতির পূর্বাপর

রোম ও পম্পেই নগরীর সমাধিসৌধের দেওয়াল ও ধ্বংসাবশেষে গ্রাফিতির অস্তিত্বের প্রমাণ মিলেছে বলে ইতিহাসবিদেরা উল্লেখ করেছেন। দক্ষিণ সিরিয়া, পূর্ব জর্ডান ও উত্তর সৌদি আরবে শিলা ও পাথরের ওপর কিছু লেখা পাওয়া গেছে স্যাফাইটিক ভাষায় এবং ধারণা করা হয়, এই স্যাফাইটিক ভাষার উত্পত্তি গ্রাফিতি থেকে। প্রাচীন গ্রিক নগরী এফেসাসেই আধুনিক গ্রাফিতির উদ্ভব এবং সেখানে গ্রাফিতি বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করা হতো। বর্তমান সমাজের চেয়ে প্রাচীন সমাজের গ্রাফিতিগুলো আরো বেশি অর্থপূর্ণ এবং ভিন্ন ভিন্ন ধারায় বহমান ছিল। প্রাচীন গ্রাফিতিগুলো ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ, সামাজিক ও রাজনৈতিক চিন্তাভাবনার প্রতিফলন ঘটাত।

ইত্তেফাক/ইউবি

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
২১ নভেম্বর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন