প্রতি বছরের মতো এবারও বিভিন্ন কর্মসূচি আয়োজনের মাধ্যমে ২ অক্টোবর জাতীয় উত্পাদনশীলতা দিবস ২০২১ উদ্যাপিত হচ্ছে। জাতীয় উত্পাদনশীলতা দিবস ২০২১-এর মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো—‘অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রায় উত্পাদনশীলতা’। জাতীয় অর্থনীতিকে গতিশীল করার অন্যতম পথ অর্থনীতির প্রতিটি খাতের কর্মকাণ্ডে উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধি করা। যার গুরুত্ব অনুধাবন করে বর্তমান বিশ্বে সব প্রগতিশীল রাষ্ট্রব্যবস্থায় উত্পাদনশীলতা উন্নয়ন কার্যক্রমকে জাতীয় আন্দোলন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে এবং রাষ্ট্রীয় শিল্পনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উত্পাদনশীলতা কার্যক্রমকে ধারাবাহিক ও পদ্ধতিগতভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সৃষ্টি করা হচ্ছে। শিল্প বিকাশের জন্য যেমন নতুন শিল্পকারখানা সৃষ্টির প্রয়োজন, তেমনিভাবে এসব কারখানায় দক্ষতা ও মুনাফা বৃদ্ধি করে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের জন্য উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধিও একান্তভাবে অপরিহার্য। দেশের কলকারখানায়, শিল্প ও সেবাপ্রতিষ্ঠানে, কৃষি খামারে, কৃষি জমিতে উত্পাদনশীলতা বাড়াতে দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনশক্তির বিকল্প নেই। এজন্য সরকার দেশব্যাপী কারিগরি শিক্ষালাভের জন্য অনেক ইনস্টিটিউট, ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেছে। অধিক উত্পাদনশীলতা নিশ্চিত করতে সঠিক, সময়োপযোগী পরিকল্পনা গ্রহণ, লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে সে অনুযায়ী কর্মপন্থা নির্ধারণ এবং দেশের অভ্যন্তরীণ সম্পদকে সর্বোচ্চ ব্যবহারে জোর দিচ্ছেন বর্তমান সরকার।
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে বাংলাদেশ উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় বিস্ময়কর চমক সৃষ্টি করেছে। অর্থনৈতিক সামাজিক উন্নয়নের নানা সূচকে বাংলাদেশের অভাবনীয় অগ্রগতি উত্পাদনশীলতার বৃদ্ধির প্রমাণ দেয়। কৃষি, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সেবা খাতে উত্পাদনশীলতা নিঃসন্দেহে অতীতের তুলনায় বহু গুণ বেড়েছে। এই বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের মেধা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, পরিশ্রমের পাশাপাশি নতুন নতুন কলাকৌশল উদ্ভাবন এবং প্রয়োগ খুব সহজেই চোখে পড়ে। আজকাল সরকারি-বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানেই গতানুগতিক, পুরোনো নির্ধারিত কলাকৌশল আঁকড়ে ধরে বসে থাকার সুযোগ নেই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কর্মকৌশল পালটে যাচ্ছে বাস্তব প্রয়োজনে। সরকারি কিংবা বেসরকারি হোক, নতুন নতুন কর্মপদ্ধতি ও কলাকৌশল উদ্ভাবনের ধারাবাহিক চলমান প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে।
উত্পাদনশীলতার সঙ্গে জড়িত রয়েছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মান, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নৈপুণ্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক কার্যাবলির গুণমান। উত্পাদনশীলতা হলো এক ধরনের ক্ষমতা বা গুণমানসম্পন্ন পণ্য তৈরি এবং সময়মতো ক্রেতার কাছে পৌঁছে দেওয়া। গাণিতিকভাবে উত্পাদনশীলতা বলতে উত্পাদন ও উপাদান—এ দুইয়ের অনুপাতকে বোঝায়। সামাজিকভাবে গতকালের চেয়ে আজকের দিন আরো ভালো এবং আজকের চেয়ে আগামীকাল আরো ভালো যাবে—এ ধরনের চিন্তাভাবনা এবং সেইভাবে কাজ করাই হলো উত্পাদনশীলতা। আসলে উত্পাদনশীলতা সম্পদের দক্ষ ও কার্যকরী ব্যবহারের ওপর নির্ভরশীল। সম্পদের দক্ষ ও কার্যকরী ব্যবহার যত বেশি হবে উত্পাদনশীলতা তত বৃদ্ধি পাবে। আধুনিক যুগে জাতীয় উন্নয়নের প্রশ্নে উত্পাদনশীলতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রতিযোগিতাময় বিশ্বে উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধি ছাড়া কোনো শিল্পই টিকে থাকতে পারে না। শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রেও উত্পাদনশীলতা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়। শ্রমিকরা মজুরি বাড়ানোর কিংবা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির দাবি তুললে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ স্বাভাবিকভাবেই তাদেরকে উত্পাদনশীলতা বাড়ানোর কথা বলে থাকেন। উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধি পেলেই শ্রমিকদের মজুরি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো সম্ভব হয়। যার সুবাদে প্রতিষ্ঠান ও সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যায় এবং লাভজনক পর্যায়ে পৌঁছে। যে কারণে শ্রমিক পক্ষ এবং মালিক পক্ষ উভয়কেই উত্পাদনশীলতা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা রাখতে হবে। উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধি পেলে মালিক, শ্রমিক, ভোক্তা এমনকি সরকারও তার সুফল পেয়ে থাকে। দক্ষতার সঙ্গে এবং কম খরচে পণ্য বা সেবা উত্পাদন মালিক পক্ষের কাঙ্ক্ষিত থাকে সব সময়েই। উত্পাদন খরচ কম হওয়াতে অপেক্ষাকৃত কম মূল্যে পণ্য বিক্রির সুযোগ সৃষ্টি হয়। এতে মুনাফার পরিমাণ বেড়ে যায়। পণ্যের গুণমান উন্নত হলে ভোক্তা শ্রেণি খুব সহজে উত্পাদিত পণ্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়। বর্তমান মুক্তবাজার অর্থনীতির কারণে সারা পৃথিবীতে যাদের উত্পাদনশীলতা বেশি তারাই বাজারে টিকে থাকছে বেশ ভালো ভাবেই এবং লাভবান হচ্ছে।
উত্পাদনশীলতার গুরুত্ব ও ব্যাপ্তি জাতীয় সব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে অতি নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শুধু একটি নির্দিষ্ট খাতের অবদানের ওপর নির্ভরশীল নয়। এর জন্য প্রয়োজন জাতীয় অর্থনীতির সব খাতের সামগ্রিক অগ্রগতি ও অবদান। বাংলাদেশ দিনে দিনে ক্রমেই উন্নয়নের পথ ধরে সামনে এগিয়ে চলেছে। আর উন্নয়নের এ ধারা অব্যাহত রাখতে এবং দেশকে সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নিতে শিল্পায়ন তথা অর্থনীতিতে বেগবান ধারা সৃষ্টি করার জন্য উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। অপরদিকে ২০৪১ সাল নাগাদ উন্নত দেশের মর্যাদায় স্থান করার মানসে সরকার বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হলে উত্পাদনশীলতা উন্নয়ন কলাকৌশলের ব্যাপক চর্চা একান্ত প্রয়োজন। জাতীয় পর্যায়ে উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য উত্পাদন প্রক্রিয়াকে যথাযথ উন্নতকরণের লক্ষ্যে কর্মকর্তা, কর্মচারী, শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ প্রদান এবং উদ্বুদ্ধকরণ অত্যন্ত জরুরি। টেকসই উন্নয়ন এমনই এক ব্যবস্থা যা ভবিষ্যত্ উত্পাদনশীলতা বিকাশমান রাখে। বাংলাদেশের অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রায় প্রতিটি শিল্প-কলকারখানায়, প্রতিষ্ঠানে, কৃষি খাতে, ব্যবসা-বাণিজ্যে উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধির বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
n লেখক :অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার, কলাম লেখক

