রাজধানীর কাওরান বাজারে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সামনে একটি ঘড়ি লাগানো হয়েছিল। এটাকে বলা হতো পপুলেশন ওয়াচ। মূলত জনসংখ্যার হ্রাস-বৃদ্ধি পরিমাপের জন্য এটা লাগানো হয়। কিন্তু এই পপুলেশন ওয়াচ কখনোই জনসংখ্যা হ্রাসের চিত্র দেয়নি। বরং এমনভাবে জনসংখ্যা বাড়ছিল যে কর্তৃপক্ষ নিজেই ঘড়িটি সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়। এ ঘটনা থেকেই বাংলাদেশে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমের চিত্র বোঝা যায়।
প্রতি বছর পরিবার পরিকল্পনা খাতে বাজেট বাড়লেও কার্যক্রমে গতি নেই। গত এক যুগ ধরে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে আছে। এ কারণে দেশের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে ২০৫১ সালে দেশের জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ২১ কোটি ৮৪ লাখে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বাড়তি জনসংখ্যা কর্মসংস্থান, ভূমি, কৃষি, আবাসন, স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে।
২০১৯-২০ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতের বাজেট ধরা হয়েছে ২৫ হাজার ৭৩২ কোটি টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের স্বাস্থ্য খাতে বাজেট ছিল ২২ হাজার ৩৩৬ কোটি টাকা। এ বছর স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৪৫৭ কোটি এবং উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রতি বছর পরিবার পরিকল্পনা খাতে কেবল বাজেটই বেড়েছে, কিন্তু কাজের অগ্রগতি একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে।
সরকারের পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম বর্তমানে সমালোচনার সম্মুখীন। কারণ স্বাধীনতার পর মোট প্রজনন হার ৬.৩ থেকে ২.৩-এ নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু এরপর গত এক যুগ ধরে সূচক একই জায়গায় স্থির। স্বাস্থ্য জরিপ বলছে, দেশের মোট প্রজনন হার এবং পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যবহারকারীর হার প্রায় একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে বাংলাদেশের সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বাধাগ্রস্ত হবে বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের।
২০১২ সালে লন্ডনে অনুষ্ঠিত স্বাস্থ্যবিষয়ক গ্লোবাল সামিটে ২০২০ সালের মধ্যে মোট প্রজনন হার ২-এ নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু পরিস্থিতি বিচারে বোঝা যাচ্ছে যে সেটা সম্ভব হচ্ছে না। এর ফলে মোট প্রজনন হার ২-এ না নামানো গেলে জনসংখ্যা বাড়তে থাকে। ফলে উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। প্রতিবন্ধকতা তৈরি হবে সরকারের প্রতিটি উন্নয়নমূলক কাজে।
পরিবার পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম একেবারে তৃণমূল পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকলেও অপ্রতুল লোকবলের কারণে সব মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। এর পাশাপাশি বাংলাদেশের জনসংখ্যার এখন ৬৫ শতাংশ তরুণ জনগোষ্ঠী আর ৪৫ শতাংশ শিশু-কিশোর জনগোষ্ঠী। সুতরাং এই জনগোষ্ঠীকে পরিবার পরিকল্পনার বিষয়ে সঠিক ধারণা দিতে পরিকল্পনা নির্ধারণ করতে হবে এখনই। সেজন্য সরকারের সামগ্রিক পরিকল্পনা করে এগোনোর বিকল্প নেই।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর কর্তৃপক্ষ জানাচ্ছে, স্বাধীনতার পর থেকে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। প্রজনন হার কমেছে, জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারের হারও বেড়েছে। সেই অগ্রগতি ধরে রাখাই এখন বড়ো চ্যালেঞ্জ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, মূলত তিনটি কারণে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম গতি পাচ্ছে না বর্তমান সময়ে এসে। প্রথমত, জনবলের ঘাটতি। ৪-৫ হাজার পরিবারকল্যাণ মাঠকর্মীর পদ ফাঁকা রয়েছে বলে জানা যায়। অথচ সময়ের পরিক্রমায় জনসংখ্যা বেড়েছে। ফলে আন্ডার কাভারেজ এরিয়া থেকে যায়। এখন একজন মাঠকর্মীকে তিন জায়গায় কাজ করতে হয়। যেমন কমিউনিটি ক্লিনিকে সপ্তাহে তিন দিন, ইপিআইতে এক দিন। ফলে একজন মাঠকর্মীর আওতায় যখন বিশাল জনসংখ্যা চলে আসে, তখন তাদের পক্ষে তা করা সম্ভব হয় না। তাই পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমে সরকারের এত বিশাল কাঠামো থাকার পরও তা কার্যকর হচ্ছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সঠিক পরিকল্পনার অভাব ও প্রশিক্ষণের ঘাটতি। যেমন ভাসমান জনগোষ্ঠী ও এলাকা, পার্বত্য এলাকা, চর এলাকা—অর্থাৎ যে এলাকাগুলো ‘হার্ড টু রিচ’ নামে পরিচিত, সেসব স্থানে জোরালো প্রোগ্রাম না নেওয়া। জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারে স্থায়ী পদ্ধতি ব্যবহার কমে যাওয়া।
এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণকে গুরুত্ব দিয়ে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মাধ্যমে এই সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার ফলে বাংলাদেশের দারিদ্র্য হার কমে আসা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর প্রভাব রেখেছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সেই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার কারণেই মোট প্রজনন হার ৬.৩ থেকে নামিয়ে ২.৩-এ আনা সম্ভব হয়েছিল। পরিবার পরিকল্পনা ব্যবহারকারীর হার ৬.৭ থেকে বাড়িয়ে ৬২-তে উন্নীত করা সম্ভব হয়েছিল। তবে গত প্রায় এক যুগ ধরে সে সূচক একই জায়গায় স্থির রয়েছে।
বেশকিছু সূচকে সফলতা এলেও এখনো অনেক সূচকেই পিছিয়ে বাংলাদেশ। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু। বাংলাদেশে কৈশোরকালীন জন্মহার পৃথিবীতে বর্তমানে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। বাল্যবিবাহ এখনো একটি বড়ো সামাজিক সমস্যা। সরকারি জরিপ বলছে, ১৮ বছরের আগে মেয়েদের বিয়ে না দেওয়ার আইন থাকলেও ৫৯ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয় ১৮ বছর হওয়ার আগেই। ১৫ থেকে ১৯ বছরের বয়সি বিবাহিত কিশোরীদের মধ্যে ৩১ শতাংশই প্রথম কিংবা দ্বিতীয় বার গর্ভবতী হন।
পরিবার পরিকল্পনা মিডিয়া অ্যাডভোকেসি কার্যক্রম পরিচালনা টিম অ্যাসোসিয়েটস। এ প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পুলক রাহা বলেন, ‘পরিবার পরিকল্পনায় সরকারের সাফল্য অনেক। তবে ২০২০ সাল নাগাদ যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তা অর্জনে গতিশীল করবার জন্যই সরকার, এনজিও, গণমাধ্যম এবং তৃণমূল পর্যায়ের স্থানীয় নেতৃত্ব সকলকে একযোগে কাজ করতে হবে। আমাদের অবকাঠামো রয়েছে, প্রয়োজন পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে গতিশীলতা আনা।’
জন্মনিয়ন্ত্রণে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়ে কাজ করছে মেরি স্টোপস বাংলাদেশ। মেরি স্টোপসের অ্যাডভোকেসি ম্যানেজার মনজুন নাহার ইত্তেফাককে বলেন, ‘জাতীয় পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমে সরকারের বিগত দিনগুলোতে বড়ো অর্জন রয়েছে। এখন আমাদের বর্তমান সময়ের চাহিদা অনুযায়ী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে কাজ করে যেতে হবে।’ তিনি জানান, জাতীয় পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচিতে বাংলাদেশ সরকারের উল্লেখযোগ্য অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি বিবেচিত এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় অবস্থিত নিজস্ব ক্লিনিকসমূহের মাধ্যমে বছরে প্রায় ২ মিলিয়ন গ্রহীতাকে পরিবার পরিকল্পনা সেবাসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করে যাচ্ছে।
স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের যুগ্মসচিব ড. আশরাফুন্নেছা বলেন, ‘সরকার লক্ষ্যমাত্রা পূরণে কাজ চলেছে। আমরা আশা করছি, আগামী বছরের মধ্যে যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তা অর্জন করা সম্ভব হবে।’ তিনি জানান, মাতৃমৃত্যুর হার প্রায় ৪০ শতাংশ কমে প্রতি হাজারে ১৬৯-এ নেমে এসেছে। ২০৩০ সাল নাগাদ এ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭০ জনে। শিশুমৃত্যুর হারও উল্লেখযোগ্য হারে কমে এসেছে। আর সেই সাফল্যে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো এমডিজি অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেই সম্মানজনক পুরস্কার গ্রহণ করেছেন।
১৯৭৩ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশে প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও খাদ্যোত্পাদনে গুরুত্বারোপ করেন। তখনই যাত্রা হয় বহুমুখী ও দেশব্যাপী জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম। পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমকে উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় ওতপ্রোতভাবে জড়িত বলে জরুরি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
আরও পড়ুন: ভিকারুননিসার গভর্নিং বডির নির্বাচনে ফল ঘোষণা
২০২১ সালের মধ্যে ‘মধ্যম আয়’ ও ২০৪১ সালের মধ্যে ‘উন্নত’ দেশের কাতারে পৌঁছাতে হলে সরকারকে জনসংখ্যার বিভিন্ন ইস্যুকে বিবেচনায় নিয়ে পরিবার পরিকল্পনায় সাফল্য, প্রতিবন্ধকতা ও চ্যালেঞ্জ মূল্যায়ন করতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশের জন্য বড়ো চ্যালেঞ্জ হলো বাল্যবিবাহ, দ্রুত সন্তানধারণ, শ্রমবাজারে নারীদের কম অংশগ্রহণ, কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় স্থানীয় ও পরিবর্তিত বিশ্ববাজার মাথায় রেখে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।
ইত্তেফাক/কেকে

