ঢাকা সোমবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ১ পৌষ ১৪২৬
২৬ °সে

সড়ক পরিবহন আইন নিয়ে ধর্মঘট

সড়কে শৃঙ্খলা, না মৃত্যুর মিছিল?

আলোচনার পথও খোলা রেখেছে সরকার
সড়কে শৃঙ্খলা, না মৃত্যুর মিছিল?
সড়ক আইন বাতিলের দাবিতে পরিবহন শ্রমিকরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের শনির আখড়া থেকে সাইনবোর্ড পর্যন্ত রাস্তায় গাড়ি ফেলে যানজট সৃষ্টি করে —ইত্তেফাক

সড়কে যে বিশৃঙ্খলা চলছে তা নিরসনে নতুন সড়ক পরিবহন আইন বাস্তবায়ন জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঘটনা ঘটলেও এখনো আইন নিয়ে পরিবহন শ্রমিকদের নৈরাজ্য থামেনি। সাধারণ মানুষকে জিন্মি করে হুটহাট করে ধর্মঘট ডাকা হচ্ছে। তারা বলছেন, সড়ক ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলার কারণেই সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামছে না। প্রতিদিনই একের পর এক প্রাণ ঝরছে। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর সঙ্গে সম্পৃক্ত সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলো মাঝেমধ্যে সরব হলেও রহস্যজনক কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই আবার সিন্ডিকেটের জোয়ারের সঙ্গে গা ভাসিয়ে দিচ্ছে। ফলে রাজধানীসহ সারাদেশের সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে একের পর এক কমিটি গঠন ও দফায় দফায় সুপারিশের কিছুই বাস্তবায়ন হচ্ছে না। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে নতুন আইন করা হয়েছে। তার যথাযথ প্রয়োগ জরুরি। অতীতেও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আইন প্রয়োগ করলেও মালিক ও শ্রমিকদের অসহযোগিতার কারণে তা সফল হয়নি।

এরই ধারাবাহিকতায় নতুন সড়ক পরিবহন আইন বাস্তবায়নের মুখে দেশের বিভিন্ন স্থানে শুরু হয়েছে বাস-শ্রমিকদের কর্মবিরতি, ফলে ভোগান্তি পোহাচ্ছে সাধারণ মানুষ। এরই মধ্যে ৯ দফা দাবিতে গতকাল বুধবার থেকে সারাদেশে লাগাতার কর্মবিরতি পালন শুরু করে বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান পণ্য পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ। এতে রাজধানীর সঙ্গে বাইরের জেলাগুলোর যোগাযোগ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। দুর্ভোগে পড়েন সাধারণ মানুষ। তবে গতকাল রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামালের ধানমন্ডিস্থ বাসায় পরিবহন নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে ট্রাক-কাভার্ডভ্যান ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়েছে।

ধর্মঘট প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী বলেছেন, শ্রমিক ফেডারেশন কোনো ধর্মঘটের ঘোষণা দেয়নি। শ্রমিকেরা নিজেরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে গাড়ি বন্ধ রেখেছিল। তিনি বলেন, আজ ও আগামীকাল শুক্রবার ফেডারেশনের বর্ধিত সভা আছে। সেখানেই নতুন আইন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, ‘অবকাঠামো, প্রতিষ্ঠানিক ও প্রয়োগিক ক্ষমতার অভাব রয়েছে। এ জন্য দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও পুরোনো আইনটি পুরোপুরি প্রয়োগ করা যায়নি। নতুন আইনটি আরও দশগুণ কঠোর। তাই নতুন আইন প্রয়োগের পাশাপাশি অবকাঠামো, প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রয়োগত সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে ব্যাপক জোর দিতে হবে।’

নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন বলেছেন, ‘নতুন আইন সঠিকভাবে কার্যকর হলে সড়ক দুর্ঘটনা কমবে।’ তিনি বলেন, ‘সড়ক পরিবহন মালিক-শ্রমিকনেতাসহ সকলের মতামতের ভিত্তিতে এই আইনটি প্রণয়ন করা হয়। যুগোপযোগী এই আইনটি পাশ হওয়ার পর সাধারণ জনগণ ও সচেতন মহলের সবাই আইনের প্রতি সমর্থন দিয়েছেন। আইনে কোনো অসংগতি থাকলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান বের করতে হবে। তা না করে কোনো ক্ষতি না হওয়ার আগেই ভয় পেয়ে যে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হচ্ছে, চারদিকে যে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে—তা সত্যিই দুঃখজনক এবং এই অস্থিতিশীল পরিবেশ আমরা সচেতন নাগরিক হিসেবে কেউ কামনা করি না।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমি মনে করি, নতুন সড়ক পরিবহন আইনটি যদি কোনো মহলের চাপের মুখে সঠিকভাবে বাস্তবায়ন না হয় তাহলে আমরা যে দুর্ঘটনামুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছি তা হয়তো আর বাস্তবায়ন হবে না। এই আইনের সঠিক প্রয়োগ ও বাস্তবায়নে যদি আমরা হেরে যাই তাহলে হেরে যাবে বাংলাদেশ।’

ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, ‘আমরা কোনো ধর্মঘট ডাকিনি। গাড়ি চালাচল স্বাভাবিক রাখার জন্য আমরা কাজ করছি।’

এদিকে গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেছেন, ‘একটি স্বার্থবাদী গোষ্ঠী পরিবহন সেক্টরে প্রভাব বিস্তার করে সরকারের ভালো কাজগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। এই গোষ্ঠী জনগণের প্রত্যাশিত নতুন সড়ক আইন বাস্তবায়নে বাধা দিচ্ছে। তারা নিরীহ শ্রমিকদের মাঝে গুজব রটিয়ে ফায়দা হাসিল করতে চায়।’

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মফিজ আহমেদ জানিয়েছেন, আজ বৃহস্পতিবার থেকে ঢাকা মহানগর পুলিশ ট্রাফিক সপ্তাহ পালন করবে। রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স অডিটোরিয়ামে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের নিয়ে বৈঠক হবে।

ভোগান্তিতে মানুষ: নতুন সড়ক পরিবহন আইন সংশোধনের দাবিতে গতকাল তৃতীয় দিনের মতো দেশের বিভিন্ন জেলায় অনির্দিষ্টকালের জন্য পরিবহন ধর্মঘট পালন করছে বাসচালক ও শ্রমিকরা। অঘোষিত এই ধর্মঘটে দূরপাল্লা ও অভ্যন্তরীণ বেশিরভাগ রুটে বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে সারাদেশের সড়ক যোগাযোগ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। পূর্বঘোষণা ছাড়াই হঠাত্ এমন ধর্মঘটে বিপাকে পড়েছেন বিভিন্ন রুটের যাত্রীরা। রাজধানীর অনেক ডিপো থেকেও ছাড়া হচ্ছে না বাস। এতে বিপাকে পড়েছেন সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা। ধর্মঘটে অচলাবস্থার পথে চট্টগ্রাম বন্দরও। পরিবহন শ্রমিকদের স্বেচ্ছা কর্মবিরতিতে দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তরের বেশ কিছু জেলায় গত তিন দিন ধরেই বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। গতকাল সকাল থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কেও দূরপাল্লার বাস চলাচলে বাধা দেওয়া হচ্ছে। কুমিল্লায় পরিবহন শ্রমিকদের ডাকা অবরোধ চলাকালে সড়কে চলাচলরত গাড়ির চালকদের মুখে পোড়া মবিল মেখে দিয়েছে অবরোধকারীরা।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির সভাপতি তোফাজ্জল হোসেন মজুমদার বলেন, ‘শ্রমিকরা তাদের স্বার্থে ধর্মঘট ডেকেছে। তারা যদি আমাদের ট্রাক নিয়ে রাস্তায় না নামে, আমরা কী করব?’

বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান পণ্য পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক রুস্তম আলি খান বলেন, ‘আমরা ৯ দফা দাবিতে আন্দোলন ডেকেছি। আমাদের আন্দোলন শান্তিপূর্ণভাবে হচ্ছে। আমরা মনে করি, আমাদের দাবিগুলো যৌক্তিক। সরকার সেগুলো মেনে নেবে।’

উল্লেখ্য, সংসদে পাশ হওয়ার এক বছরের বেশি সময় পার হওয়ার পর গত ১ নভেম্বর থেকে সড়ক পরিবহন আইন কার্যকর হয়েছে। তবে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে আইনের প্রয়োগ প্রথমে এক সপ্তাহ পিছিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী। পরবর্তীতে সময়সীমা আরো এক সপ্তাহ বাড়ানো হয়। গত ১৪ নভেম্বর এসময় শেষ হলেও ১৭ নভেম্বর থেকে আইন প্রয়োগ শুরু করে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বিআরটিএ। এরপর থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলায় বাস চলাচল বন্ধ করে দেয় শ্রমিকরা। এরপরই আসে সারাদেশে ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান চলাচল বন্ধের ঘোষণা।

ইত্তেফাক/বিএএফ

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
১৬ ডিসেম্বর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন