ঢাকা মঙ্গলবার, ২০ আগস্ট ২০১৯, ৫ ভাদ্র ১৪২৬
৩২ °সে


শ্রম নিরাপত্তায় স্বীকৃতি মিলেছে বাংলাদেশের

শ্রম নিরাপত্তায় স্বীকৃতি মিলেছে বাংলাদেশের
পোশাক কারখানা। ফাইল ছবি।

একটি শিল্প দুর্ঘটনা কীভাবে একটি দেশের শ্রম নিরাপত্তায় (কমপ্লায়েন্স) ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে - তার দৃষ্টান্ত স্থাপন করলো বাংলাদেশ। ঠিক ছয় বছর আগে ২০১৩ সালের এই দিনে ঢাকার অদূরে রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় ১ হাজার ১৩৮ জন শ্রমিক নিহত হন। আহত হয় আরো প্রায় দুই হাজার শ্রমিক। এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহত্ শিল্প দুর্ঘটনা হিসেবে পরিচিতি পায়। বিশ্বব্যাপী ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে বাংলাদেশ।

শুধু তা-ই নয়, বাংলাদেশ থেকে পোশাক ক্রয় করা আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতারা চাপে পড়ে। বাংলাদেশ থেকে শ্রমিকের রক্তমাখা পোশাক না কিনতে ইউরোপব্যাপী বিভিন্ন ব্র্যান্ডের দোকানের সামনে মানববন্ধনও করা হয়। কোনো কোনো ক্রেতা বাংলাদেশের মত একটি ‘দুর্বল শ্রম নিরাপত্তার’ দেশ থেকে পোশাক না কেনারও সিদ্ধান্ত নেন। ওই সময়ে রফতানির প্রায় ৮০ শতাংশ অবদান রাখা গার্মেন্টসের এমন নাজুক পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে বাংলাদেশ।

এর পরের ছয় বছরের গল্প কেবল উঠে দাঁড়ানোর। ইউরোপ ও আমেরিকার ক্রেতাদের সমন্বয়ে গঠিত অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স বাংলাদেশের গার্মেন্টস কারখানার ভবন, অগ্নি ও বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরীক্ষা করে সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। তাদের সংস্কারের আওতায় থাকা প্রায় দুই হাজার দুইশ’ কারখানায় ইতিমধ্যে ৯২ শতাংশের বেশি সংস্কার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। পাঁচ বছরের সংস্কার কাজ শেষ করে গত ডিসেম্বর কার্যক্রম গুটিয়ে নিয়েছে অ্যালায়েন্স। এ সময় অ্যালায়েন্সের প্রধান জিম মরিয়ার্টির মূল্যায়ন ছিল, গার্মেন্টসে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপত্তাহীন কর্মপরিবেশ থেকে এখন সবচেয়ে নিরাপদ কর্মপরিবেশের দেশ।

অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের আওতার বাইরে থাকা প্রায় দেড় হাজার কারখানার সংস্কার কাজ দেখভাল করছে শ্রম মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই)। এছাড়া ইউরোপ ও আমেরিকার কয়েকটি দেশের উদ্যোগে গঠিত হয়েছে ‘সাসটেইনেবিলিটি কমপ্যাক্ট’। এটিও সময়ে সময়ে এদেশে গার্মেন্টসে কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের নিরাপত্তা ও শ্রম অধিকার পর্যালোচনা করে।

কারখানা মালিকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, গত ছয় বছর ধরে কারখানাকে কমপ্লায়েন্ট করতে এক একটি কারখানাকে গড়ে ৫ কোটি টাকা করে খরচ করতে হয়েছে। কারখানার তদারককারী সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতাও বাড়ানো হয়েছে। এসব কারণে গত ছয় বছরে গর্মেন্টসে বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা দেখা যায়নি। কিছু দুর্ঘটনা ঘটলেও তাতে তেমন জীবনহানির ঘটনা ঘটেনি।

ফলে ধীরে ধীরে বাংলাদেশের সঙ্গে ব্যবসা বাড়াতে আস্থা ফিরছে ক্রেতাদের মধ্যে। এর প্রমাণ দেখা গেছে রফতানির চিত্রেও। গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে গার্মেন্টস রফতানি বেড়েছিল ৮ দশমিক ৭৬ শতাংশ। একই বছরে গার্মেন্টস রফতানি ৩০ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক ছাড়ায়। আর চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত ৯ মাসে পূর্বের অর্থবছরের চেয়ে বেড়েছে ১৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ। রফতানির পরিমাণ ২ হাজার ছয়শ’ কোটি ডলার।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, গত ছয় বছরে দুই দফা শ্রম আইনের সংশোধন করে শ্রমিকবান্ধব করার চেষ্টা করা হয়েছে। ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের কিছু বাধা দূর করা হয়েছে। ফলে শ্রমিকদের মধ্যে ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের হারও বেড়েছে। ২০১৩ সালে যেখানে ট্রেড ইউনিয়নের সংখ্যা ছিল ৫০-এর নিচে, বর্তমানে তা ৭৫৩টিতে দাঁড়িয়েছে। দুর্ঘটনায় শ্রমিকের ক্ষতিপূরণ বেড়েছে।

অর্থনীতিবিদ ও পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর ইত্তেফাককে বলেন, রানা প্লাজার পর বাংলাদেশের গার্মেন্টস রপ্তানিতে যে ধস নামার আশঙ্কা করা হচ্ছিল, তা প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে। এক্ষেত্রে শিল্পোদ্যোক্তা, সরকার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একটি বড় ইতিবাচক ভূমিকা ছিল। অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স সম্পর্কে যা-ই বলা হোক, তারা অসাধারণ কাজ করেছে। কারখানা মালিকদের কিছু খরচ বাড়লেও এখানে কাজের পরিবেশ ভালো— এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পাচ্ছে।

গার্মেন্টস রপ্তানিকারক ও ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন ইত্তেফাককে বলেন, বাংলাদেশই একমাত্র দেশ এ ধরনের পরিস্থিতিতে পড়ে সেখান থেকে সফলভাবে বেরিয়ে আসতে পেরেছে। আমাদের ওপর ক্রেতাদের আস্থা ফিরেছে। তবে এজন্য একেকটি কারখানাকে ৫ থেকে ২০ কোটি টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হয়েছে। আর রপ্তানি বাড়লেও উদ্যোক্তাদের মুনাফা করা কঠিন হচ্ছে বলে জানান তিনি। এ পরিস্থিতিতে উদ্যোক্তাদের টিকে থাকাই এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।

উদ্যোক্তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে গিয়ে অপেক্ষাকৃত ছোটো কারখানার পক্ষে ব্যবসায়ে টিকে থাকা সম্ভব হচ্ছে না। গত ছয় বছরে প্রায় ১২শ কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু একই সময়ে ভালো কর্মপরিবেশ সম্পন্ন বেশকিছু কারখানাও গড়ে উঠেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) হিসাব অনুযায়ী, আলোচ্য সময়ে নতুন ৮৫০টি কারখানা এ খাতে যুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৬৭টি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পরিবেশবান্ধব কারখানা রয়েছে।

আরও পড়ুনঃ খুলনায় চাঁদাবাজির অভিযোগে দুই পুলিশ সদস্য আটক

উচ্চ আদালতের আদেশে আটকে বিচার কাজ বহুল আলোচিত রানা প্লাজা ধসের পর ছয় বছর পার হলেও উচ্চ আদালতের আদেশে হত্যা মামলার বিচার কার্যক্রম আটকে আছে। ২০১৬ সালে এ মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতে অভিযোগ গঠন করা হয়। কিন্তু কয়েকজন আসামির আবেদনে মামলার কার্যক্রমের উপর স্থগিতাদেশ দেয় হাইকোর্ট।

ইত্তেফাক/নূহু

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
২০ আগস্ট, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন