ঢাকা বুধবার, ২৯ জানুয়ারি ২০২০, ১৬ মাঘ ১৪২৭
২১ °সে

১০ হাজার ৭৮৯ রাজাকারের তালিকা প্রকাশ

১০ হাজার ৭৮৯ রাজাকারের তালিকা প্রকাশ
রবিবার সকালে রাজাকারদের তালিকা প্রকাশ করেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক : ইত্তেফাক

মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারী যেসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে ১৯৭২ সালের দালাল আইনে মামলা করা হয়েছিল তাদেরকে রাজাকার আল-বদর, আল-শামস বাহিনীর সদস্য হিসাবে চিহ্নিত করে ১০ হাজার ৭৮৯ জনের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। ১৯৭০ সালের উপনির্বাচনে যেসব ব্যক্তিকে এমপিএ বা এমএনএ নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়েছিল তারাও রাজাকার বলে চিহ্নিত হবে।

রবিবার মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী মোজাম্মেল হক তার মন্ত্রণালয়ের সভা কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই তালিকা প্রকাশ করেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রাথমিকভাবে সংখ্যা প্রকাশ করা হয়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, এটি পর্যায়ক্রমে প্রাকাশিত হতে থাকবে। জেলা প্রশাসনগুলো যথাসময়ে তথ্য না দেয়া দুঃখ প্রকাশ করে মন্ত্রী বলেন, তাদেরকে আবারও তাগিদ দেয়া হবে।

প্রসঙ্গত, ১৯৭২ সালে দালাল আইনে প্রায় ৫৫ হাজার ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হয়েছিল। এরমধ্যে বঙ্গবন্ধু কিছু ব্যক্তিকে (যেসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে ধর্ষণ, খুন, অগ্নিসংযোগ, লুটপাটসহ গুরুতর অভিযোগ ছিল না) তেমন ব্যক্তিদের সাধারণ ক্ষমায় মুক্তি দিয়েছিলেন।

এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, এটি যাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল শুধু তাদের নাম। এটি মন্ত্রিসভায় কিংবা সংসদে অনুমোদিত নয়। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনক্রমে কোন সরকারি আদেশ বা গেজেট দ্বারা এই তালিকা প্রকাশ করা হচ্ছে না-স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকা তিনি ঘোষণা করছেন সরকারের অংশ হিসাবে। প্রথম তালিকা রবিবারই মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে পুরো তালিকা প্রকাশ করা হবে।

মন্ত্রী বলেন, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী দীর্ঘ মাস তাদের স্থানীয় দোসর জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ, রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস শান্তি কমিটির সহায়তায় বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে ৩০ লাখ বাঙালিকে হত্যা করেছে, দুই লাখ মা-বোনের সন্ত্রমহানি করেছে। তিনি বলেন, স্পষ্ট করতে চাই, আমরা কোনো তালিকা তৈরি করছি না। যারা একাত্তরে রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস বা স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছিলেন এবং যেসব পুরোনো নথি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সংরক্ষিত ছিল সেটুকু প্রকাশ করছি।

তালিকায় যাদের নাম রয়েছে তা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে কি-না জানতে চাইলে মোজাম্মেল হক বলেন, কোনো গেজেট প্রকাশ করা হবে না। তবে জাতি প্রত্যাশা করলে এবং সরকার মনে করলে গেজেট করবে। আমরা তালিকা প্রকাশ করলাম, আগে প্রতিক্রিয়া দেখব, জাতি চাইলে এটা হবে। একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় কয়েকটি রাজনৈতিক দল পাকিস্তানি বাহিনীর পক্ষ নিয়েছিল। এর মধ্যে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলামী।

প্রায় এক দশক আগে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরুর পর রাজাকারের তালিকা তৈরির দাবি জোরালো হয়। ২০১২ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী বি তাজুল ইসলাম সংসদে এক প্রশ্নের উত্তরে জানিয়েছিলেন, রাজাকারের কোনো তালিকা সরকারের কাছে নেই। ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি বরাবরই রাজাকারের তালিকা প্রকাশের দাবি করে আসছে।

১৯৭১ সালের খুলনায় আনসার হেডকোয়ার্টার্সে পাওয়া তালিকায় ৩০ হাজারের বেশি রাজাকারের তথ্য মিলেছিল। ওই তালিকাটি মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে রয়েছে। গত ২৫ আগস্ট মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে রাজাকারদের তালিকা সংগ্রহে কাজ শুরু হওয়ার কথা জানানো হয়।

১৯৭১ সালে থানা থেকে বেতনভোগী রাজাকারদের তালিকা সংগ্রহের জন্য চলতি বছর ২১ মে জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) চিঠি পাঠানো হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে। পরে ওই তালিকা করার জন্য আবারও তাগিদ দেওয়া হয়। কমিটির সভাপতি শাজাহান খান সে সময় সাংবাদিকদের বলেন, তালিকা হাতে আসা শুরু হয়েছে। মন্ত্রণালয় বলেছে, এই ১৬ ডিসেম্বর থেকে যতটুকু আসবে পর্যায়ক্রমে প্রকাশ করা হবে।

এরই ধারাবাহিকতায় বিজয় দিবসের আগের দিন রবিবার স্বাধীনতার ৪৮ বছরের মাথায় ৬৫৯ পৃষ্ঠার প্রথম তালিকা প্রকাশ করতে এসে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মোজাম্মেল হক বলেন, বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় অনেক নথি সুকৌশলে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। ফলে পরিপূর্ণ তালিকা পাওয়া কঠিন হচ্ছে।

তিনি বলেন, তৎকালীন ১৯ জেলার রেকর্ড রুমে যেসব দালিলিক প্রমাণ ছিল, সেগুলো দিতে বলা হয়েছিল; আশারুরূপ তালিকা পাইনি। তাই জানুয়ারি মাসের মধ্যে রেকর্ড পাঠানোর জন্য বলা হয়েছে।

বিভিন্ন জেলার রেকর্ড রুম এবং ওই সময় বিজি প্রেসে ছাপানো তালিকাও সংগ্রহ করার চেষ্টা চলছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, যাচাই-বাছাই করে ধাপে ধাপে আরও তালিকা প্রকাশ করা হবে।

আরো পড়ুন: খুলনায় আরেক পাটকল শ্রমিকের মৃত্যু

এক প্রশ্নে মোজাম্মেল বলেন, তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যদি কোনো মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ থেকে থাকে, তাহলে এই তালিকা প্রকাশের মধ্য দিয়ে তাদের বিচারের দ্বার উন্মোচিত হবে। তবে কারো বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য এই তালিকা নয়। তালিকাভুক্ত হলে মামলা করা যাবে বা তালিকাভুক্ত না হলে মামলা করা যাবে না এমন নয়। বাদী অভিযোগ আনলে মামলা হবে।

মন্ত্রী বলেন, প্রথম ধাপের তালিকায় যাদের নাম রয়েছে তাদের রাজনৈতিক পরিচয় চিহ্নিত করা হয়নি। তবে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে স্বেচ্ছায় যারা ক্যান্টনমেন্টে ছিলেন তারাও স্বাধীনতাবিরোধী। সাবেক একজন রাষ্ট্রপতির নাম উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন তিনি শান্তি কমিটির প্রধান ছিলেন।

মন্ত্রী বলেন, আমরা কোন তালিকা করছি না। যারা একাত্তরে রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস বা স্বাধীনতাবিরোধী হিসাবে পাকিস্তানি সরকার কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন এবং যেসব পুরোনো নথি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সংরক্ষিত ছিলো, সেটুকু প্রকাশ করছি।

মন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতাবিরোধীরা দীর্ঘদিন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকায় রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস বা স্বাধীনতাবিরোধীদের তালিকা নথিসমূহ বিনষ্ট করা হয়েছে।

মুক্তিযোদ্ধার তালিকা:

সংবাদ সম্মেলনে এখন পর্যন্ত হালনাগাদ করা মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাও প্রকাশ করা হয়। বর্তমান তথ্য মতে, কোন না কোন তালিকায় লাখ ৩৩ হাজার ৮৫৬ জন মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন। এর মধ্যে দাবিদার মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা লাখ ৫১ হাজার ২৮৫ জন। বর্তমানে ভাতাভোগী মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা লাখ হাজার ৪৬১ জন। কিন্তু এই লাখ ৫১ হাজার ২৮৫ সংখ্যক তালিকার অনেক মুক্তিযোদ্ধার নামে একাধিক গেজেট/অন্যান্য দলিল থাকায় মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা বেশি মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে ভারতীয় তালিকা, লালমুক্তিবার্তা গেজেটে প্রকাশিত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা লাখ ১০ হাজারের বেশি হবে না। একাধিক দলিলভূক্ত মুক্তিযোদ্ধাগণের চূড়ান্ত এককতালিকা তৈরির কাজ প্রক্রিয়াধীন বলেও জানান তিনি।

রাজাকারের তালিকা মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েব সাইটে দেখতে ক্লিক করুন: মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়

ইত্তেফাক/এমআরএম

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
icmab
facebook-recent-activity
prayer-time
২৯ জানুয়ারি, ২০২০
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন