আন্দোলনে সুযোগ সন্ধানীদের ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে

আপডেট : ১৭ মার্চ ২০১৯, ০২:২৯
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদের নবনির্বাচিত নেতাদের সঠিকভাবে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, সাহস থাকা ভালো। তবে আন্দোলনে সুযোগসন্ধানীরা থাকে, একটি শ্রেণি সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করে। তাদের ব্যাপারেও সজাগ থাকতে হবে ছাত্র নেতাদের। আমাদের যে কোনো আন্দোলনে আগে খেয়াল রাখতে হবে যেন কোনো মতলবি মহল সুযোগ নিতে না পারে।
 
তিনি বলেন, আমরা ভবিষ্যত্ নেতৃত্ব খুঁজি। আর ছাত্রজীবন থেকেই তা গড়ে তুলতে হবে। সে জন্য স্কুল পর্যায়ে ক্যাবিনেট চালু হয়েছে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ চর্চার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। আগে রাজনীতির পরিবেশ এতো সুষ্ঠু ছিল না, এখন সুন্দর পরিবেশ ফিরে এসেছে। নেতৃত্ব তুলে আনতে ডাকসু নির্বাচনের আয়োজন করা হয়েছে। নেতৃত্ব গড়ে তোলার জন্য এ নির্বাচন কতোটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা মনে রাখতে হবে। এ নির্বাচনের মাধ্যমে সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ ফিরে আসুক এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
 
গতকাল শনিবার বিকালে গণভবনে ডাকসু নেতাদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী এ সব কথা বলেন। বিকাল ৪টায় ডাকসুর সকল নির্বাচিত নেতাই (ছাত্র ইউনিয়নের একজন বাদে) গণভবনে গেলে প্রধানমন্ত্রী তাদের স্বাগত জানান। অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কদমবুচি করে দোয়া নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)’র নবনির্বাচিত সহ-সভাপতি (ভিপি) নুরুল হক নুর। প্রধানমন্ত্রী পরম মমতায় তার মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করে দেন। এ সময় নুরও পরম শ্রদ্ধায় সেই হাত বুকের কাছে টেনে নেন এবং তার জন্য দোয়া করতে বলেন। এ সময় ডাকসুর নবনির্বাচিত জিএস গোলাম রাব্বানী ও পরাজিত ভিপি প্রার্থী কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনকে হাস্যোজ্জ্বল মুখে প্রধানমন্ত্রীর দুপাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। নুরুল হক নুর প্রধানমন্ত্রীর পা ছুঁয়ে সালাম করে বলেন, ‘ছোটবেলায় আমি মাকে হারিয়েছি। আপনার মাঝে আমি আমার মায়ের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পাই।’ পরে অনুষ্ঠান মঞ্চে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে পাশে বসান। শেখ হাসিনার দোয়া পেয়ে বেশ হাস্যোজ্জ্বল ছিলেন নুর।
 
কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনে হামলা ও অগ্নিসংযোগের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কোটা আন্দোলন করছে, যুক্তি দিয়ে আন্দোলনের বিষয়টি বলতে হবে। কিন্তু ভিসির বাড়িতে আক্রমণ, ভিসির গাড়িতে আগুন দেওয়া কখনোই গ্রহণযোগ্য না।
 
শেখ হাসিনা বলেন, ‘বিএনপির আমল থেকে ডাকসু নির্বাচন বন্ধ ছিল। ডাকসু নির্বাচনটা চ্যালেঞ্জ ছিল আমাদের জন্য। আমরা সেটা করতে পেরেছি।’ ডাকসু নির্বাচন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ডাকসু নির্বাচন যেন শান্তিপূর্ণ হয়, এটা সব সময় বলেছি। নির্বাচনে ভিপি পদে হেরে যাওয়া শোভনের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভোটে হারার পর শোভন আমার কাছে এসেছে। আমি শোভনকে বলেছি, ভোটে হেরেছ, এবার যাও তাকে (নুর) অভিনন্দন জানাও। সে তাই করেছে। আমি এজন্য শোভনকে ধন্যবাদ জানাই। ডাকসু নেতাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে আমাদের এগুতে হবে, লাখো শহীদের বিনিময়ে অর্জিত দেশকে গড়তে হবে।
 
শেখ হাসিনা বলেন, ‘পড়াশুনার পাশাপাশি আমাদের সংস্কৃতি চর্চা, খেলাধুলা— এ সব দিকেও মনোযোগ থাকতে হবে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা ওয়াই-ফাইসহ বিভিন্ন ডিজিটাল সার্ভিসের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরিকে ডিজিটালাইজড করে দেওয়া হবে। পাশপাশি পাবলিক লাইব্রেরিও উন্নত করা হবে।’ ডাকসু নেতাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘তোমাদের দেওয়া বক্তব্য থেকে আমি কিছু বিষয় নোট করেছি; লিফটের ব্যবস্থা করবো, পাশাপাশি জরাজীর্ণ ফ্যান পাল্টে নতুন ফ্যানের ব্যবস্থা হবে।
 
অনুষ্ঠানে ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন, ডাকসুর ভিপি নুরুল হক নুর, জিএস ও ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮টি হল ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরাও বক্তব্য রাখেন।
 
ডাকসু ভিপি নুর গণভবনে গেলেন গাড়িতে, অন্যরা বাসে
 
শনিবার বেলা ২টা থেকে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে আসতে শুরু করেন ডাকসু ও হল সংসদের নির্বাচিতরা। ছাত্রলীগের নেতারা ফটো সেশন করেন এবং আনন্দ-উল্লাস করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসারদের জন্য বরাদ্দ করা ১১টি বাসে তারা গণভবনে পৌঁছান। সবার শেষে বিকাল ৩টার দিকে একটি প্রাইভেটকারে গণভবনে পৌঁছান ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুর। উবারের ভাড়া প্রাইভেটকারে করে গণভবনে যান। ওই গাড়িতে ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক আকতার হোসেনও ছিলেন। ভিপি নুরুল হক নুর ডাকসু কার্যকর করতে প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন।
 
অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ, জাহাঙ্গীর কবির নানক, ত্রাণ ও সমাজ কল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী, সাংগঠনিক সম্পাদক বাহাউদ্দিন নাছিম, বিএম মোজাম্মেল হক, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য মো. আক্তারুজ্জামান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
 
“সন্ত্রাস চিরতরে বন্ধ করার ব্যবস্থা নিন”
 
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সন্ত্রাস চিরতরে বন্ধ করতে কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, যারা জঙ্গি-সন্ত্রাসী, তাদের কোনো ধর্ম, জাতি ও দেশও নেই। তারা সন্ত্রাসী, তাদের সন্ত্রাসী হিসেবে দেখে ব্যবস্থা নিতে হবে। সন্ত্রাস যাতে চিরতরে বন্ধ হয় সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। গতকাল শনিবার সকালে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে দ্বিতীয় কাঁচপুর সেতু, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ভুলতায় ৪ লেন ফ্লাইওভার এবং লতিফপুর রেলওয়ে ওভারপাস উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
 
নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে মসজিদে সন্ত্রাসী হামলায় হতাহতদের প্রতি গভীর শোক ও সমবেদনার পাশাপাশি এ ঘটনায় বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের বেঁচে যাওয়ায় আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেন প্রধানমন্ত্রী। একই সাথে এ ঘটনাকে ‘ঘৃণ্য সন্ত্রাসী’ ও ‘জঙ্গিবাদী ঘটনা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে এ ধরনের ঘটনা বন্ধে বিশ্ববাসীকে একযোগে পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আগামীতে যেখানেই আমাদের ক্রিকেট টিম পাঠাবো সেখানে অন্তত তাদের নিরাপত্তার বিষয়টা আমরা ভালোভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেই পাঠাবো।
 
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের উত্তরাঞ্চলের সাথে সড়ক যোগাযোগের উন্নয়ন এবং প্রতিবেশি রাষ্ট্রগুলোর সাথে উপআঞ্চলিক সড়ক যোগাযোগ উন্নীতকরণের লক্ষ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম জাতীয় মহাসড়কের নবম কি.মি.এ নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও উপজেলার শীতলক্ষ্যা নদীর ওপর জাইকার অর্থায়নে এই দ্বিতীয় কাঁচপুর সেতুটি নির্মিত হচ্ছে। তিনি এ সময় মেঘনা সেতু এবং মেঘনা-গোমতি সেতুর জরাজীর্ণতার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, ২য় কাঁচপুর সেতুসহ এই তিনটি সেতুই জাইকার অর্থায়নে তৈরি হবে। ঢাকা-সিলেট সড়কটিও চারলেনের করে দিতে সরকার প্রকল্প গ্রহণ করেছে উল্লে­খ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ব্রিজ এবং ওভারপাসগুলোও যেন চারলেনের হয় সেই ব্যবস্থ্াই তার সরকার নিচ্ছে।
 
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় আবেগঘন বক্তৃতা দেন নবনির্বাচিত ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুর। প্রধানমন্ত্রীকে মাতৃত্বের আসনে বসিয়ে ভিপি নুর বলেন, আমি ছাত্রলীগের স্কুল কমিটিতে দপ্তর সম্পাদক ছিলাম। ২০১৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষে থাকা অবস্থায় উপ-মানবসম্পদ উন্নয়ন বিষয়ক সম্পাদক পদে ছিলাম। অথচ কোটা সংস্কার আন্দোলনের কারণে, বিনয়ের সঙ্গে বলবো যে, আমার ছাত্রলীগের ভাই-বন্ধুরা কেন যেন আমাকে জামায়াত-শিবির বানানোর জন্য অপপ্রচার তুলেছিল। আমার পুরো পরিবার ছিল আওয়ামী লীগ ব্যাকগ্রাউন্ডের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরে তিনি বলেন, শেখ হাসিনা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন এবং ডাকসুর নেতারা সবসময় তার পাশে থাকবে।
 
বক্তব্যের শুরুতেই ডাকসু ভিপি বলেন, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা, যার নেতৃত্বে বর্তমান বাংলাদেশ বিশ্বে উন্নয়নের রোলমডেল হিসেবে পরিচিত এবং তার লিডারশিপের কারণে আমরা দেখেছি যে, বিশ্বে বড় বড় নেতাদের মাঝে তিনি স্থান করে নিয়েছেন।
 
 
২৮ বছর পরে ডাকসু নির্বাচন দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, তিনি রিস্ক নিয়েছেন। কারণ ১৯৯০ পরবর্তী যে সরকারগুলো এসেছে তারা কেউ ডাকসু নির্বাচনের রিস্ক নিতে চাননি। নির্বাচনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, ১০০ শতাংশ পিউরিটি সব কাজে পাওয়া যায় না। কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকবে। তবে প্রতিবছর যেন ডাকসু নির্বাচনের ধারাবাহিকতা থাকে সেই অনুরোধ জানান নবনির্বাচিত এই ডাকসু ভিপি।
 
ইত্তেফাক/নূহু