ঢাকা শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৫ আশ্বিন ১৪২৬
২৮ °সে


নৌ ও পাহাড়ি পথে দেশে ঢুকছে ইয়াবা

শহরে ব্যবহার কমলেও বেড়েছে গ্রামাঞ্চলে, অক্টোবরে বাংলাদেশ-ভারত মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ডিজি পর্যায়ের বৈঠক
নৌ ও পাহাড়ি পথে দেশে ঢুকছে ইয়াবা
গুগল ম্যাপ থেকে

নৌপথ আর পাহাড়ি এলাকা দিয়ে পাচার হয়ে রাজধানীসহ সারাদেশে আসছে ইয়াবার বড়ো বড়ো চালান। ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ, সাঁড়াশি অভিযান, মামলা, আত্মসমর্পণ—সবই চলছে ইয়াবা সাম্রাজ্য টেকনাফে। তবু বন্ধ হয়নি ইয়াবার কারবার। নৌপথে ইয়াবা ঢুকছে টেকনাফে। আর টেকনাফ থেকে নৌপথে কুয়াকাটা, বরিশাল হয়ে ঢাকায় আসছে। আবার ঢাকা থেকে বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা শহরে যাচ্ছে। সেখান থেকে নানা হাতবদল হয়ে যাচ্ছে সারাদেশের গ্রামাঞ্চলে। এছাড়া বর্তমানে বিকল্প রুটে ভারত থেকে সিলেটের জকিগঞ্জ ও বাল্লা এবং কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্ত দিয়েও অবাধে ঢুকছে ইয়াবা।

র‌্যাব, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাদকবিরোধী সাঁড়াশি অভিযানের ফলে শহরে ইয়াবার ব্যবহার কমলেও গ্রামে বিস্তার বেশি। সেখান থেকে কাঁচা টাকা লুটে নিচ্ছেন আড়ালে থাকা ইয়াবা কারবারিরা। তবে আগের চেয়ে জৌলুস কমেছে ব্যবসার। এখন কেউ প্রকাশ্যে ইয়াবা বিক্রি করছে না, করছে গোপনে। এমন পরিস্থিতিতে নৌপথে ইয়াবা পাচার রোধ করতে আগামী ১০, ১১ ও ১২ অক্টোবর বাংলাদেশ-ভারত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ডিজি পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।

‘ক্রেজি ড্রাগ’ ইয়াবা এখন অনেকটা মহামারি রূপ নিয়েছে গ্রামাঞ্চলে। প্রায় প্রতিটি গ্রামের আনাচেকানাচে পর্যন্ত বিস্তার ঘটেছে নীরব ঘাতক ইয়াবা ট্যাবলেটের। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও বহন করছে এই মরণ বড়ি। রাজনীতিকদের একটি অংশ এই ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে। ইয়াবায় আসক্ত নেই এমন কোনো পেশার লোক পাওয়া যাবে না। শ্রমজীবী থেকে শুরু করে একেবারে সব পেশার মধ্যে ইয়াবা আসক্ত রয়েছে। গ্রামে ইয়াবা খাওয়ার যুক্তি হিসেবে বলা হচ্ছে, নিয়মিত ইয়াবা খেলে শরীরে শক্তি বাড়ে। তবে ইয়াবায় আসক্ত হওয়ার পর প্রথমে শক্তি বাড়লেও পরে ধীরে ধীরে শক্তি কমিয়ে দেয়। উত্তেজিত হয়ে আসক্তরা নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে। ধর্ষণ ও খুনের মামলার আসামিদের অধিকাংশই ইয়াবায় আসক্ত। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, সামাজিক অবক্ষয়ের মূলে এই ইয়াবা সেবন। এর কারণে সন্তান মা-বাবাকে মারছে। খুন, চুরি, ডাকাতির ঘটনাও ঘটছে। ইয়াবার ভয়াবহ আগ্রাসন আগামী প্রজন্মকে ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে।

ইয়াবার ভয়াবহ আগ্রাসন নিয়ে সরকার যেমন উদ্বিগ্ন, চিন্তিত অভিভাবক মহলও। ইয়াবা পাচারে একশ্রেণির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তা, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা জড়িত থাকায় এটা নিয়ন্ত্রণ অনেকটা দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। র্যাব, পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা জানান, নতুন কৌশেলে ইয়াবা পাচার করা হচ্ছে। পুলিশ, বিজিবি, র্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী সড়কপথে তত্পরতা বৃদ্ধি করায় ইয়াবা ব্যবসায়ীরা বড়ো চালান পাচারের জন্য নৌপথকে নিরাপদ রুট হিসেবে বেছে নিয়েছে। শহরাঞ্চলে ইয়াবা এখন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। প্রশাসনের কড়াকড়ির কারণে সাগরপথে মানব পাচার প্রায় বন্ধ থাকায় ইয়াবা পাচারে জড়িয়ে পড়েছে পাচারকারীরা। নৌপথে ইয়াবা পাচারে সহায়তা করছে কিছু ফিশিং ট্রলারের মালিক এবং জেলে। একশ্রেণির জেলে মাছ ধরার নামে তা বহন করে। তাদের হাত ধরে ইয়াবার চালানগুলো কূলে উঠছে। সেখান থেকে ছড়িয়ে পড়ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। ‘বোট টু বোট’ ইয়াবার চালান দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাচ্ছে। গভীর সমুদ্রেও ইয়াবা চালানের হাতবদল হচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজের মাধ্যমে, কন্টেইনারের মাধ্যমেও ইয়াবা আসছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ছাড়াও টেকনাফ, খুলনা, বাগেরহাট, বরিশাল, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, ভোলাসহ দেশের প্রায় সব নৌপথ দিয়ে ইয়াবা পাচার হচ্ছে।

পার্বত্য অঞ্চলের ২৫ কিলোমিটার বর্ডার অরক্ষিত। সেখান দিয়েও প্রবেশ করছে ইয়াবা। গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, সিলেটের জকিগঞ্জ ও বাল্লা সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা আসছে। এটি ইয়াবা পাচারের নতুন রুট। ওপারে ভারতের আসাম, মিজোরাম ও মেঘালয়ে ইয়াবা তৈরির কারখানা গড়ে উঠেছে। সেখান থেকে ইয়াবা আসছে। এ বিষয়টি দুই দেশের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ডিজি পর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশ তুলে ধরবে বলে জানা গেছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিচালক (অপারেশন) মাসুম রাব্বানি ইত্তেফাককে জানান, রাজধানীসহ বড়ো বড়ো শহর এলাকায় শক্তিশালী অভিযানের কারণে ইয়াবা অনেকটা নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। তবে গ্রামাঞ্চলে ইয়াবা ছড়িয়ে পড়েছে। তাই গ্রামে শক্তিশালী অভিযান পরিচালনা করতে হবে। তিনি বলেন, ইয়াবার পাশাপাশি মাদকের নতুন সংযোজন এলএসডি এখন আসছে। নৌপথ, আকাশ পথ ও সীমান্ত দিয়ে মাদক এখনো আসছে বলে তিনি জানান।

এদিকে চট্টগ্রামে হঠাৎ বেড়েছে ইয়াবার চোরাচালান। ঈদুল আজহার কয়েক দিন আগে থেকে এই প্রবণতা শুরু হয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ইয়াবার ছোটো-বড়ো চালান ধরা পড়ছে। ইয়াবা পরিবহনে ব্যবহূত কাভার্ড ভ্যান, বাস, ট্রাকসহ কমপক্ষে ২০ জন আটক হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে একজন রাতারাতি বড়োলোক হওয়ার আশায় মধ্যপ্রাচ্যের চাকরি বাদ দিয়ে দেশে এসে ইয়াবা ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছেন। চট্টগ্রাম কারাগারের ভেতরেও চলছে ইয়াবার রমরমা ব্যবসা। কারারক্ষীদের সহায়তায় কিছু কিছু বন্দি এই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। গত ১৫ জুন ইয়াবাসহ একজন কারারক্ষী এবং তার পরদিন এক বন্দির পেট থেকে ৩০০ ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। কারা কর্তৃপক্ষের দাবি, মামলার হাজিরা দিতে গিয়ে আদালত চত্বর থেকে ইয়াবা নিয়ে আসে বন্দিরা। ইয়াবা ব্যবসায় পুলিশ, ছাত্র, জনপ্রতিনিধির পাশাপাশি এমনকি গৃহবধূরাও জড়িয়ে পড়ছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর জানাচ্ছে, কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে মিয়ানমার থেকে পশু আমদানির পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ ইয়াবাও এসেছে। সুস্পষ্ট তথ্য ছাড়া যত্রতত্র গরুর ট্রাক না থামাতে পুলিশের ওপর নির্দেশনা থাকায় ইয়াবা পাচারকারীরা অনেকটা বিনা বাধায় বড়ো বড়ো চালান এনেছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (চট্টগ্রাম মহানগর) উপপরিচালক শামীম আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, প্রশাসনের কঠোর নজরদারির কারণে মাঝখানে অনেকদিন ইয়াবা ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য কম ছিল। কিন্তু এরা আসলে কোরবানির ঈদের অপেক্ষায় ছিল। ঈদ সামনে রেখে মিয়ানমার থেকে গরু আসা শুরু হলে পাশাপাশি ইয়াবাও আসতে শুরু করে। যার কারণে গত কয়েকদিনে অনেকগুলো ইয়াবার চালান ধরা পড়েছে; যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে আমরা মনে করি। তিনি জানান, দীর্ঘদিন দেখেছি মিয়ানমার থেকে আনা ইয়াবার চালান চট্টগ্রামকে রুট হিসেবে ব্যবহার করে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হতো। তবে চট্টগ্রাম ভিত্তিক সিন্ডিকেট অনেক আগেই ভেঙে দেওয়া হয়েছে। গডফাদারদের অধিকাংশই হয়তো কারাগারে নয়তো বিদেশে পলাতক। কয়েকজন বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছে। একারণে চট্টগ্রাম আর সেভাবে রুট হিসেবে ব্যবহূত হয় না। তবে বিকল্প রুট হিসেবে ভারত হয়েও কিছু চালান এবার দেশে এসেছে। দেশের অন্যান্য স্থানে যেসব ইয়াবা ধরা পড়েছে তা মূলত ভারত থেকে আসা।

জানা গেছে, ১৯৯৭ সালে টেকনাফের সাইফুল করিম ওরফে হাজী সাইফুল নামে এক ব্যবসায়ীর মাধ্যমে মিয়ানমার থেকে ইয়াবার প্রথম চালান বাংলাদেশে আসে। টানা দুই দশক এই সাইফুল ছিলেন সীমান্তে ইয়াবা ব্যবসার অন্যতম নিয়ন্ত্রক। গত ৩০ মে টেকনাফে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ সাইফুল নিহত হওয়ার পর তার মাদক সাম্রাজ্যের অনেক অজানা তথ্যই প্রকাশিত হয়। সাইফুলের গডফাদার ও সহযোগী হিসেবে কক্সবাজারের একজন প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ ও কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার নাম উঠে আসে। কক্সবাজারের কিছু সাংবাদিক নামধারী দুর্বৃত্ত সাইফুলের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা পেত বলে পুলিশ দাবি করছে। সাইফুলের মৃত্যুর পর ইয়াবা ব্যবসায় খানিকটা ছন্দপতন ঘটলেও পুনরায় তারা সংগঠিত হচ্ছে বলে পুলিশ জানায়। বর্তমানে রুট পরিবর্তন করে ভারতের মিজোরাম, ত্রিপুরা হয়ে বাংলাদেশে ইয়াবা আসা শুরু হয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর কর্মকর্তা শামীম আহমেদ বলেন, দেশে ইয়াবার চাহিদা যতদিন না কমবে ততদিন এর চোরাচালানও রোধ করা যাবে না। চোরাকারবারিরা বিকল্প রুট দিয়ে যে কোনো মূল্যে ইয়াবা নিয়ে আসবেই।

আরও পড়ুন: ‌‘রিজভীর জন্য আপনাদের বিচারের কী প্রয়োজন’

র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) কর্নেল তোফায়েল মোস্তফা সরোয়ার বলেন, ইয়াবা পাচারকারীদের রুট পরিবর্তন হয়েছে—এমন তথ্য আমাদের কাছে আছে। কুড়িগ্রামের রৌমারীসহ উত্তরাঞ্চলে সীমান্ত দিয়ে ইয়াবাসহ মাদক বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। নৌপথেও র্যাবের পক্ষ থেকে টহলের ব্যবস্থা রয়েছে। মাদক ব্যবসায়ীরা যে ধরনের কৌশলের আশ্রয় নেবে, নিয়ন্ত্রণে আমরাও সেই ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

ইত্তেফাক/কেকে

এই পাতার আরো খবর -
  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
prayer-time
২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯
আর্কাইভ
বেটা
ভার্সন