পারিপার্শ্বিক কারণেই শিশুরা অপরাধে জড়ায়: বিচারপতি ইমান আলী

আপডেট : ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৯:২৮

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলী বলেছেন, শিশুরা অপরাধী হয়ে জন্মায় না। পারিপার্শ্বিক কারণেই অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। এর জন্য কে দায়ী সেটা খতিয়ে দেখা উচিত। তিনি বলেন, যাদেরকে নিয়ে আমরা কাজ করতে যাচ্ছি বা করছি তারা হচ্ছে শিশু। শিশুরা সবসময় নিষ্পাপ ও অবুঝ হয়। চিন্তাভাবনা নিয়ে কোনো কাজ করে না। এগুলো আমাদের সবসময় বিবেচনায় রাখতে হবে।

শনিবার ‘ডাইভারশন ফ্রম দ্য পুলিশ স্টেশন আন্ডার দ্যা চিলড্রেন অ্যাক্ট, ২০১৩’ শীর্ষক কর্মশালায় অংশ নেওয়া পুলিশ সদস্য ও সমাজসেবা কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বিচারপতি ইমান আলী এ কথা বলেন। সুপ্রিম কোর্ট মিলনায়তনে সুপ্রিম কোর্ট স্পেশাল কমিটি ফর চাইল্ড রাইটস ও ইউনিসেফ যৌথভাবে এ কর্মশালার আয়োজন করে। এতে ডিএমপির সকল জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার ও সংশ্লিষ্ট থানার শিশু বিষয়ক পুলিশ কর্মকর্তারা অংশ নেন।

বিচারপতি ইমান আলী বলেন, যখন ক্ষুধা লাগে তখনই একটা শিশু খাবার চুরি করে। আর মোবাইল চুরি করে কেন? তার বন্ধুর সঙ্গে মোবাইলে কথা বলার জন্য নয়। মোবাইল চুরি করে সেটা বিক্রি করে যে টাকাটা পাবে সেটা দিয়ে প্রয়োজনীয় কিছু একটা কিনবে। কারণ সেই জিনিসটা তার মা-বাবা তাকে দিতে পারেনি। মা-বাবা শিশুর চাহিদা পূরণ বা ঠিকমত পরিচর্যা করতে পারে না বলেই অনেক সময় তারা খারাপ পথে চলে যায়। মা-বাবা কেন পারে না সেটাও চিন্তার বিষয়। গরিব মা-বাবা যে টাকা রোজগার করে, সেটা দিয়ে সংসারই চলে না। ফলে শিশুর বিলাসিতা দেখার মতো ক্ষমতা তাদের নেই। আমাদের সমাজব্যবস্থা এমন যে, মা-বাবা তাদের সন্তানদের ঠিকমতো দেখাশুনা করার ব্যবস্থাই নাই। সেজন্য এসব মা-বাবার জন্য কর্মসংস্থান করে দিতে হবে। আদতে শিশুরা এই খারাপ কাজ বা খারাপ ব্যবহারের জন্য দায়ী নয়। তিনি বলেন, শিশুরা মারামারি করে কারণ তাদের পরিবারের মধ্যে মারামারি হয় বলে এটাকে সে জীবনের অংশ হিসেবে মেনে নেয়। যে ঘরে দৈনন্দিন মারামারি হয়, সেই ঘরের শিশুটি বড় হচ্ছে মারামারি দেখতে দেখতে। মারামারি তাদের জন্য কিছুই না। তাই আমাদের কাজটা হচ্ছে শিশুদেরকে কিভাবে ভালো পথে নিয়ে আসব, কি করলে ভালো হবে, এগুলো নিয়ে চিন্তা করা।

আরো পড়ুন: টেক্সাসে বন্দুকধারীর হামলায় ৫ জন নিহত

বিচারপতি ইমান আলী বলেন, আমি নিউজিল্যান্ডে গিয়েছিলাম সে দেশের শিশু বিচার ব্যবস্থা দেখার জন্য, তখন আমাকে বলা হয়েছিল যে, থানা থেকেই তারা ৭০ থেকে ৭৫ ভাগ শিশুকে আসামি না করে মামলা থেকে বাদ দিয়ে দেয়। ১০০ থেকে ৭৫ জন চলে গেলে মাত্র ২৫ জন কোর্টে যাবে। কোর্টে যাওয়ার পরে সেখান থেকে আরো ১০ থেকে ১৫ ভাগ ডাইভারশনের মাধ্যমে অব্যাহতি পায়। আজকে আলোচনার বিষয় হচ্ছে ডাইভারশন। এজন্য শিশুরা কোনো অপরাধ করলে যদি জামিন দেওয়া সম্ভব হয় তাহলে থানা থেকে পুলিশ জামিন দিতে পারে। এজন্য পুলিশ কর্মকর্তা ও প্রবেশন অফিসারদের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি করা দরকার।

হাইকোর্টের বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা ধরা পড়ার পর সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রবেশন কর্মকর্তাদের দায়িত্ব তাদেরকে নজরদারির মধ্যে রাখা। যাতে আগামীতে তারা বড় সন্ত্রাসী না হয়ে উঠে। তিনি বলেন, অনেক বাবা-মা সন্তানকে শাসনের নামে নির্যাতন করে। এটা ঠিক নয়। শিশুদের শাস্তি না দিয়ে সংশোধনের দিকে নজর দিতে হবে। দেশের প্রচলিত আইনে শিশুদের নিজের সুরক্ষা পাওয়ার আইনগত অধিকার রয়েছে।

কর্মশালায় হাইকোর্টের বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার, ডিএমপির যুগ্ম-পুলিশ কমিশনার ফরিদা ইয়াসমিন, সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক (ইনস্টিটিউশন) মো. আবু মাসুদ ও ইউনিসেফ বাংলাদেশের চাইল্ড প্রোটেকশন স্পেশালিস্ট শাবনাজ জাহেরীন প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

ইত্তেফাক/এমআই