যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রে ১০০ বছরে সর্বোচ্চ বিপৎসীমায় পানি

যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রে ১০০ বছরে সর্বোচ্চ বিপৎসীমায় পানি
বন্যার পানিতে ডুবে গেছে ঘরবাড়ি। তাই এলাকার বেশিরভাগ মানুষ আশ্রয় নিয়েছে পার্শ্ববর্তী আশ্রয়কেন্দ্রে। আশ্রয়কেন্দ্র থেকে ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় করে ঘরবাড়ির খোঁজখবর নিতে হয়। ছবিটি কুড়িগ্রামের উলিপুর থেকে গতকাল তোলা —সামসুল হায়দার বাদশা

বুধবার বেলা তিনটা পর্যন্ত যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের পানি বৃদ্ধি পেয়ে বাহাদুরাবাদঘাট পয়েন্টে বিপৎসীমায় ১৬২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। জামালপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী নবকুমার চৌধুরী ও পানি মাপক গেজ পাঠক আব্দুল মান্নান জানান, ১৯৮৮ সালে ১২২ সেন্টিমিটার ও ২০১৭ সালে ১৩৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের পানি প্রবাহিত হয়। গত ১০০ বছরের মধ্যে যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রে পানি সর্বোচ্চ বিপৎসীমা অতিক্রম করছে।

পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের তীরবর্তী জেলাগুলোয় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। গাইবান্ধা, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া শেরপুর ও টাঙ্গাইলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। সিলেট, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। গতকাল আঞ্চলিক অফিস, জেলা প্রতিনিধি ও উপজেলা সংবাদদাতাদের পাঠানো রিপোর্টে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

প্রধান নদ-নদীর পানি আরো বাড়ার আশঙ্কা : পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল দেশের ২৩টি পয়েন্টে প্রধান নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। বাংলাদেশ ও ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তর জানাচ্ছে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্র-যমুনা ও গঙ্গা-পদ্মার পানি বাড়তে পারে। কুড়িগ্রাম, জামালপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, মানিকগঞ্জ ও ফরিদপুরে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে। নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও সিলেট জেলায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

আরও পড়ুন: বিআইডব্লিউটিএর অভিযান : ৬১টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ

চার জেলার সঙ্গে ঢাকার ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ : রেললাইন পানিতে ডুবে যাওয়ায় ঢাকার সঙ্গে গাইবান্ধা, রংপুর, দিনাজপুর ও লালমনিরহাটের রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। গাইবান্ধা রেল স্টেশন মাস্টার আবুল কাশেম জানান, জেলার বাদিয়াখালি এলাকায় রেললাইনের ছয় কিলোমিটার পথ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় গতকাল বেলা সাড়ে ১১টা থেকে ট্রেন চালানো বন্ধ রেখেছেন তারা। এছাড়া জামালপুরের ইসলামপুর স্টেশন মাস্টার মো. মিজানুর রহমান জানান, দেওয়ানগঞ্জ-মেলান্দহ দুরমুঠ রেললাইন পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় জামালপুর-দেওয়ানগঞ্জের ট্রেন চলা বন্ধ রয়েছে। তবে ঢাকা-জামালপুর পর্যন্ত ট্রেন চলাচল করছে।

এদিকে বন্যায় গৃহপালিত পশু-পাখি নিয়ে বিপদে পড়েছে মানুষ। শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানি, গো-খাদ্যের চরম সংকট দেখা দিয়েছে। সরকারি ত্রাণ বিভিন্ন স্থানে বিতরণ হলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা ছিল কম। আবার অনেক দুর্গম চরাঞ্চলে পৌঁছানো যায়নি ত্রাণসামগ্রী। জামালপুরের সাতটি উপজেলার ৬৮টি ইউনিয়নের মধ্যে ৪৯টি ইউনিয়নসহ তিনটি পৌরসভা বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রায় চার লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ৬৩৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। মেলান্দহে বাঁধ ভেঙে নতুন করে ৩০ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। শেরপুরে চরের প্রায় দুই শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। শ্রীবরদী উপজেলায় মঙ্গলবার বিকালে বন্যার পানিতে ডুবে আব্দুল হামিদ নামে ৯ বছরের আরো এক শিশু মারা গেছে। ঝিনাইগাতীর সারিকালিনগর এলাকায় দুই দিন নিখোঁজ থাকার পর বন্যার পানিতে ভাসমান অবস্থায় আছিয়া বেগম নামে শতবর্ষী বৃদ্ধার লাশ উদ্ধার হয়েছে। এনিয়ে গত চার দিনে চার জন মারা গেছে। সিরাজগঞ্জ সদরসহ কাজিপুর, বেলকুচি, শাহজাদপুর, চৌহালিতে লক্ষাধিক মানুষ বন্যায় দুর্ভোগে পড়েছে। কাজিপুরে রিংবাঁধে হঠাত্ করে ধস নেমে থানায় যাবার পাকা রাস্তা পানিতে তলিয়ে গেছে। টাঙ্গাইলের নাগরপুর ও ভূঞাপুরে নতুন করে কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ভূঞাপুরে ৩৭টি বিদ্যাপীঠ বন্ধ রয়েছে। নওগাঁর মান্দায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে ১৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। গাইবান্ধা সদর, সুন্দরগঞ্জ, সাঘাটা ও ফুলছড়ি উপজেলায় চার লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বন্ধ রয়েছে ১৭৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২৯ হাজার ঘরবাড়ি। কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীতে ৮০ হাজার মানুষসহ জেলায় চার শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়ে প্রায় ছয় লাখ মানুষ পানিবন্দি। বগুড়ার সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনটে প্রায় ৯০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। সারিয়াকান্দির অন্তত ১২ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

মৌলভীবাজারে তিন নদের পানি কমলেও বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কমলগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। এ উপজেলায় বন্যায় প্রায় ৫৫ হেক্টরের বীজতলা ও সবজি ক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ইত্তেফাক/এমআরএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত