ঢাকা রবিবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
২১ °সে


চুক্তি পূর্ণ বাস্তবায়নে বড়ো বাধা সশস্ত্র চার গ্রুপ

পার্বত্য শান্তিচুক্তির ২২ বছর পূর্তি আজ
চুক্তি পূর্ণ বাস্তবায়নে বড়ো বাধা সশস্ত্র চার গ্রুপ
পার্বত্য শান্তিচুক্তি।ছবি:সংগৃহীত

পার্বত্য শান্তিচুক্তির ২২ বছর পূর্তি হচ্ছে আজ। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর সরকার ও জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি। চুক্তির পর খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে তত্কালীন ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে শান্তিবাহিনীর শীর্ষ গেরিলা নেতা সন্তু লারমা তার বিপুলসংখ্যক সহযোগী নিয়ে অস্ত্র সমর্পণের মধ্য দিয়ে আত্মসমর্পণ করেন। সরকার তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সুযোগ প্রদান করে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সন্তু লারমার কাছে বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র নেই। কোনো নির্বাচনে তিনি ভোট দেন না। সংগত কারণেই তিনি বাংলাদেশের নাগরিক কি না, তা নিয়েও রয়েছে বিস্তর প্রশ্ন। এত সব সীমাবদ্ধতা নিয়েই সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন রয়েছেন সন্তু লারমা।বর্তমানে পার্বত্য অঞ্চলের মানুষ শান্তিতে বসবাস করছে। তবে শান্তিচুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নে বড়ো বাধা হিসেবে রয়েছে সশস্ত্র চারটি গ্রুপ। এরা প্রায়ই অস্ত্রের মহড়া করে থাকে। চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে এই চার গ্রুপ নিজেরা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে মেতে ওঠে। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ঘটছে খুনের বদলা খুনের ঘটনা। সংগঠন চারটি হলো :জেএসএস (সন্তু), জেএসএস (এমএন লারমা), ইউপিডিএফ (প্রসিত) ও ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)। সূত্র জানায়, পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন উপদলীয় সংঘাতের জেরে গত ৫ বছরে ২০৭ জন নিহত হয়েছে, যার মধ্যে ১১৪ জনই ছিল বাঙালি। চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত প্রথম ১০ মাসে ১৪ জন বাঙালিসহ নিহত হয়েছে ৫৬ জন।

আরও পড়ুন: ঋণে চক্রবৃদ্ধি হার থাকছে না কার্যকর হচ্ছে সিঙ্গেল ডিজিট

গত ২০ বছরের বেশি সময় ধরে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছেন। নিয়মিত নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও ১৯৯৯ সালের ২৭ মে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরুর পর থেকে আজ অবধি আঞ্চলিক পরিষদে কোনো নির্বাচন হয়নি। কোন ক্ষমতাবলে দুই দশক ধরে আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যানের পদ সন্তু লারমা আঁকড়ে ধরে রয়েছেন, তা জানার আগ্রহ রয়েছে পার্বত্যাঞ্চলের বাসিন্দাদের। অভিযোগ রয়েছে, পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান হওয়া সত্ত্বেও সন্তু লারমা কখনো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, স্বাধীনতা দিবস, জাতীয় শোক দিবস, বিজয় দিবসসহ কোনো রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান পালন কিংবা তাতে যোগদান করেন না। আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান পদটি প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদাপূর্ণ। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকেও ভোটার হওয়া এবং জাতীয় পরিচয়পত্র গ্রহণে তার আগ্রহ নেই। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সভাপতিত্বে রাঙামাটিতে বিশেষ আইনশৃঙ্খলা সভায় তিনটি মন্ত্রণালয় থেকে আমন্ত্রণ জানানো সত্ত্বেও সন্তু লারমা সেই সভায় যাননি। এজন্য তাকে কোনো ধরনের জবাবদিহিও করতে হয়নি বলে জানা গেছে। অনেক সময় বিদেশি কূটনীতিবিদ, বিদেশি এনজিও, সাহায্য সংস্থার প্রতিনিধিরা পার্বত্য চট্টগ্রাম সফরে গিয়ে সন্তু লারমার সঙ্গে সাক্ষাত্ করেন কোনো ধরনের সরকারি প্রোটোকল ছাড়াই। বিদেশিদের সঙ্গে সন্তু লারমার কী কথাবার্তা হয়, সেটা স্থানীয় প্রশাসন অনেক সময় জানতেও পারে না।

সরকারি পদের পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি সন্তু লারমা। শান্তিবাহিনী নামে জনসংহতি সমিতির সশস্ত্র শাখাটি একসময় পাহাড়ে চরম আতঙ্কের জন্ম দিয়েছিল। দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে নিরীহ পার্বত্যবাসীদের ঘুম হারাম করে দিয়েছিল এই শান্তিবাহিনী। হত্যা, চাঁদাবাজি, অপহরণ ও ধর্ষণ ছিল তখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। সন্তু লারমার সশস্ত্র অনুসারীদের তাণ্ডবে অপরাধের চারণভূমিতে পরিণত হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম। অবশেষে পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘদিনের হানাহানি ও রক্তপাত বন্ধের উদ্যোগে নেন তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার নেতৃত্বে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর জাতীয় কমিটি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে ঐতিহাসিক পার্বত্য শান্তিচুক্তি সম্পাদিত হয়, যেখানে জনসংহতি সমিতির পক্ষে স্বাক্ষরদাতা ছিলেন সন্তু লারমা। বিশ্বব্যাপী সমাদৃত সেই চুক্তির ২২ বছর পূর্তি হচ্ছে আজ। তবে দুই যুগের বেশি পেরিয়ে গেলেও কাঙ্ক্ষিত শান্তি আসেনি পার্বত্য জনপদে। শান্তিচুক্তির পর সন্তু লারমার নেতৃত্বে শান্তিবাহিনীর সদস্যরা অস্ত্র সমর্পণ করেছিল। তবে অস্ত্র সমর্পণের ঘটনাটি একধরনের ‘লোকদেখানো প্রহসন’ ছিল বলেই স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি। পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী সূত্র জানাচ্ছে, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন আঞ্চলিক সংগঠনের সশস্ত্র গ্রুপগুলোর কাছে এখনো কয়েক হাজার অবৈধ অস্ত্র রয়েছে, যা তারা আধিপত্য বিস্তারের কাজে ব্যবহার করছে।

অভিযোগ রয়েছে, সন্তু লারমার স্বেচ্ছাচারিতার কারণেই পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি ভেঙে চার টুকরো হয়েছে। তিনি শুধু নিজের সংগঠনই ভাঙেননি, তিনি বাংলাদেশ ভাঙারও ষড়যন্ত্রে মদত দিচ্ছেন। পার্বত্য চট্টগ্রামকে নিয়ে ‘স্বাধীন জুম্মল্যান্ড’ নামে একটি আলাদা দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখছে একদল বিপথগামী উপজাতি। বেশ কিছুদিন ধরে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কথিত স্বাধীন জুম্মল্যান্ডের মানচিত্র, জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীতসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীদের নামও ঘোষণা করে প্রচার-প্রচারণাও চলছে। অথচ বাংলাদেশ সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকেও সন্তু লারমা এসব বিষয়ে কখনো মুখ খোলেননি। সন্তু লারমার সর্বশেষ যে কাজটি চরম বিতর্কের জন্ম দিয়েছে তা হলো, শান্তিচুক্তির ২২ বছর পূর্তি উত্সব পালনের উদ্দেশ্যে তার নির্দেশে জনসংহতি সমিতির প্রচার সম্পাদক অন্যান্য নেতাকর্মীর কাছে একটি চিঠি দিয়ে ব্যাপক চাঁদাবাজির নির্দেশনা দিয়েছেন। ঐ চিঠিতে চাঁদার জন্য প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের কথা বলা হয়েছে।

ইত্তেফাক/এএএম

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
০৮ ডিসেম্বর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন