রাস্তায় শৃঙ্খলা ফেরাতে গতকাল শুক্রবার থেকে কার্যকর হয়েছে নতুন সড়ক পরিবহন আইন। এ নিয়ে রাজধানীসহ সারাদেশে চালকদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। চালকদের কেউ কেউ সাধুবাদ জানালেও, বেশির ভাগই বলছেন, শাস্তির বিধান কম হলে আরো ভালো হতো। এদিকে নতুন আইনটি কার্যকরে পুলিশ পুরোপুরি প্রস্তুত না থাকলেও আপাতত সচেতনতামূলক কাজের ওপর জোর দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। তবে এটিকে পুরোপুরি স্বাগত জানিয়েছে সাধারণ যাত্রীরা। উল্লেখ্য, গত ২২ অক্টোবর আইনটি গেজেট আকারে প্রকাশ করে সরকার। নাম দেওয়া হয় ‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮’। গতকাল শুক্রবার থেকে এটি কার্যকর শুরু হয়েছে। নতুন আইনে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮’ আইনটি প্রণীত হয়েছিল এক বছর আগে। কিন্তু পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের বাধার মুখে সরকার তা বাস্তবায়ন করেনি। শেষে গতকাল থেকে এ আইনটি কার্যকর হয়েছে। তবে আইনটি সম্পর্কে খোদ প্রয়োগকারী সংস্থা, জনসাধারণ ও পরিবহন মালিক, চালক, হেলপার ও পথচারীর নেই বিশেষ ধারণা। নতুন সড়ক পরিবহন আইন গতকাল থেকে প্রয়োগ হলেও এর তেমন কোনো প্রভাব চোখে পড়েনি সড়ক-মহাসড়কে। প্রতিদিনের মতোই নানা অনিয়ম চোখে পড়েছে। পুলিশ সদস্যের উলটো পথে বাইক চালানো, হেলমেট ছাড়া বাইক চালানো, বাস-সিএনজির সামনে দিয়ে রাস্তা পারাপার, গাড়ি চালানোর সময় মোবাইলে কথা বলা—এ ধরনের নানা দৃশ্য দেখা গেছে রাজধানীতে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আগের চেয়ে কঠোর এই আইন বাস্তবায়নের জন্য আরো প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে। কারণ সড়ক-মহাসড়কের অনিয়ম বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে। এটা রাতারাতি বন্ধ করা সম্ভব নয়। আইনটি টেকসই করতে হলে কর্তৃপক্ষকেই আরো দায়িত্বশীল হতে হবে। কারণ অনেক জায়গায় জেব্রা ক্রসিংয়ের যে চিহ্ন সেটা মুছে গেছে। অনেক জায়গায় ফুটওভার ব্রিজ দরকার সেখানে তা নেই। তাই সামগ্রিক বাস্তবতায় এই আইন বাস্তবায়ন করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে। অবকাঠামোগত ক্রটিগুলো সমাধান করা না হলে সাধারণ মানুষকে আইন মানাতে কষ্ট হবে।
পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল হক বলেন, এই আইনের সার্থকতাটা তখনই হবে যখন আমার ভয় দেখানোর দরকার হবে না। আইনটা যুগোপযোগী করা হয়েছে কি না সেটা দেখতে হবে। প্রয়োগের আগে একটু প্রচার-প্রচারণার দরকার আছে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ও পুলিশের ট্র্যাফিক বিভাগ বলছে, নতুন সড়ক পরিবহন আইন গতকাল থেকে কার্যকর হলেও প্রয়োগ হবে পুরোনো আইনই। পর্যায়ক্রমে সহনীয় মাত্রায় নতুন আইনটি প্রয়োগ শুরু হবে। তার আগে প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের আইনটি সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা ও বিশেষ করে যাদের জন্য আইন অর্থাত্ পথচারী, চালক ও হেলপারদের মোটিভেশন করা হবে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্র্যাফিক) মফিজ উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, আমাদের ট্র্যাফিক বিভাগে জনবল বাড়াতে হবে। যে জনবল আছে তাদের নতুন আইন সম্পর্কে প্রশিক্ষিত করতে হবে। তাছাড়া নতুন আইনটির সফল প্রয়োগের ক্ষেত্রে পথচারী, পরিবহন চালক-হেলপারসহ সব অংশীজনের সহযোগিতা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের পরিচালক শেখ মোহাম্মদ মাহবুব-ই-রব্বানী বলেন, আইনের মূল উদ্দেশ্য হলো সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। প্রাথমিক পর্যায়ে সহনীয়ভাবে এটা প্রয়োগ করা হবে। যাতে মালিক বা চালকের কোনো সমস্যা না হয় এবং নতুন আইনের কার্যক্রম যেন শুরু করা যায়।
আরও পড়ুন: ফকিরহাটে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত ২
রাজধানীর খামারবাড়ী মোড়ে দায়িত্বরত একজন ট্র্যাফিক সার্জেন্ট বলেন, ‘নতুন আইন সম্পর্কে সাধারণ মানুষের অনেক ভালো ধারণা রয়েছে। গতকালকের (বৃহস্পতিবার) ডিউটি আর আজকের (গতকাল শুক্রবার) ডিউটির মধ্যে অনেক পার্থক্য দেখছি। কালকে যেখানে অনেককে দেখেছি হেলমেট ছাড়া বাইক চালিয়ে চলে যেতে আজকে আর তেমনটি দেখা যাচ্ছে না। মানুষজন সর্বাত্মক চেষ্টা করছে নতুন আইন মেনে চলার। আমার মনে হয় এরকমভাবে চলতে থাকলে ঢাকা শহরের ট্র্যাফিক সিস্টেমে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে।’ নতুন সড়ক পরিবহন আইন সম্পর্কে একাধিক বাসচালক জানিয়েছেন, এমন কিছু শুনিনি। তবে তারা বলেন, আইন হলে মানতে আমরা রাজি আছি। সেটা লেন হোক আর লাইসেন্সের বিষয়ে হোক। কিন্তু সাধারণ মানুষ যখন সড়ক পার হয় কেউ জেব্রা ক্রসিং ব্যবহার করে না। ফুটওভার ব্রিজ দিয়ে পার হয় না। মোবাইল ফোন কানে নিয়ে, বাজারের ব্যাগ নিয়ে পার হয়। তখন দুর্ঘটনা ঘটলে চালকের দোষ হবে এটা মানতে পারি না।
ইত্তেফাক/কেকে

