পাপপুণ্যের পাঁচালি

আপডেট : ২৫ নভেম্বর ২০১৯, ২১:৪৫

 চিররঞ্জন সরকার

পাপ নিয়ে আমাদের সমাজে অনেক কথা প্রচলিত আছে। এর মধ্যে জনপ্রিয় কয়েকটা হচ্ছে : ‘অনেক কালের ছিল পাপ, বড়ো ছেলে সতিনের বাপ’, ‘লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু’, ‘পাপ বাপকেও ছাড়ে না।’

পাপ বাপকেও ছাড়ে কি না জানি না, তবে দুষ্ট কোনো মানুষ যদি নির্মম পরিণতি ভোগ করে, তাহলে আমাদের দেশে তাকে ‘পাপের ফল’ বা ‘পাপের প্রায়শ্চিত্ত’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ছে মহাভারতের একটি আখ্যান।

মহাভারতের যুদ্ধের শেষে মহামতি ভীষ্ম শরশয্যায় পড়ে আছেন। অর্জুন ও শ্রীকৃষ্ণ তার কাছে যাচ্ছেন। অর্জুন জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হে সখা, এই যুদ্ধে প্রায় ১৮ অক্ষৌইনি (৫২ লক্ষ) মানুষ মারা গেছে। যারা মারা গেছে তারা তো আর কষ্ট ভোগ করছে না। কিন্তু পুতঃ চরিত্র পিতামহ, যিনি কোনোদিন কোনো পাপ করেননি তিনি কেন সারা শরীরে অসংখ্য তিরের আঘাত নিয়ে বেঁচে আছেন? এ তো বিষম জ্বালা, শাস্তি। কোন পাপে তিনি এত কষ্ট পাচ্ছেন?’

শ্রীকৃষ্ণ উত্তর দিলেন, ‘সখা, উনি তোমার গুরুজন, আমারও গুরুজন। আমি জানি তার কী পাপ হয়েছে। কিন্তু লঘুজন হিসাবে সেটা আমার বলা ঠিক হবে না। তিনি জানেন তিনি কী পাপ করেছেন। তাকে জিজ্ঞাসা করো, তিনি নিজেই বলে দেবেন।’

অর্জুন এই প্রশ্ন ভীষ্মদেবকে করলেন। ভীষ্মদেব স্মিত হেসে বললেন, ‘এই কুরুক্ষেত্রের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের এবং তজ্জনিত ধ্বংস, অগণিত বিধবা এবং সমাজের ক্ষতির জন্য আমিই দায়ী। দেশ মাতৃসম। যে দেশ রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি আমি আমার পিতার কাছে দিয়েছিলাম, সেই দেশকে আমিই দুই টুকরো করে এক ভাগ যুধিষ্ঠির আরেক ভাগ দুর্যোধনকে দিয়েছিলাম। দেশকে, দেশমাতাকে আমি এক টুকরো মাটি হিসাবে দেখেছিলাম। সেই অপরিণামদর্শিতার পরিণাম এই মহাযুদ্ধ, অগণিত ক্ষয়ক্ষতি ও বিধবার অশ্রু। সেই শাস্তি তো আমাকে পেতেই হবে। এর জন্য দুঃখ কোরো না বত্স।’

ভীষ্ম সত্যবাদী ছিলেন। নিজের ভুল বুঝতে পেরেছিলেন এবং শাস্তি মাথা পেতে নিয়েছিলেন।

সবার আগে জানা দরকার পাপ আসলে কী? ব্যুত্পত্তিগত অর্থের বিচারে যে কর্ম মানুষকে অসত্ পথে নিয়ে যায় তা-ই পাপকর্ম। এর বিপরীত কর্ম অর্থাত্ সত্কর্মকেই বলে পুণ্যকর্ম। ধর্মশাস্ত্রে পাপ-পুণ্য সম্পর্কে অনেক অনেক কথা বলা হয়েছে। কোন পাপে পরলোকে কী ধরনের শাস্তি ভোগ করতে হবে আর কোন পুণ্যে পরলোকে থাকবে পুরস্কার—সেসবও অনুপুঙ্খ বর্ণনা আছে বিভিন্ন ধর্মশাস্ত্রে।

কিন্তু ধর্মশাস্ত্রে নিরপেক্ষভাবে যারা জীবন ও জগেক দেখে থাকেন, তারাও পাপ-পুণ্যের হিসাব না করে পারেন না। আমি তো গ্রামের সাধারণ মানুষকেও দেখেছি, ধর্মশাস্ত্রে নিরপেক্ষভাবে তারা ইহজীবনেই পাপের শাস্তি ও পুণ্যের পুরস্কার পাওয়া যায় বলে বিশ্বাস করে। আমার ঠাকুরমার মুখে এ রকম অনেক দৃষ্টান্তই আমি শুনতে পেয়েছি। একটা লোক মরার আগে সারা শরীর জ্বালায় ছটফট করছিল। ঠাকুরমা ঐ লোকটিকে দেখে বললেন, ‘হবে না! লোকটি যে অমুকের বাড়িটি আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছিল, তখনই আমরা বলেছিলাম যে মরার সময় ও গায়ে জ্বলেপুড়ে মরবে। সেটিই তো হচ্ছে এখন।’ এভাবেই অনেক পুণ্যবান লোকের ইহজীবনেই পুণ্যের ফল ভোগ করার দৃষ্টান্ত তিনি তুলে ধরতেন। তবুও বাস্তবে এমনটি যে সব সময় ঘটে না, তেমনটিও গাঁয়ের সাধারণ মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে। তাই তারা প্রবাদ তৈরি করেছে, ‘যে করে পাপ, সে হয় আঠারো পুতের বাপ; যে করে পুণ্য, তার ঘর হয় শূন্য।’ তাই সাধারণ মানুষও শেষ পর্যন্ত পরকালের শাস্তি ও পুরস্কারের ওপরেই ভরসা করতে বাধ্য হয়।

কিন্তু আজকে আমরা যা দেখছি, তাতে তো মনে হয় অধিকাংশ মানুষেরই পরলোকের ওপর যেমন বিশ্বাস নেই, ইহলোকেও কুকর্ম বা পাপের জন্য শাস্তি ভোগ করতে হবে না বলেই তারা মনে করে। আর বাস্তবে তো হচ্ছে তেমনটিই। আমাদের সমাজের চিন্তাশীল ব্যক্তিরা একেই বলছেন ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’। যদি সমস্ত কুকর্মের দৃষ্টান্তমূলক বিচার হতো, তাহলে সামাজিক ঝামেলা শূন্যের কোঠায় না পৌঁছলেও অনেক পরিমাণে কমে যে যেত—সে বিষয়ে নিঃসন্দেহ থাকা যায়। অথচ তার বিপরীতটি ঘটছে বলেই সমাজে পাপ তথা কুকর্মের এমন বিস্তৃতি ঘটছে। টিভির পর্দা কিংবা পত্রিকার পাতায় শিশু হত্যার যে বীভত্স চিত্র প্রতিনিয়ত প্রকাশিত হচ্ছে কিংবা নারী ধর্ষণের যেসব খবর পাওয়া যাচ্ছে, সেসব দেখেশুনে মানুষ যেন ক্রমাগতই বিশ্বাসের দিক থেকে দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছে। এ রকমটি কেন হচ্ছে?

এই ‘কেন’র উত্তর দিতে গেলে প্রথমেই বলতে হয়, সমাজ ও রাষ্ট্রের কর্তৃত্বশীল ব্যক্তিরা যে ধরনের আচরণ করে, সে ধরনের আচরণেই অনুসরণ করতে প্রবৃত্ত হয় কর্তৃত্বশীল ও কর্তৃত্বাভিলাষী সব মানুষ। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বে যারা অবস্থান করছেন—চলতি বর্তমানে অথবা নিকট অতীতে; তাদের অনেকের আচরণই সদাচরণ বলে চিহ্নিত হতে পারে না। জনগণের প্রতিনিধিরূপে যারা ক্ষমতার মঞ্চে আরোহণ করেছেন তাদের অনেকেরই যেসব কীর্তিকলাপ সংবাদপত্রের পাতায় প্রায় প্রতিদিনই প্রকাশিত হচ্ছে, তার সামান্য অংশও যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে বলতেই হবে, আমাদের রাষ্ট্রের অবস্থাটি হয়ে গিয়েছে একান্তই ভয়াবহ। সেই ভয়াবহ পরিবেশে কুকর্ম তথা পাপকর্মেরই যে বিপুল বিস্তৃতি ঘটে থাকবে তা-ই তো একান্ত স্বাভাবিক।

যদিও অনেকের বিশ্বাস, অস্বাভাবিক অবস্থাটি কোনোমতেই চিরস্থায়ী হতে পারে না। লোকসাধারণেই বলে থাকে—‘পাপের ঘড়া পূর্ণ হয়ে গেলেই পুণ্যের সূত্রপাত ঘটে’। বারবার সভ্যতার সংকট দেখা দিয়েছে, বারবারই মানুষ সেই সংকট অতিক্রম করে নতুন সভ্যতার সৃষ্টি করেছে। বিগত শতকে ফ্যাসিবাদের প্রবল প্রতাপ যখন সমস্ত মানবিক মূল্যবোধকে গুঁড়িয়ে দিচ্ছিল, তখনই বিশ্ব জুড়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তির অভ্যুদয়ে সংকট কেটে গিয়েছিল। এমনটি এখনো ঘটবে।

রবীন্দ্রনাথ আশাবাদী মানুষ ছিলেন। তিনি ‘প্রায়শ্চিত্ত’ কবিতায় লিখেছেন, ‘ভীষণ যজ্ঞে প্রায়শ্চিত্ত পূর্ণ করিয়া শেষে/ নূতন জীবন নূতন আলোকে/ জাগিবে নূতন দেশে।’

কবির এই আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হোক, সেই প্রত্যাশা নিয়ে আমরা বেঁচে থাকি। তবে শুধু প্রত্যাশা করলেই হবে না, আমাদের ব্যক্তিগত অঙ্গীকারও দরকার। আমাদেরও যে কোনো ধরনের পাপ থেকে বিরত থাকতে হবে। গড়ে তুলতে হবে পুণ্যবানদের সমাজ ও রাষ্ট্র। ‘পাপকে ঘৃণা করো, পাপীকে নয়’—এমন একটি কথা মহাজন ব্যক্তিরা বলে থাকেন। এর সঙ্গে যুক্ত করে বলা যায়, যারা সমাজের মানুষকে পাপ করতে বাধ্য করে তেমন কর্তৃত্বশীলদের অবশ্যই ঘৃণা করতে হবে।

এক পাপ থেকে বের হয়ে যদি আরেক পাপে ডুবে প্রায়শ্চিত্ত করতে চাই, তবে সেটা হবে ভণ্ডামি!

পুনশ্চ : তবে পাপ-পুণ্য নিয়ে মানুষের অবস্থান খুবই জটিল। কে যে কীভাবে, কোন যুক্তি সাজিয়ে পাপ করে চলেছে, তা বোঝা মুশকিল। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ছে একটি পুরোনো কৌতুক।

এক ইউরোপীয় ব্যক্তি একদিন চার্চে এক ফাদারের কাছে এসে বলল, ‘ফাদার, আজ থেকে পঞ্চাশ-ষাট বছর আগের কথা, তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। এক লোক জার্মান নািস বাহিনীর হাত থেকে বাঁচতে আমার বাসায় লুকাতে চাইল। আমি তাকে চিলেকোঠায় লুকাতে দিলাম ঠিকই, তবে যুদ্ধের দুর্দিনের কথা ভেবে কিছু অর্থ উপার্জনের চিন্তাও করলাম। অর্থাত্ লোকটার আশ্রয়ের বদলে মাসে মাসে টাকা নিতে লাগলাম। লোকটাও উপায়ান্তর না দেখে রাজি হয়েছিল। আজ এত বছর পর আমার সেই কথা মনে পড়ল। আমার কি পাপ হয়েছে? আমি কি পাপী? প্লিজ বলুন ফাদার।’

ফাদার বললেন, ‘মাই চাইল্ড, তখন যুদ্ধাবস্থা চলছিল। সবাই বিপদে ছিল, কাজেই ঐ অবস্থায় কিছু টাকা কামানো এমন কোনো পাপ বলে আমার মনে হয় না। তোমার তেমন কোনো পাপ হয়নি বাছা।’

ঐ ব্যক্তিটি আনন্দে উদ্বেল হয়ে বলে উঠল : ‘আহ্! আপনি আমায় বাঁচালেন ফাদার, আমার মনের ভার হালকা হয়ে গেল। আমি যাই।’

খানিকক্ষণ বাদে ঐ ব্যক্তিটি আবার ফিরে এলো।

তাকে দেখে ফাদার বললেন, ‘এখন কী চাও মাই ডিয়ার চাইল্ড?’

ব্যক্তিটি বলল, ‘ইয়ে মানে—ফাদার, আমি কি এখন চিলেকোঠায় গিয়ে লোকটাকে বলে দেব যে যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে?’

n লেখক : রম্যরচয়িতা