ঢাকা সোমবার, ২০ জানুয়ারি ২০২০, ৭ মাঘ ১৪২৭
১৯ °সে

জরিপে উঠে আসছে গণহত্যার নতুন চিত্র

জরিপে উঠে আসছে গণহত্যার নতুন চিত্র
[ছবি: সংগৃহীত]

‘নদীতে লাশের সারি আর রক্তের স্রোত দেখেছি। কোথাও পা রাখার জায়গা নেই। নদীর তীরেও লাশ আর লাশ। গুলিবিদ্ধ অনেকেই তখনো বেঁচে। ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন অসহায়ভাবে। ঐদিন আমাকে ঘটনাস্থলের পাশের একটি মসজিদের বারান্দায় বাড়ির পাশের এক নারী পাটি দিয়ে ঢেকে রেখেছিলেন। আমি পাটির ফাঁক দিয়ে দেখেছি, পাকিস্তানিরা কীভাবে একে একে গুলি করে মানুষ হত্যা করছিল। এই গণহত্যার পাশাপাশি বর্বর পাকিস্তানিরা নারীদের ধর্ষণ করছিল।’ কথাগুলো বলছিলেন খুলনার চুকনগর গণতহ্যার প্রত্যক্ষদর্শী নিতাই গায়েন।

মুক্তিযুদ্ধ মানে রণাঙ্গনের যুদ্ধ শুধু নয়। জাতির গৌরবময় এ অর্জনের প্রতিটি পাতায় জড়িয়ে রয়েছে আত্মাহুতি আর নৃশংসতার করুণ ইতিহাস। গণহত্যার বর্বর ইতিহাস। কোটি মানুষের আহাজারি, নারীর ত্যাগ আর মৃত্যু। নিজের জীবন বিলিয়ে দেয়ার পণ। আর নিরস্ত্র বাঙালির কাছে মৃত্যুই যেন শক্তি।

মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনী কতগুলো নৃশংস গণহত্যার ঘটনা ঘটিয়েছে, তা স্বাধীনতার ৪৮ বছরেও চিহ্নিত হয়নি। গণহত্যার প্রকৃত তথ্য নিয়ে সরকারি পর্যায়ে হয়নি বস্তুনিষ্ঠ কোনো গবেষণাও। অবশ্য সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯৭৮ সালে হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ :দলিলপত্র’ শীর্ষক ১৫ খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে। সেখানেও গণহত্যার ইতিহাস উপেক্ষিত। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের সময়ে খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগর এলাকায় সংঘটিত সবচেয়ে বড়ো গণহত্যার তথ্যই ঐ গ্রন্থে স্থান পায়নি।

‘স্বাধীনতা’ শব্দটি শুধু চারটি বর্ণের সমাহার নয়, এর পেছনে আছে লাখো মানুষের দুঃখ-বেদনা, অশ্রু, রক্ত, ক্ষোভ, নির্যাতন আর অপমান এবং অবশ্যই অসম সাহসী লড়াইয়ের উপাখ্যানও জড়িয়ে রয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ মানুষ শহিদ হয়, নির্যাতিতা হন দুই লাখের বেশি নারী। অথচ এই গণহত্যা নিয়েও রাজনীতি রয়েছে। কেউ কেউ অস্বীকার করে এই গণহত্যাকে। অথচ নতুন করে পরিচালিত গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, গণহত্যার যে সাধারণ হিসাব আমরা জানতে পাই, এর চেয়েও অনেক বেশি গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে। তার মানে, হত্যার সংখ্যা ৩০ লাখেরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করছেন গবেষকরা।

খুলনায় অবস্থিত বাংলাদেশের একমাত্র গণহত্যা জাদুঘর ‘১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর’ এর উদ্যোগে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশের ৬৪টি জেলায় গণহত্যা ও বধ্যভূমি জরিপের কাজ শুরু হয়েছে। এ পর্যন্ত ২০টি জেলায় এই জরিপের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এসব জেলার গণহত্যা, বধ্যভূমি ও গণকবর জরিপ নিয়ে প্রণীত জেলাওয়ারি ২০টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এ গবেষণা জরিপে উঠে এসেছে সাড়ে ৬ হাজারেরও বেশি গণহত্যার নিদর্শন। জেলাগুলো হচ্ছে—পঞ্চগড়, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, রাজশাহী, নাটোর, বগুড়া, পাবনা, খুলনা, সাতক্ষীরা, যশোর, নড়াইল, বরিশাল, ভোলা, নারায়ণগঞ্জ, জামালপুর, মৌলভীবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কক্সবাজার। এই ২০ জেলায় এখন পর্যন্ত ৬ হাজার ৬০৮টি ‘নিদর্শন’ চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গণহত্যার ঘটনা ৫ হাজার ১২১টি, বধ্যভূমি ৪০৪টি, ৫০২টি গণকবর ও ৫৮৭টি নির্যাতন কেন্দ ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনের উত্সাহে ২০১৪ সালের ১৭ মে ‘বাংলাদেশ ইতিহাস সম্মিলনী’ খুলনায় প্রতিষ্ঠা করে গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর ট্রাস্ট। এটি শুধু বাংলদেশ নয়; পুরো দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র গণহত্যা জাদুঘর। এই জাদুঘরের ট্রাস্টি সভাপতি ড. মুনতাসীর মামুন বলেন, ‘বিশ্বের প্রতিটি গণহত্যার একটি অপরাজনীতি রয়েছে। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর সামরিক সরকারগুলো পাকিস্তানের এজেন্ডা পালন করেছে। বঙ্গবন্ধুকে বাদ দিয়ে জিয়াকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছে। গণহত্যাকে আড়াল করে বিজয়ের কথাই শুধু বলেছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার ছিল এই অপরাজনীতির বিরুদ্ধে কঠিন সিদ্ধান্ত। শেখ হাসিনা এককভাবে এ কাজের দায়িত্ব নিয়েছেন।’

অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন আরো বলেন, গণহত্যা নিয়ে সরকার যে হিসেব দেয়, সারা বিশ্ব সেটি মেনে নেয়। বাংলাদেশ সরকার বলেছে, গণহত্যায় ৩০ লাখ শহিদ হয়েছিল। আমরা সেটা মেনেও নিয়েছি। কিন্তু স্বাধীনতাবিরোধী চক্র এটা মেনে নেয়নি। এ জন্যই বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া, যিনি একাত্তরে পাকিস্তানি সেনাদের হাতে বন্দি ছিলেন, তিনিও ৩০ লাখ শহিদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কিন্তু আমরা ২০ জেলায় গণহত্যা নিয়ে জরিপ করতে গিয়ে দেখেছি, ৬৪ জেলায় জরিপ শেষ হলে শহিদের সংখ্যা হয়তো ৩০ লাখে সীমাবদ্ধ থাকবে না।

মুক্তিযুদ্ধ গবেষকদের মতে, স্বাধীনতার ৪৮ বছরেও জাতি হিসেবে বাংলাদেশ গণহত্যার দায়ে পাকিস্তানি বাহিনীর বিচার ও গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এখনো আদায় করতে পারেনি। গণহত্যার বস্তুনিষ্ঠ তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা সম্ভব হলে এর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায় সহজ হবে। পাশাপাশি পাকিস্তানি বাহিনীর বিচারের দাবিও জোরদার হবে আন্তর্জাতিক আদালতে।

‘১৯৭১ : গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর’

২০১৪ সালের ১৭ মে খুলনা মহানগরীর ময়লাপোতা মোড়ের একটি ভাড়া বাড়িতে বেসরকারি উদ্যোগে প্রথম জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর ২০১৫ সালের আগস্টে নগরীর ২৬ নম্বর সাউথ সেন্ট্রাল রোডে একটি দোতলা বাড়ি বরাদ্দ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর সেটি সংস্কার করে ২০১৬ সালের ২৬ মার্চ সেখানে স্থানান্তর করা হয় আর্কাইভ ও জাদুঘরটি। এটির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই ট্রাস্টের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ লেখক ও গবেষক অধ্যাপক ড. মুনতাসীর মামুন। ট্রাস্টি সম্পাদক হিসেবে রয়েছেন বিএমএর সহসভাপতি ডা. শেখ বাহারুল আলম। এছাড়া জাদুঘরের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য হিসেবে আছেন প্রখ্যাত শিল্পী হাশেম খান, শাহরিয়ার কবির, তারিক সুজাত, শংকর কুমার মল্লিক, চৌধুরী শহীদ কাদের, আবুল কালাম আজাদ ও হুমায়ুন কবির। দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র এই গণহত্যা জাদুঘরের প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ মো.আব্দুল্লাহ আল শরীয়তউল্লাহ কাজল।

বাড়িটির গেট পেরোলেই দোতলা একটি পুরোনো ভবন। নিচতলায় ডান পাশের কক্ষটির দেওয়ালে টাঙানো মুক্তিযুদ্ধকালীন নির্যাতনের বেশ কয়েকটি ছবি। আর বাম পাশের কক্ষটির নাম শহিদ গ্যালারি, সেখানে রয়েছে বটিয়াঘাটা উপজেলার বাদামতলা গণহত্যায় শহিদ মাধবচন্দ পেয়েছে এই জাদুঘরে। দেশের একমাত্র গণহত্যা জাদুঘর। গণহত্যা-নির্যাতনের আলোকচিত্র, চিত্রকর্ম ও বই সংগ্রহের পাশাপাশি স্মৃতিফলক স্থাপন এবং বিভিন্ন প্রকাশনা তৈরি করছে প্রতিষ্ঠানটি। আর্কাইভের ১০টি কক্ষের দেওয়ালে সাজানো রয়েছে মুক্তিযুদ্ধকালীন নির্যাতন ও ঐতিহাসিক মুহূর্তের ৩০০রও বেশি আলোকচিত্র।

ইত্তেফাক/এমআর

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
icmab
facebook-recent-activity
prayer-time
২০ জানুয়ারি, ২০২০
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন