ইতিহাস

নায়েব-নাজিম আমলে ঢাকা

প্রকাশ : ০৩ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  দেলওয়ার হাসান

ঢাকার নায়েব-নাজিম শাসনের পটভূমি

ঢাকা ১৬০৮ সাল (মতান্তরে ১৬১০) থেকে ১৭১৭ সাল পর্যন্ত মোগলদের অধীনে সুবা বাংলার রাজধানী ছিল। তবে ১৬৩৯ সালে শাহসুজা রাজধানী স্থানান্তর করলে জাহাঙ্গীর নগর বা ঢাকা সাময়িকভাবে রাজধানীর মর্যাদা হারায়। পরে মীর জুমলার আরাকান বিজয়ের পর সামরিক ও প্রশাসনিক গুরুত্বের কারণে ঢাকায় রাজধানী পুনঃপ্রতিষ্ঠা লাভ করে। ঢাকায় বসবাসকারী মোগল সুবাদার আজিম-উশ-সান ১৭০৩ সালে ফররুখ শিয়রকে ঢাকার শাসনভার পরিচালনার দায়িত্বভার দিয়ে ঢাকা ত্যাগ করেন এবং সুবাদারের দফতর পাটনায় সরিয়ে নেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও ১৭০৩-১৭১৬ সাল পর্যন্ত ঢাকায় নবাবী শাসন ও রাজধানী বহাল ছিল।

পিতা আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর ফররুখ শিয়রের শিশুপুত্র ফরখুন্দ শিয়রের পক্ষে মুর্শিদকুলি খানকে প্রথমে সহকারি সুবাদার ও পরে ১৭১৬ সালে পূর্ণ মর্যাদায় ‘সুবাদার’ হিসেবে নিয়োগ প্রদান করা হয়। তার সময়ে, ১৭১৭ সালে ঢাকা থেকে রাজধানী স্থায়ীভাবে মুর্শিদাবাদে স্থানান্তরিত হয়। তবে রাজস্ব ও প্রশাসনিক গুরুত্ব থাকায় পূর্বাঞ্চল শাসন করার জন্য সৃষ্টি করা হয় ‘নায়েবে-নাজিম’ বা ডেপুটি গর্ভনরের পদ। মুর্শিদকুলি খান সম্ভবত পূর্বেকার মোগল শাসনের ‘নাজিম’ এবং ‘দেওয়ান’ পদ দু’টি একীভূত করে ‘নায়েব-নাজিম’ পদটি সৃষ্টি করেন। ফলে ১৭১৭ সালে ঢাকা নায়েব নাজিমের প্রশাসনিক কেন্দ্রে পরিণত হয়।

 

ঢাকায় নায়েব নাজিম শাসন

১৭১৭ সাল থেকে ১৭৬৫ সাল অর্থাত্ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভ পর্যন্ত মোট বারোজন নায়েব নাজিম প্রায় ৫০ বত্সরকাল ঢাকা শাসন করেন। অতঃপর কোম্পানি শাসন চালু হওয়ার পর আরও ৬ জন নামমাত্র নায়েবে নাজিম ঢাকায় ডেপুটি হিসেবে দায়িত্বপালন করেছেন। ১৭৬৫ সাল থেকে ১৮২২ সাল পর্যন্ত এরা ছিলেন মূলত ক্ষমতাহীন ও নামসর্বস্ব নায়েবে নাজিম। অপরদিকে, ১৮২২ সাল থেকে ১৮৪৩ সাল পর্যন্ত বা শেষ নায়েব নাজিম গাজী উদ্দিন হায়দার পর্যন্ত যারা দায়িত্বপালন করেন তারা ছিলেন মূলতঃ নিছক পদবি ও সামান্য সরকারি বেতন ভাতার অধিকারী নায়েবে-নাজিম মাত্র।

প্রথমদিককার ঢাকার নায়েবে-নাজিমরা ঢাকার উপ-প্রশাসক হওয়া সত্ত্বেও অধিকাংশ সময় তারা ঢাকায় অবস্থান করতেন না। তাদের পক্ষে ঢাকায় প্রশাসন চালাতেন তাদের নিযুক্ত প্রতিনিধিগণ বা ডেপুটি নায়েবে নাজিমগণ।

 

কোম্পাানি আমলে নায়েব-নাজিমদের শাসন ক্ষমতা

কোম্পানির দেওয়ানি লাভ অর্থাত্ ১৭৬৫ সালের পরে নায়েবে-নাজিম বা তাদের প্রতিনিধিদের ক্ষমতার ক্ষেত্রে আপেক্ষিকতা দেখা দেয় এবং ক্ষেত্রবিশেষ তারা নামমাত্র নায়বে-নাজিমে পরিণত হন। কোম্পানি শাসনের পূর্বে অধিকাংশ নায়েব নাজিমরা ঢাকায় না থাকলেও কোম্পানি আমলে বেশিরভাগ নায়েবে নাজিম ঢাকায় বসবাস করতেন। তবে তাদের তেমন কোনো প্রশাসনিক কিংবা রাজস্ব বিষয়ক ক্ষমতা ছিল না। প্রত্যক্ষ কোনো ক্ষমতা না থাকলেও ঢাকায় তারা ছিলেন ‘আদি নবাব’ হিসেবে পরিচিত এবং ঢাকায় নবাবী আভিজাত্যের শেষ প্রতিনিধি। কোম্পানির ভাতা ছিল তাদের জীবিকা নির্বাহ এবং সামাজিক ব্যয়ভার  সংকুলানের একমাত্র উত্স।

১৭৭২ সালে লর্ড হেস্টিংসের শাসনামলে নতুন শাসন ব্যবস্থা চালু হয় এবং প্রত্যেক জেলায় কালেক্টর নিয়োগ প্রদান করা হয়। ফলে ঢাকা প্রশাসন একজন কালেক্টরের অধীনে চলে আসে। ফলে নায়েব-নাজিম বা তাদের প্রতিনিধিগণ কার্যত : ক্ষমতা হারায় এবং নামসর্বস্ব নায়েবে-নাজিমে পরিণত হয়।

ঢাকার নায়েব-নাজিমদের শাসনামলে ঢাকার প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব বহুল পরিমাণে হ্রাস পেয়েছিল। এমনকি ঢাকা থেকে রাজমহল ও মুর্শিদাবাদে রাজধানী স্থানান্তরের ফলে ঢাকার জনসংখ্যাও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ হ্রাস পায়। ইতোপূর্বেকার ঢাকার সমৃদ্ধ বাণিজ্য কেন্দ্রটি ম্রিয়মান হয়ে পড়ে। ইরান-তুরান এবং কাশ্মির থেকে আগত ব্যবসায়ীদের বড় অংশ এবং জগেশঠকেন্দ্রিক অর্থ লগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও মুর্শিদাবাদমুখী হয়ে পড়ে। তবে ঢাকা তখনও ইউরোপীয় বাণিজ্য কুঠি বহাল থাকার কারণে মসলিনের ব্যবসাটি কোনোরকমে ধরে রেখেছিল। যদিও পরবর্তীতে ক্রমশঃ পরিমাণের দিক থেকে তা হ্রাস পেতে থাকে। তবে আন্তঃআঞ্চলিক বাণিজ্য ধারাটি ঢাকায় পুরো অষ্টাদশ শতক ধরেই চালু ছিল।

নায়েবে-নাজিমদের ক্রম-তালিকা

ঢাকায় দায়িত্ব পালনকারী নায়েব-নাজিমদের পুর্নাঙ্গ তালিকা দীর্ঘ সময় ছিল অস্পষ্টতায় আরষ্ট। এর প্রধান কারণ ছিল সমসাময়িক রেকর্ডপত্রের কিছু বিভ্রান্তি ও অসম্পূর্ণ বিবরণ। ’সিরাতুল-উল-মুতাখেরিন’ ও প্রাপ্ত রেকর্ডপত্রের উপর ভিত্তি করে ঢাকার নায়েবে-নাজিমদের একটি ক্রম-তালিকা ও কালপঞ্জি তৈরি করেছেন এস.সি. ব্যানার্জি, যা এপর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যের উপর ভিত্তি করে একটি গ্রহণযোগ্য কালানুক্রমিক তালিকা। ঐতিহাসিক আবদুল করিমও এটি তাঁর গ্রন্থে অনুসরণ করেছেন। যা নিম্নরূপ :

১. ঢাকায় অবস্থানরত বাংলার নবাব [সারণী-১]

২. নবাবী আমলে ঢাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত নায়েবে নাজিমগণ [সারণী -২]

৩. কোম্পানি শাসনামলের উপাধি সর্বস্ব নায়েবে-নাজিম [সারণী-৩]

৪. ঢাকার নায়েব-নাজিমদের প্রতিনিধিগণ   [সারণী-৪]

 

সারণী : ১

মোগল আমলে (১৬১০-১৭১৭) ঢাকায় অবস্থানকারী বাংলার সুবাদারগণ

 

সুবাদার                  সময়কাল

ইসলাম খান চিশতী   ১৬১০-১৬১০ খ্রি.

কাশেম খান চিশতী    ১৬১৩-১৬১৭ খ্রি.

ইব্রাহিম খান ফতেজং  ১৬১৭-১৬২৪ খ্রি.

মহববত খান       ১৬২৫-১৬২৬ খ্রি.

মুকাররর খান       ১৬২৬-১৬২৭ খ্রি.

ফিদাই খান         ১৬২৭-১৬২৮ খ্রি.

কাসিম খান         ১৬২৮-১৬৩২ খ্রি.

আজম খান         ১৬৩২-১৬৩৫ খ্রি.

ইসলাম খান মাশহাদী ১৬৩৫-১৬৩৯ খ্রি.

শাহসুজা          ১৬৩৯-১৬৬০ খ্রি.

মির জুমলা         ১৬৬০-১৬৬৩ খ্রি.

শায়েস্তা খান        ১৬৬৩-১৬৭৮ খ্রি.

আজম খান        ১৬৭৮-১৬৭৯ খ্রি.

শায়েস্তা খান        ১৬৭৯-১৬৮৮ খ্রি.

ইব্রাহিম খান        ১৬৮৮-১৬৯৮ খ্রি.

আজমউদ্দিন        ১৬৯৮-১৭১২ খ্রি.

মুর্শিদকুলি খান      ১৭১২-১৭১৭ খ্রি.

 

সারণী :২

নবাবী আমলে ঢাকার নায়েবে-নাজিমগণ

নাম                             সময়কাল

খান মুহাম্মদ আলী খান ১৭১৭ খ্রি.

ইতিশাম খান        ১৭২৩-১৭২৬ খ্রি.

ইতিশাম খানের পুত্র   ১৭২৬-১৭২৭ খ্রি.

(নাম অজ্ঞাত)

মির্জা লুত্ফুল্লা      ১৭২৮-১৭৩৪ খ্রি.

সরফরাজ খান      ১৭৩৪-১৭৩৮ খ্রি.

মুরাদ আলী খান     ১৭৩৮-১৭৩৯ খ্রি.

আব্দুল ফাত্তাহ খান    ১৭৩৯-১৭৪০ খ্রি.

নওয়াজিস খান      ১৭৪০-১৭৫৪ খ্রি.

ডেপুটি হোসেনকুলি খান ১৭৪০-১৭৫৪ খ্রি

মুরাদদ্দৌলা        ১৭৫৪-১৭৫৬ খ্রি.                

 

সারণী :৩

কোম্পানি শাসনামলে ঢাকার নায়েবে-নাজিমগণ (১৭৬৫-১৮৪৩)

নাম                  সময়কাল  

জেসারত খান   ১৭৬৫ - ১৭৭৮    

হাসমত জং     ১৭৭৮ - ১৭৮৫    

নুসরত জং     ১৭৮৬ - ১৮২২    

শামসুদ্দৌল্লাহ   ১৮২২ - ১৮৩৯    

কমর-উদ-দৌল্লাহ     ১৮৩১ - ১৮৩৪    

গাজী উদ্দিন হায়দার    ১৮৩৪ - ১৮৪৩    

 

সারণী-৪

ঢাকার নায়েবে নাজিমদের প্রতিনিধিগণ

১. গালিব আলি খান (১৭৩৪ - ৩৮) [সরফরাজ খানের প্রতিনিধি]

২. মুরাদ আলী খান (১৭৩৮ - ১৭৩৯) [সরফরাজ খানের প্রতিনিধি]

৩. হুসেনকুলি খান (১৭৪০ - ৪৪) [নওয়াজিস খানের প্রতিনিধি]

৪. হুসেন উদ্দিন খান (১৭৪৪ - ৫৪) [হুসেনকুলি খানের প্রতিনিধি]

৫. মুরাদ দৌলত (১৭৫৪ - ১৭৫৫) [হোসেন উদ্দিন খানের মৃত্যুর পর নওয়াজিস খানের প্রতিনিধি]।

 

১৭০৩ সাল থেকে ১৭১৬ সাল পর্যন্ত ঢাকার শাসন কমকর্তাদের সম্পর্কে সুস্পষ্ট কোনো ধারণা পাওয়া যায় না। তবে ফার্সি গ্রন্থ ‘সিরাতুল মুতাখারিন’ ও জে.টি. র্যাংকিনের ‘ঢাকা ডায়েরি’ থেকে এ সময়কালের ঢাকার শাসকদের একটি তালিকা মেলে।

আগেই বলেছি যে, যুবরাজ আজিম-উস-শান ১৭০৩ সালে পাটনায় তার প্রশাসনিক দপ্তর স্থানান্তর করেন। তবে আজিম-উস-শানের পুত্র ফররুখ সিয়ার ১৭০৭ সাল পর্যন্ত ঢাকায় থাকলেও তাকে নায়েব-নাজিমের প্রতিনিধির ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল কিনা তা জানা যায় না। মুর্শিদ কুলি খা তার দেওয়ানি কার্যালয় মুর্শিদাবাদে স্থানান্তর করলে ঢাকা কেবল স্থানীয় প্রশাসকের সদর দপ্তরে পরিণত হয়। ১৭০৮-১৭০৯ সালে ঢাকার নায়েবে-নাজিম ছিলেন সরবুলন্দ খন। তিনি ছিলেন আজিম উস শানের প্রতিনিধি। তবে তিনিও মুর্শিদাবাদে বসবাস করতেন। ১৭১৩ সালে ফররুখ সিয়ারের শিশুপুত্র ফরখন্দ সিয়ারের প্রতিনিধি রূপে মুর্শিদকুলি খান নায়েব নাজিম হন। তার উপাধি ছিল ‘করতলব খান’। মুর্শিদকুলি খানের আমলে ঢাকা থেকে রাজধানী স্থায়ীভাবে স্থানান্তরিত হলে ঢাকা নায়েব-নাজিমদের শাসনে আসে। নিম্নে ঢাকার নায়েব-নাজিমদের শাসনকালের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া হলো।

নায়েবে-নাজিমদের সংক্ষিপ্ত বিবরণ

খান মোহাম্মদ আলী (১৭১৭) : ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঢাকা ফ্যাক্টরি রেকর্ড অনুসারে ঢাকায় বসবাসকারী প্রথম নায়েবের নাজিম ছিলেন খান মোহাম্মদ আলী। তার সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তেমন পাওয়া যায় না।

ইতিশাম খান (১৭২৩-২৬) : ১৭২৩ সালে ঢাকায় ইংরেজ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির কারখানা পুনঃস্থাপিত হয়। ঢাকার ব্যবসা বাণিজ্য দেখার জন্য ১৭২৩ সালেই ‘ঢাকা কাউন্সিল’ গঠিত হয়। ইতিশাম খান ঢাকার নায়েব-নাজিম থাকাকালে ঢাকা কাউন্সিলের প্রধান জনস্টক হাউস এবং কাউন্সিলের অপরাপর সদস্যরা ঢাকায় আসেন। তাদের বিবরণে ঢাকার সমকালীন নায়েব-নাজিমদের সম্পর্কে জানা যায়। ইতিশাম খান ইংরেজ কোম্পানির প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন বলে তাদের বিবরণে উল্লেখ আছে। ঢাকায় তিনি ইংরেজ ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা দেন। ফলে কোম্পানির নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী কোলকাতায় ফেরত যায়। কোম্পানির রিপোর্ট মতে, ১৭২৭ সালের ৯ মার্চ ইতিশাম খান ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।

সৈয়দ ইফতেখার খান (১৭২৬-১৭২৭) : ইতিশাম খানের পর তার পুত্র কিছুকাল জাহাঙ্গীর নগরের নাজিম ছিলেন বলে কাশিম বাজারের এক রেকর্ড থেকে অবগত হওয়া যায় কিন্তু তাহার নাম জানা যায় না। তবে নুসরাত জঙ্গের গ্রন্থে ইতিশাদ খানের সহকারি হিসেবে সৈয়দ ইফতেখার খানের নাম পাওয়া যায়।

মির্জা লুত্ফুল্লাহ (১৭২৮-১৭৩৪) : ঢাকার নায়েব-নাজিমদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মির্জা লুত্ফুল্লাহ। তিনি ইতিহাসে দ্বিতীয় মুর্শিদকুলি খান নামে পরিচিত। সুজা উদ্দিন খান মুর্শিদাবাদের নবাব হলে তিনি তার জামাতা মির্জা লুত্ফুল্লাহ ওরফে লুত্ফা আলী খানকে ১৭২৮ সালে ঢাকার নায়েবে-নাজিম নিযুক্ত করেন। তিনি শাসক হিসেবে ছিলেন অত্যন্ত কঠোর স্বভাবের। তিনি চুরি-ডাকাতি কঠোর হস্তে দমন করতে সক্ষম হন এবং জমিদার ও রাজ কর্মচারীদের নিজ নিজ এলাকায় শান্তি রক্ষার দায়িত্ব পালনে বাধ্য করেন। তিনি ছিলেন ইতিহাসেরও সমজদার। তার নির্দেশেই সমসায়িক ইতিহাসবিদ আজাদ খান হোসেনি রচনা করেন ‘নৌবাহার-ই-মুর্শিদকুলী খান’  নামক গ্রন্থ। ঢাকায় তিনি মুর্শিদাবাদের অনুকরণে ‘বেরা’ উত্সবকে পৃষ্ঠপোষকতা যোগাতেন এবং ঢাকায় তিনি নৌযুদ্ধে ব্যবহারের উপযোগী নৌযান তৈরি এবং নৌশিল্পের ব্যবসায়িক প্রসার ঘটান। মির্জা লুত্ফুল্লাহ ওরফে দ্বিতীয় মুর্শিদকুলি খান ঢাকায় মোট ছয় বছর নায়েবে-নাজিম ছিলেন। তার সময়ে ঢাকায় পাদশাহী বাজার প্রতিষ্ঠিত হয়, যা পরে ‘চকবাজার’ নামে পরিচিতি পায়।

সরফরাজ খান (১৭৩৪-১৭৩৮) : সুজা উদ্দিন খানের পুত্র তকি খান ছিলেন উড়িষ্যার নবাব। কিন্তু তকি খানের মৃত্যু হলে ঢাকার নায়েবে-নাজিম মির্জা লুত্ফুল্লাহকে উড়িষ্যার নায়েবে-নাজিম নিযুক্ত করেন এবং ঢাকার নায়েবে-নাজিম করা হয় সরফরাজ খানকে। তিনি প্রায় পাঁচ বছর ঢাকার নায়েবে-নাজিম ছিলেন। তিনিও অন্যান্য নায়েবে-নাজিমদের মতো মুর্শিদাবাদ থেকে প্রতিনিধিদের মাধ্যমে ঢাকা শাসন করতেন। ঢাকায় তার প্রতিনিধি ছিলেন গালিব আলি খান এবং তার দেওয়ান নিযুক্ত হয়েছিলেন যশবন্ত রায়। সরফরাজ আলী খানের আমলে ঢাকায় শান্তি ও সমৃদ্ধি বৃদ্ধি পায় এবং ব্যবসা ক্ষেত্রে প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়। এ সময় ঢাকায় মুর্শিদাবাদের ব্যাংকার জগত্ শেঠ বা ফতে চাঁদের উত্থান ঘটে। কথিত আছে যে, নওয়াব শায়েস্তা খানের ইতোপূর্বেকার বন্ধ করা ফটকটি দ্রব্যমূল্য শায়েস্তখানের প্রায় সমমানের হওয়ায় তাঁর আমলে আবার খুলে দেওয়া হয়। তা সত্ত্বেও বক্তিগত স্বেচ্ছাচারিতা ও ‘বৈকুণ্ঠ’ প্রথার জন্য তিনি কালিমা মুক্ত নন।

মুরাদ আলী খান (১৭৩৮-১৭৩৯) : সরফরাজ খানের ঢাকাস্থ প্রতিনিধিকে ১৭৩৭ সালে ঢাকা থেকে প্রত্যাহার করা হলে ঢাকার প্রতিনিধি হিসেবে তার স্থলাভিষিক্ত হন সৈয়দ মুরাদ আলী খান। তিনি ১৭৩৯ সালের এপ্রিল পর্যন্ত এ পদে কর্মরত ছিলেন। তবে তিনি তেমন সমাদৃত হতে পারেননি।

আবুল ফাত্তাহ খান (১৭৩৯-১৭৪০) : ১৭৩৯ সালের মে মাস থেকে ১৭৪০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ঢাকায় নায়েব-নাজিম হিসেবে নাম পাওয়া যায় আবদুল ফাত্তাহ খানের। তবে তার শাসনকাল সম্পর্কে ঢাকা ফ্যাক্টরি রেকর্ড থেকে তেমন কিছু জানা যায় না।

নওয়াজিস মুহম্মদ খান (১৭৪০-১৭৫৪) : ১৭৪০ সালে আলীবর্দী খান মুর্শিদাবাদের নবাব হলে তিনি তার ভ্রাতুষ্পুত্র ও জামাতা (ঘসেটি বেগমের স্বামী) নওয়াজিস মুহাম্মদ খানকে ঢাকা তথা জাহাঙ্গীর নগরের নায়েব-নাজিম নিযুক্ত করেন। তিনিও অধিকাংশ সময় মুর্শিদাবাদে কাটান এবং তার প্রতিনিধির মাধ্যমে ঢাকার শাসনকার্য চালাতেন। ‘মুতাখখেরিন’ নামক গ্রন্থে দেখা যায়, নওয়াজিস খান তার প্রতিনিধি হিসেবে নিযুক্ত করেছিলেন ঢাকায় বসবাসকারী হোসেন কুলী খানকে (১৭৪০-৫৫) এবং হোসেন উদ্দিন খানকে। রাজধানী মুর্শিদাবাদে বসবাসকারী নওয়াজিস খানের আমলে ঢাকায় হিন্দু ব্যবসায়ী শ্রেণির উত্থান ঘটে। ঢাকায় সাহা, বসাক, প্রভৃতি  বণিক শ্রেণি ও জগেশঠদের প্রাধান্য বৃদ্ধি পেতে থাকে। ফলে ঢাকার দুর্বল নায়েব-নাজিম প্রশাসনে তারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হস্তক্ষেপ করতে শুরু করেন। এদের মধ্যে রাজবল্লভ ও তদীয়পুত্র কৃষ্ণদাস প্রচুর রাজস্ব হরণ করে ঢাকা থেকে পলায়ন করে ফোর্ট উইলিয়ামে আশ্রয় নেয়। নওয়াজিস খান ১৭৫৪ সাল পর্যন্ত জাহাঙ্গীরনগরের নায়েবে-নাজিম ছিলেন।

ডেপুটি হোসেন কুলি খান (১৭৪০-১৭৪৪) : তিনি ছিলেন ঢাকার নায়েবে-নাজিম নওয়াজিস মুহম্মদ খানের ডেপুটি। ১৭৪০ সাল থেকে ১৭৪৪ সাল পর্যন্ত তিনি এ পদে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় প্রভাবশালী দেওয়ান গোকুল চাঁদ, হুসেন কুলী খানের বিরুদ্ধে মুর্শিদাবাদে অভিযোগ করে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। অতঃপর ঢাকার ফৌজদার ইয়াসিম খান তার স্থলাভিষিক্ত হন। কিন্তু হোসেনকুলি মুর্শিদাবাদে গিয়ে স্ত্রী ঘসেটি বেগমের সহায়তায় পূর্ব পদটি ফেরত পান এবং পুনরায় ঢাকায় নিজেকে সহকারি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন। এবারে তিনি গোকুল চাঁদকে পদচ্যুত করেন ও রাজবল্লভকে তার স্থলে নিযুক্ত করেন। এদিকে হোসেন কুলি খান তার ভ্রাতুষ্পুত্র হুসেন উদ্দিন খানকে ঢাকায় তার প্রতিনিধি নিযুক্ত করেন এবং তিনি ঢাকা ত্যাগ করেন। এ সময়ের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো বাখেরগঞ্জের জমিদার মোহাম্মদ বাকেরের পুত্র আগা সাদেকের সাথে হোসেন উদ্দিন খানের বিরোধ। পরিণতিতে আগা সাদেক ঢাকার ডেপুটি হোসেন উদ্দিনকে হত্যা করলে ঢাকাবাসীদের প্রতিরোধের সম্মুখীন হন। হোসেন উদ্দিনের মৃত্যুর পর হোসেন কুলী খা রাজ বল্লভকে ঢাকায় শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। ইংরেজ রেকর্ড থেকে দেখা যায় যে, ১৭৪১ সালে কোম্পাানি কর্মচারীরা ঢাকার নায়েব প্রতিনিধি হোসেন উদ্দিন খানের সাক্ষাত্ প্রার্থী হয়ে ব্যবসা করার সুযোগ বহাল রাখার অনুরোধ সত্বেও তিনি ইংরেজদের ঢাকায় ব্যবসা বন্ধ করে দেন। অতঃপর ঢাকা কাউন্সিল ব্যবসা চালুর লক্ষ্যে ঢাকার নায়েবে-নাজিম ও তাদের সভাসদদের নিন্মোক্তভাবে উপঢৌকন দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

 

সারণী - ৫

                              সিক্কা টাকা

১. নওয়াজিস মুহাম্মদ খান      : ২০,০০ টাকা

(নায়েবে-নাজিম)    

২. হুসেন কুলি খান           : ১০০০ ,,

৩. দিওয়ান বৃন্দাবন          : ১০০০ ,,

৪. হাজী হুসেন        : ৪১০ ,,

৫. নায়েব-নাজিম দফতরের     : ৩৫০ ,,

অন্যান্য কর্মকর্তা

তবে ধারণা করা হয় যে, নায়েবে নাজিম হোসেন কুলি খানের ঢাকাস্থ প্রতিনিধি ইংরেজদের ওপর অত্যাচার চালান এবং এ কারণে ১৭৪৮ সালে নায়েব নাজিম হোসেন কুলি খানের বিরুদ্ধে ইংরেজরা মুর্শিদাবাদে অভিযোগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

মুরাদদ্দৌলাহ (১৭৫৪ - ১৭৫৫): ১৭৫৪ সালে নায়েবে-নাজিম হোসেন কুলি খান নিজে এবং তার ভ্রাতুষ্পুত্র হোসেন উদ্দিন নিহত হলে নওয়াজিস মেহাম্মদ খান মুরাদদ্দৌলাহ খানকে ঢাকার নায়েবে নাজিম নিযুক্ত করেন। তিনি মাত্র দু’বত্সর এ দায়িত্বে ছিলেন।

পলাশী যুদ্ধের পর পরই ইংরেজরা ঢাকায় নায়েবে নাজিমদের পদ বিলোপ করেনি। তবে তাদের প্রতি কেবল অনুগত ব্যক্তিদেরকে এই পদে নিযুক্ত করতেন। অন্যদিকে এ সময় এ পদগুলো গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে। মূলত : জেসারত খানের শাসন শেষে ঢাকার নায়েব নাজিমেরা প্রকৃত ক্ষমতা হারায় এবং ইংরেজদের ভাতা ও বেতন ভোগকারী নাম সর্বস্ব নায়েবে নাজিমে পরিণত হন।

জেসারত খান (১৭৫৭-৬২) : হোসেন উদ্দিন খানের মৃত্যর পর ঢাকার নায়েবে নাজিম হিসেবে নিযুক্ত হন জেসারত খান। তার সময়ে বাংলা-বিহার উড়িষ্যার ভাগ্য নির্ধারণী পলাশীর যুদ্ধ সংঘটিত হয়। তিনি পলাশীর যুদ্ধের পরও ৫ বছর ঢাকায় ছিলেন। তবে মাঝখানে তিনি কিছুকাল পাটনায় কাটান। এ সময় জাহাঙ্গীর নগরের প্রশাসন চালান ‘সুইটন’ নামক একজন স্কটম্যান। তিনি ছিলেন ঢাকায় ইংরেজ প্রতিনিধি। ঢাকায় তিনি ‘সুলতান সাহেব’ নামে পরিচিত ছিলেন। ১৭৫৭ সালে ইংরেজদের সাথে নবাব সিরাজদ্দৌলার যুদ্ধ শুরু হলে জেসারত খানকে নবাব ঢাকা ফ্যাক্টরির ইংরেজদের বন্দি করার নির্দেশ দেন। কিন্তু জেসারত খান ইংরেজদের প্রতি অনুগ্রহ প্রদর্শন করে তাদের ফরাসি কুঠিতে আশ্রয় নেওয়ার অনুমতি প্রদান করেন।

মোহাম্মদ আলী (১৭৬২-১৭৬৩) : সিরাজুদ্দৌলার আমলে ইংজেদের প্রতি সদয় আচরণের কারণে মীর কাশিম জেসারত খানকে পদচ্যুত করে জনৈক মোহাম্মদ আলীকে জাহাঙ্গীর নগরের নায়েব নাজিম নিযুক্ত করেন। তিনি স্বল্পকাল এ দায়িত্বে ছিলেন।

মোহাম্মদ রেজা খান (১৭৬৩-১৭৬৫) : ১৭৬৩ সালে মীর জাফর দ্বিতীয়বারের মতো নবাব হলে তিনি মোহাম্মদ আলীর স্থলে মোহাম্মদ রেজা খানকে জাহাঙ্গীর নগরের নায়েবে নাজিম নিযুক্ত করেন। কিন্তু কোম্পানি দেওয়ানি লাভের পর রেজা খানকে মুর্শিদাবাদের নায়েবে নাজিম এবং জসরত খানকে ঢাকায় নায়েবকে নাজিম রূপে পুর্ণবহাল করেন। রেজা খানের সময়টা ছিল নানারকম অরাজকতা, নৈরাজ্য ও জলদস্যুদের তত্পরতায় অস্থির সময়। এ সময় ঢাকার রাজকর্মচারীরা ব্যক্তিগত ব্যবসায় জড়িত হয়ে পড়েন এবং ইংরেজদের ধন সম্পদ পাচারের মাত্রা বেড়ে যায়। তিনি ২ বত্সরকাল ঢাকার নায়বে-নাজিম ছিলেন। কিন্তু এ সময়টি ছিল ঘটনাবহুল ও তাত্পর্যপূর্ণ।

জেসারত খান (১৭৬৫ - ১৭৭৮) : ১৭৬৫ সালে কোম্পানির দেওয়ানি লভের পর ক্লাইভ পাটনা থেকে জেসারত খানকে এনে ঢাকায় দ্বিতীয়বারের মতো নায়েবে-নাজিম করেন। জেসারত খানের পুনঃবহালের সময়কাল থেকে প্রায় ১৩ বত্সর ঢাকার নায়েবে-নাজিমের দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু সেটা ছিল বাংলার তথা ঢাকার ইতিহাসে অত্যন্ত জটিল সময়। ছিয়াত্তরের মহামনন্তর, ফকির- সন্নাসী বিদ্রোহ ছিল অন্যতম। এ সময় দেওয়ানি লাভের পর ইংরেজদের আধিপত্য বৃদ্ধি পায়। তিনি একসময় পুরাতন কেল্লায় বসবাস করলেও ঢাকার ইংরেজ শাসক লে. সুইটন সেটিকে বসবাসের জন্য অধিগ্রহণ করলে তিনি বড় কাটরায় স্থানান্তরিত হয়।

তার আমলে ঢাকার অন্যতম স্থাপত্য কীর্তি হলো নিমতলী প্রাসাদ তৈরি। তার আদেশে এ প্রাসাদটি নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হলে তিনি সপরিবারে এখানে চলে আসেন এবং বসবাস শুরু করেন। নবাব জেসারত খান ১৭৭৯ সালে ঢাকায় মৃত্যু বরণ করলে ঢাকার নবাবগঞ্জ বাজারের কাছে তাকে সমাহিত করা হয়।

হাসমত জং (১৭৭৮-১৭৮৫) : নবাব জেসারত খানের মৃত্যুর পর তার পৌত্র হাসমত জংকে গভর্নর জেনারেল লর্ড কর্নওয়ালিস ঢাকার নায়েবে নাজিম নিযুক্ত করেন। তিনি প্রায় সাত বত্সর এ পদে আসীন ছিলেন। ১৭৯৬ সালে ঢাকায় তার মৃত্যু হলে নবাবগঞ্জে নবাব জেসারত খানের কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়।

নুসরত জং (১৭৮৫-১৮২২) : ঢাকার পরবর্তী নায়েবে-নাজিম হলেন খান বাহাদুর নুসরত জং। তিনি ছিলেন নবাব জেসারত খানের আরেক পৌত্র। নুসরত জং ছিলেন ঢাকার নায়েবে-নাজিমদের মধ্যে শিক্ষিত, লিপি বিশারদ ও চারুকলার পৃষ্ঠপোষক। তার সময়ে ঢাকার কালেক্টর ডি. ওয়েলি ১৮১৪ সালে নিমতলী দেউড়িতে দেখা করেন এবং ঢাকার বিভিন্ন স্থাপত্যের চিত্রাঙ্কনে উদ্বুদ্ধ হন। এছাড়া এ সময় আলম মুসাব্বির নামক একজন শিল্পী তার আদেশে ঢাকার মহরম ও ঈদ মিছিলের জলরংয়ের চিত্র অংকন করেন। তিনি বিদ্যানুরাগী ছিলেন। জনৈক ইংরেজ বন্ধুর অনুরোধে তিনি ফার্সি ভাষায় ‘তারিখ-ই নুসরাত জঙ্গী’ গ্রন্থটি রচনা করেন যা মূলত সমসাময়িককালের ঢাকা তথা বাংলার ইতিহাস এবং ১৮১৭ সালে এটি প্রকাশিত হয়। এশিয়াটিক সোসাইটি ২০০৫ সালে  ড. শরীফ উদ্দিনের সম্পাদনায় এর একটি ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশ করে।

নুসরত জং ১৮২২ সালে ঢাকায় ইন্তেকাল করেন এবং ঢাকায় হোসেনী দালানে তাকে সমাহিত করা হয় বলে ‘তারিখ-ই-নুসরাত জঙ্গী’ গ্রন্থে উল্লেখ আছে।

শামসুদ্দৌল্লা (১৮২২-১৮৩১) : নুসরত জং-এর মৃত্যুর পর তার কনিষ্ঠ ভ্রাতা নবাব শামসুদ্দৌলাকে ইংরেজরা মাসিক ৬ হাজার টাকা বেতনে ঢাকার নায়েবে নাজিম নিযুক্ত করেন। তার সময়ে কলকাতার বিশপ হেবার ১৮২৪ সালে ঢাকায় আসেন এবং শামসুদ্দৌলার সাথে দেখা করেন। তিনি ফোর্ট উইলিয়ামে বন্দি থাকাকালে ভালো ইংরেজি শিখেছিলেন এবং নিজেকে শেক্সপিয়রের একজন ভালো সমালোচক মনে করতেন। তিনি নিমতলী প্রাসাদে পাশ্চাত্য চিত্রকর্ম, ডিউক অব ওয়েলিংটন, লর্ড হোস্টিংস এবং লর্ড ওয়েসলির ছবি রেখেছিলেন। তার সচিব ছিলেন একজন ইংরেজ। হেবারের বর্ণনায় নিমতলী দেউরির বিশদ বর্ণনা রয়েছে। তিনি আধুনিকতার দিকে ঝুঁকেছিলেন। তার আমলে ঢাকায় চাকাওয়ালা গাড়ির আমদানি ঘটে। নিমতলী প্রসাদের পাশেই ছিল ঢাকার বর্ণাঢ্য ব্যক্তি মীর আশরাফ আলীর বাসভবন। নবাবের পাশ্চাত্য প্রীতি উল্লেখযোগ্য ছিল। তবে তিনি একসময় নর্তকী ও আফিমের নেশায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলেন। শামসুদ্দৌলা ভগ্ন স্বাস্থ্য নিয়ে ১৮৩১ সালে ঢাকায় মৃত্যুবরণ করলে তাকেও ঢাকার হোসেনী দালানে সমাহিত করা হয়।

কমর-উদ-দৌলা (১৮৩১-১৮৩৪) : নবাব শামসুদ্দৌলার পুত্র কমর-উদ-দৌলা ১৮৩২ সালে পিতার মৃত্যুর পর নায়েবে-নাজিম পদে অভিষিক্ত হন। শেষের দিকে অন্যান্য নায়েবে নাজিমদের মতো তিনিও ছিলেন ইন্দ্রিয়পরায়ন ও পানাসাক্ত। উপরোন্ত আস্তাবলের রক্ষক মীর জিয়নের সুন্দরী কন্যা হুসেনী বেগমকে বিয়ে করার পর তিনি মীর জিয়নের প্রভাব মুক্ত থাকতে পারেন নি। তাছাড়া অপব্যয়, অদুরদর্শিতা ও বিলাসিতাপূর্ণ জীবন যাপনের কারণে তিনিও ঢাকার হিন্দু সুদখোর মহাজনের কাছে ঋণগ্রস্থ হয়ে পড়েন এবং সম্পত্তি বন্ধক দিতে হয়। তিনিও অত্যাধিক মদ্যপানের কারণে ভগ্নস্বাস্থ্যে ১৮৩৬ সালে ঢাকায় মৃত্যু বরণ করলে তাকে অন্যান্য নায়েব-নাজিমদের মতো হোসেনী দালানে কবর দেওয়া হয়।

গাজী উদ্দিন হায়দার (১৮৩৪-১৮৪৩) : ১৮৩৬ সালে নবাব কমর-উদ-দৌলার পুত্র নবাব গাজী উদ্দিন ওরফে ‘পাগলা নবাব’ নায়েবে-নাজিম হিসিবে পিতার স্থলাভিক্ত হন। তিনি ছিলেন ঢাকার শেষ নায়েবে-নাজিম। তিনিও সত্সঙ্গ ত্যাগ করে অসত্সঙ্গে লিপ্ত হন। তিনিও ঘুড়ি ওড়ানো, মহিষ আর মোরগের লড়াই পছন্দ করতেন। পুষতেন বুলবুল, কাকাতুয়া, কুকুর-বিড়ালের বিয়ে দেওয়া পছন্দ করতেন। তিনি বিশ্বস্ত আগা গোলাম আলীকে দূরে সরিয়ে দালালদের প্রতি আকৃষ্ট হন। তিনিও অত্যন্ত ইন্দ্রিয়পরায়ন ছিলেন এবং হিন্দু মহাজনদের কাছে ঋণী হয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে তার রাজকীয় ভাতাও বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু ঢাকার জজ মি. ক্র্যাক্টরের চেষ্টায় তা পুনরায় চালু হয়। নবাব অচিরেই বাত রোগ ও কুিসত ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে নিঃসন্তান অবস্থায় মাত্র ৪৮ বছর বত্সর বয়সে ঢাকায় ইন্তেকাল করেন। রাজকীয় সম্মানে ইংরেজরা তাকে হোসেনী দালানে সমাহিত করলে চিরতরে ঢাকায় নায়েবি-নাজিম শাসনের অবসান ঘটে। তার মৃত্যুর পর ঋণ পরিশোধের জন্য নবাবদের পারিবারিক সম্পত্তি নিলাম হয়। ঢাকার বসাক ও অন্যান্য বণিকরা তা ক্রয় করে আভিজাত্যের ছবক লাগান। তবে নবাববাড়ি ও নবাবের নির্ভরশীলদের ভরণ-পোষণ এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কোম্পানি সরকার কিছু মাসিক ভাতার ব্যবস্থা করেন, যা নিম্নরূপ :

নির্ভরশীলদের ভাতা  : ৮৫৯ - ১০ - ৬    

নবাববাড়ির পাহাড়াদার

৬ জনের ভাতা     :  ১৮ - ০ - ০

নবাবের কবর

রক্ষণাবেক্ষণের জন্য :  ১৬ - ৮ - ০

 পেনশন তত্ত্বাবধানের

জন্য মোট       :  ৯২৪ - ২ - ৬    

 

নায়েবে-নাজিমদের অবসানের পর ১৮৫৮ সাল পর্যন্ত ঢাকায় কোম্পানি শাসন অবশিষ্ট ছিল।

 

ঢাকায় মোগল নবাব ও নায়েব-নাজিমের বাসস্থান

ঢাকায় মোগল রাজধানী থাকাকালে সুবাদারগণ কোন প্রাসাদে বাস করতেন কিংবা নায়েব-নাজিমরা কোথায় বসবাস করতেন এবং দরবার বসাতেন, সে বিষয়টি নিয়ে তেমন অনুসন্ধান হয়নি। বাহরাস্থানই গায়েবী, সিরার-উল-মুতাখখেরিন এবং পরবর্তীকালের ইতিহাস গ্রন্থ থেকে যে তথ্য পাওয়া যায় তা এ ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ চিত্রকে তুলে ধরে না। তবে ধারণা করা হয় যে, প্রথম দিগের মোগল সুবদারগণ পুরাতন দুর্গে তাবুতে বসবাস করতেন। পুরাতন দুর্গটি ছিল সাবেক জেলখানা স্থলে অবস্থিত। পরবর্তীতে যুবরাজ আজম বুড়িগঙ্গার তীরে সম্রাট আরঙ্গজেবের নামে ‘কিল্লা আওরঙ্গবাদ’ নির্মাণ শুরু করেন। কিন্তু এটা ব্যবহার উপযোগী করার আগেই যুবরাজ আজম ঢাকা ত্যাগ করেন। পরবর্তীতে শায়েস্তা খান ‘লালবাগ দুর্গ’ নামে এ কাজটি শুরু করলেও তা সমাপ্ত করেননি। তা সত্ত্বেও এখানেই অধিকাংশ মোগল সুবাদার দুর্গের পূর্বাংশে বসবাস করতেন। তবে সুবাদার আজিম উস সান বুড়িগঙ্গার তীরে পোস্তায় একটি প্রসাদ নির্মাণ করে বসবাস করতেন এবং দরবার বসাতেন। সুবাদার মুর্শিদকুলী খানও এখানে কিছুকাল বাস করতেন। পোস্তায় অবতরণ মঞ্চ থেকেই সুবাদার আজিম-উস-সান মহাসমারোহে ঢাকা থেকে বিদায় নেন। সুবাদার ফররুখ সিয়র ১৭০৭ সাল পর্যন্ত পোস্তার প্রাসাদে বাস করেন। পোস্তা ছিল লালবাগ কেল্লা থেকে ৪০০ গজ দূরে। রেনেল ঢাকায় এ প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ লক্ষ্য করেছিলেন ।

পোস্তা ছাড়াও কোনো কোনো নায়েব-নাজিম বড় কাটারায় বাস করতেন। তবে নিমতলী প্রাসাদ নির্মাণের আগ পর্যন্ত পোস্তা ছাড়াও অধিকাংশ নায়েবে-নাজিম পুরাতন ফোর্ট এবং লালবাগ দুর্গের পূর্বাংশে বসবাস করতেন। ১৭৬৪ সালে লে. সুইটন ঢাকার কোম্পানি শাসক হিসেবে ঢাকা আগমন করেন এবং তিনি পুরাতন ফোর্টে উঠেন। ফলে ঢাকার নায়েবে-নাজিম জেসারত খান ওল্ডফোর্ট ছেড়ে বড় কাটরায় আশ্রয় নেন।

ঢাকার নায়েবে নাজিম জেসারত খানের আমলে ঢাকার নিমতলীতে নায়েব-নাজিমদের বসবাসের জন্য প্রাসাদ তৈরির কাজ শুরু হয়। নিমতলী প্রাসাদের কাজ সম্পূর্ণ হলে নায়েব-নাজিম জেসারত খান থেকে গাজী উদ্দিন হায়দার পর্যন্ত নায়েব-নাজিম ও তাদের প্রতিনিধিরা এখানে বসবাস করতে থাকেন। ১৮৪৩ সালে শেষ নায়েবে-নাজিমের বাসস্থান ছিল নিমতলী প্রাসাদ, তবে নবাবদের প্রতিনিধিরা এখানে থাকতেন কিনা, সে ব্যাপারে নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় না। নবাব হোসেন উদ্দিন সম্ভবত : বাস করতেন ঢাকার নওয়াব বাগিচায়। অন্যদিকে নুসরত জং গ্রীষ্মকালে বুড়িগঙ্গার তীরে গিয়ে বাস করতেন বলে তৈফুর উল্লেখ  করেছেন।

শেষ নায়েবে-নাজিম গাজী উদ্দিন হায়দারের মৃত্যুর পর নিমতলী প্রাসাদের মালিক হন কোম্পানি সরকার এবং এ পরিবারের ঋণ পরিশোধের জন্য নিলামে বিক্রয় হয়। কোনো একসময় এক হিন্দু বাঙালি এটি ক্রয় করেছিলেন বলে মুনশী রহমান আলী তায়েশ উল্লেখ করেছেন। তিনি মূল ভবনটি ভেঙ্গে ফেলেন। বারো দুয়ারি ভবনটির কেবল পশ্চিম দিকের ফটকটি অক্ষত ছিল, যা এখনও বর্তমান রয়েছে। এখানেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে নায়েব-নাজিম আমলের প্রদর্শন সামগ্রী নিয়ে এশিয়াটিক সোসাইটি ঐতিহ্য জাদুঘর।

নায়েম-নাজিমদের প্রশাসনিক অধিক্ষেত্র

মুর্শিদকুলী খানের রাজস্ব সংস্কার (১৭২২) এবং ঢাকায় নিয়াবত বা নায়েব-নাজিম শাসন প্রতিষ্ঠা প্রায় সমসাময়িক ঘটনা। ঢাকা নিয়াবত প্রতিষ্ঠা পায় ১৭১৫-১৬ সালে। সে সময় পূর্ববাংলার প্রায় অর্ধেক এলাকা ছিল ঢাকার নায়েব-নাজিমদের শাসনাধীনে। আইন-ই-আকবরীতে বর্ণিত চাকলার যেগুলো ঢাকা নিয়াবতের অধীনে ছিল, তা হলো জাহাঙ্গীর নগর, সিলেট ও ইসলামাবাদ (চট্টগ্রাম) চাকলা। আবার চাকলা জাহাঙ্গীর নগরের অধীনে ছিল সরকার বাজুহা, সোনারগাঁও, বাকলা, সরকার ফতেহাবাদ ও মাহমুদাবাদের পূর্বাংশ। এ দিক থেকে ঢাকা নিয়াবতের সীমানা দাঁড়ায় উত্তরে গাড়ো পাহাড়, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পশ্চিমে সেলিমাবাদ পরগনা (আধুনিক বরিশাল জেলার পশ্চিম ভাগ) ও আটিয়া পরগনা (ময়মনসিংহের পশ্চিম ভাগ) এবং পূর্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম। ঢাকার নায়েবে-নাজিম মির্জা লুত্ফুল্লার আমলে মীর হাবিব ১৭২৮ সলে ত্রিপুরা জয় করলে ত্রিপুরাও নায়েবে-নাজিমদের অধিক্ষেত্রের আওতাভুক্ত হয়।

ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনকালে নায়েবে-নাজিমদের প্রশাসনিক এলাকা ছিল মোটামুটিভাবে বৃহত্তর চট্টগ্রাম, বৃহত্তর সিলেট, বৃহত্তর ময়মনসিংহ, বৃহত্তর কুমিল্লা, নোয়াখালী, বাকেরগঞ্জ, ফরিদপুর, খুলনা, যশোর ঢাকা প্রভৃতি অঞ্চল নিয়ে গঠিত। ১৭৬৫ সালে কোম্পানি যখন দেওয়ানী লাভ করে তখন নায়েব-নাজিমদের শাসনভুক্ত এলাকার আয়তন ছিল ৩৯৭ বর্গমাইল।

নায়েব-নাজিদের প্রশাসনিক কাঠামো

মোগল আমলে ঢাকার সুবাদারী আমলের প্রশাসনিক চিত্রের সুস্পষ্ট বিবরণ তেমন মেলে না। তবে ইংরেজদের নথিপত্রের আলোকে নায়েব-নাজিমদের প্রশাসন ব্যবস্থার একটি সন্তোষজনক চিত্র পাওয়া যায়। কখনো কখনো মুর্শিদাবাদের হস্তক্ষেপে এ ব্যবস্থায় সামান্য রদবদল ঘটলেও মূল কাঠামোতে তেমন পরিবর্তন হয়নি। তবে শেষের দিকে কোম্পাানি নায়েব-নাজিমদের ভাতা প্রদান করার নিয়ম চালু হলে এবং ব্যবসার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটলে কিছু পদ ও পদবীধারী কর্মকর্তা ছাটখাট করার ইঙ্গিত মেলে। ইংরেজ রেকর্ড মতে ঢাকায় নায়েবী প্রশাসন আমলে প্রধান প্রধান কর্মকর্তা ছিল নিম্নরূপ :

১. নায়েব-নাজিম বা প্রতিনিধি    ১ জন

২. দীওয়ান               ১ জন

৩. কাজী                ১ জন

৪. মুফতি               ১ জন

৫.  ওয়াকেয়ানবিশ          ১ জন

৬. নওয়ারার দারোগা         ১ জন

৭.  তাঁত খানা ও মালবুস খাসের দারোগা   ১ জন

৮. শহর আমিন            ১ জন

৯.  সুপারভাইজার         ১ জন 

সুত্র আব্দুল করিম : ঢাকা : দ্য মোগল ক্যাপিটাল নায়েব-নাজিম আমলে ঢাকার জনপদ

ঢাকা শহরের বিকাশ মূলতঃ কয়েকটি পর্বে সংঘটিত হয়েছিল। প্রাপ্ত শিলালিপি থেকে ধারণা করা হয় যে, প্রাক-মোগল যুগে অর্থাত্ সুলতানি ও আফগানি আমলে ঢাকার পূর্বভাগে জনবসতি ছিল। আকবর নামায় ঢাকা একজন থানাদার শাসিত বলে উল্লেখ আছে। এ মোগল থানাকে কেন্দ্র করেই ঢাকা শহর গড়ে উঠে। ১৬০৮ সালে (মতান্তরে ১৬১০) মোগল রাজধানী হিসেবে ঢাকা বিকাশ লাভ করতে শুরু করে। মোগল যুগে ঢাকা সুবা বাংলার রাজধানীর মর্যাদা পাওয়ায় ঢাকার জনসংখ্যা ও পরিধি উভয় বিস্তৃত হতে থাকে। রাজধানীর মর্যাদার পাশাপাশি ঢাকার বাণিজ্যিক উত্থানও ঢাকা শহরের বিকাশকে তরান্বিত করে। ইসলাম খানের সময় ঢাকা শহর পশ্চিমে চকবাজার থেকে পূর্বে সদরঘাট পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করে। তখন চকবাজার থেকে ঢাকা-উত্তর ও পশ্চিম দিকেও জনবসতি গড়ে উঠতে থাকে। কোম্পানি আমলে নতুন নতুন সেনানিবাস, বাণিজ্যক কুঠি, বাগান ও ইউরোপীয়দের বসবাসের জন্য ঢাকা শহর উত্তর দিকে মীর জুমলার গেটের পরেও উত্তর দিকে সম্প্রসারিত হয়েছিল। বিশেষত: তেজগাঁও অঞ্চলে গির্জা ও বিদেশি কোম্পানির ফ্যাক্টরি থাকায় ধারণা করা হয় যে, নায়েব-নাজিম আমলেও সেখানে জনবসতি ছিল। তবে টঙ্গীর পুল থেকে রাজস্ব আদায়ের কারণে সে এলাকাও ছিল নবাবী আমলে ঢাকার অন্তর্ভুক্ত। ড. করিম প্রাক-মোগল, মোগল নায়েব-নাজিম ও ইংরেজ আমলে গড়ে ওঠা ঢাকার জনপদের বিবরণ দিয়েছেন, যা নিম্নরূপ :