ঢাকা সোমবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ১ পৌষ ১৪২৬
২৫ °সে

সিঙ্গেল ডিজিট ও সরল সুদ এখনো অধরা

সিঙ্গেল ডিজিট ও সরল সুদ এখনো অধরা
প্রতীকী ছবি।

ব্যাংক ঋণের সিঙ্গেল ডিজিট ও সরল সুদের কথায় আশ্বস্ত হয়েছিলেন উদ্যোক্তারা। এ ধরনের আলোচনা শিল্প বিকাশের নতুন প্রণোদনা যোগায়। যারা পরিস্থিতির কারণে আটকে গিয়েছিলেন, তারাও আশায় বুক বাঁধেন, নতুন কিছু করার উদ্যম পান। কিন্তু সে আশায় যেন গুড়েবালি। সিঙ্গেল ডিজিটের স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেল। অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, গত মে থেকেই সরল সুদ কার্যকর করবেন। সেটি কার্যকরতো দূরের কথা, ঘোষণাই আসেনি এখনো। বরং ব্যাংকগুলোতে গেলে উদ্যোক্তাদের হতাশ হতে হয়। পরিচালনা ব্যয়, খেলাপি ঋণ-সবমিলিয়ে ‘সুন্দর’ কথার বাস্তবায়ন অসম্ভব- এমন বার্তাই গ্রাহকদের কানে দিচ্ছে ব্যাংকগুলো।

নতুন উদ্যোগে বিনিয়োগে অনীহা থাকলেও বিতরণকৃত ঋণ খেলাপি হওয়ার পরিমাণ বরং বেড়েই চলেছে। খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির কারণে ব্যাংকিং খাতে তদারকি বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা সংস্থা -আইএমএফ। কিন্তু খেলাপি ঋণ যেখানে কমার কথা, সেখানে বেড়েছে কেন? উদ্যোক্তারা বলছেন, যারা ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে ইচ্ছে করেই খেলাপি হন তাদের কথা ভিন্ন। প্রকৃত উদ্যোক্তাদের খেলাপি হওয়ার নানা কারণ রয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ তম্মধ্যে অন্যতম। গ্যাস-বিদ্যুত্ সুবিধার অভাবে কলকারখানা চালু রাখা সম্ভব না হওয়ায় অনেক উদ্যোক্তাই খেলাপি হয়েছেন। পরিস্থিতির শিকার এসব উদ্যোক্তার কথা বাদ দিলে যারা ইচ্ছেকৃত খেলাপি, তাদের চিহ্নিতকরণ এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি বলেও মন্তব্য করেন কেউ কেউ। একইভাবে ব্যাংকিং সূত্রগুলোও বলছে, খেলাপি ঋণ বাড়ার অন্যতম কারণ যাচাইবাছাই ছাড়া ঋণ প্রদান। এটি সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের ক্ষেত্রে ভিন্নভাবে হলেও সেটি বাস্তবতা। সরকারি ব্যাংকে পরিচালনা পর্ষদ সদস্যদের প্রভাবে ঋণ বিতরণ করা হয়। ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষেরও যোগসাজশ থাকে যা হলমার্ক, বিসমিল্লাহ, জনতা কিংবা বেসিক ব্যাংকের ক্ষেত্রে ঘটেছে। বেসরকারি ব্যাংকের ক্ষেত্রেও এক ব্যাংকের পরিচালক অন্য ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে ঋণ নিচ্ছেন। এসব ঋণের সঠিক যাচাইবাছাই হয় না বলেও সূত্র জানায়।

সূত্রমতে, অনিয়মের কারণে গোটা ব্যাংকিং খাত এখন খেলাপি ঋণের ভারে ন্যুব্জ। গত এক বছরের ব্যবধানে ২২ হাজার কোটি টাকা বেড়ে জুন শেষে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা। খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান ও ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ না নিলে এটি বাড়তেই থাকবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ইচ্ছেকৃত খেলাপিদের দাপটে এক ধরনের বিশৃঙ্খলাও রয়েছে বলে তাদের অভিমত। অন্যদিকে, প্রকৃত উদ্যোক্তা যারা জ্বালানি সংকটসহ আনুষঙ্গিক কারণে ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হচ্ছেন তারা ঢালাও অভিযুক্ত হচ্ছেন। ফলে এই বিশৃঙ্খলার রাশ টেনে ধরা জরুরি এবং তদারকি বাড়ানোর বিকল্প নেই। আইএমএফও ব্যাংকিং সুপারভিশন আরো বাড়ানোর পাশাপাশি খেলাপি গ্রাহকদের আইনি সহায়তা বন্ধে গুরুত্বারোপ করেছে।

আরো পড়ুন : রিফাত হত্যা : ‘সুনাম দেবনাথ কেন আসামি নয়, সে আমাদের নির্দেশদাতা’

ব্যাংকিং সূত্র জানায়, পরিস্থিতি এমন- কোনো কোনো ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণের ৪০ থেকে ৯০ শতাংশই খেলাপি হয়ে আছে। এসব ব্যাংক প্রভিশন রাখতেও ব্যর্থ হচ্ছে। কোনো কোনো ব্যাংকের মূলধন ঘাটতিও রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নানা বিধিবিধানের পরও ব্যাংকখাতের এই পরিস্থিতির জন্য দুর্বল তদারকি এবং পরিচালনা পর্ষদের স্বেচ্ছাচারিতাই দায়ী বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। তাদের মতে, সরকারি ব্যাংকগুলোতে রাজনৈতিক প্রভাব এবং পরিচালনা পর্ষদের পাশাপাশি ব্যবস্থাপনার শীর্ষ পদেও তদ্বির-লবিংয়ের কারণে ব্যাংকিং খাত সঠিকভাবে চলছে না।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, সরকারি-বেসরকারি খাতের কয়েকটি ব্যাংক প্রভিশন রাখতেও পারছে না। জুন শেষের হিসাব অনুযায়ী ব্যাংকগুলো হচ্ছে— বেসিক, বিডিবিএল, জনতা, কমার্স, আইসিবি ইসলামী, পদ্মা ও এনবিপি। বেসিক ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের ৬০ দশমিক ৫০ শতাংশ খেলাপি। বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেডের (বিডিবিএল) বিতরণ করা ঋণের ৫৫ দশমিক ৯৫ শতাংশ খেলাপি। জনতা ব্যাংকের বিতরণ করা মোট ঋণের ৪২ দশমিক ৯৬ শতাংশ খেলাপি। ব্যাংকটি আগে ভালোভাবে চললেও কয়েকটি গ্রুপকে অনিয়মের মাধ্যমে ঋণ দেওয়ায় এই পরিস্থিতি হয়েছে বলে ব্যাংকের একটি সূত্র জানায়। আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৮২ দশমিক ৬৪ শতাংশ যার ৮০ দশমিক ৭০ শতাংশ আদায় অযোগ্য বলে জানা গেছে। পদ্মা ব্যাংকের (সাবেক ফারমার্স ব্যাংক) মোট ঋণের ৬৬ শতাংশ খেলাপি। বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৪৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ। বিদেশি ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের মোট ঋণের ৯৭ দশমিক ৬৪ শতাংশই খেলাপি।

ইত্তেফাক/ইউবি

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১৬ ডিসেম্বর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন