আল্লামা সরোয়ার সাঈদীর ইন্তেকাল, জানাজায় লাখো মানুষের ঢল

আল্লামা সরোয়ার সাঈদীর ইন্তেকাল, জানাজায় লাখো মানুষের ঢল
জানাজায় লাখো মানুষের ঢল, ইনসেটে আল্লামা সরোয়ার সাঈদী।ছবি: ফোকাস বাংলা

উপমহাদেশের প্রখ্যাত মুফাসসির, গবেষক, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবার ঐতিহ্যবাহী আড়াইবাড়ী ইসলামিয়া সাঈদিয়া কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ ও আড়াইবাড়ি দরবার শরিফের পীর আল্লামা গোলাম সারোয়ার সাঈদী করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন)। শনিবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে রাজধানীর এভার কেয়ার হাসপাতালে (সাবেক অ্যাপেলো হাসপাতাল) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।

মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৫৪ বছর। এই বরেণ্য আলেমের মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে সর্বত্রমহলে শোকের ছায়া নেমে আসে। মাহফিল, সভা, সমাবেশ ও ইউটিউবে তার যুক্তিপূর্ণ জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য সমাজের সকল স্তরের মানুষের হৃদয়কে দারুণভাবে আকৃষ্ট করতো। শনিবার বাদ আসর আড়াইবড়ি কামিল মাদরাসা মাঠে মরহুমের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে দরবার শরীফ মসজিদ সংলগ্ন বাবা ও দাদার কবরের পাশে তার লাশ দাফন করা হয়।জানাজায় অংশ নেন দেশবরেণ্য ওলামা, পীর মাশায়েখ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও শ্রেণি-পেশার লাখো মানুষ। এর আগে দুপুর সাড়ে ১২টায় মরহুমের লাশ ঢাকা থেকে কসবা আড়াইবাড়ি পৌঁছে। এসময় লাশবাহী গাড়ি মরহুমের প্রিয় ক্যাম্পাস মাদরাসা মাঠে রাখা হয়। প্রিয় আলেমকে এক নজর দেখতে ভিড় জমায় হাজার হাজার ভক্তরা। এসময় শোকাহত জনতার আল্লাহু আকবর ধ্বনি ও কান্নায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। বাদ আসর জানাজা হলেও যোহরের আগে থেকেই কানায় কানায় ভরে যায় মাদরাসা ময়দান। মাঠে জায়গা সংকুলান না হওয়ায় মসজিদ, পাশের ফসলের মাঠ, মাদরাসার প্রতিটি কক্ষ, ছাদ ও রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন জায়গায় দাঁড়িয়ে মানুষ জানাজায় অংশ নেন। জানাজায় ইমামতি করেন মরহুমের বড় ছেলে হাফেজ মাওলানা আব্দুস সোবহান।

জানাজা-পূর্ব বক্তব্য রাখেন জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান, প্রখ্যাত আলেমে দীন আল্লামা কামালুদ্দিন জাফরী, মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে শামীম সাঈদী, সোনাকান্দার পীর মাওলানা মাহমুদুল হাসান, নাগাইশের পীর মাওলানা মোস্তাক ফয়েজী, কসবা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট রাশেদুল কাউছার জীবন ও কসবা পৌর মেয়র এমরান উদ্দিন জুয়েল প্রমুখ।

দেশ বরেণ্য আলেমের মৃত্যুতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ (কসবা-আখাউড়া) আসনের সংসদ সদস্য এবং আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। এছাড়া ধর্মীয় সংগঠন, রাজনৈতিক দলগুলো তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে।

আইনমন্ত্রী বলেন, মাওলানা গোলাম সারোয়ার সাঈদী সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। তার মৃত্যুতে কসবাবাসী একজন ভালো মানুষকে হারালো, যে ক্ষতি পূরণ হওয়ার নয়। আমি তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করছি।

উল্লেখ্য, গোলাম সারোয়ার সাঈদী কিছুদিন আগে কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়ে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হয়ে লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। দীর্ঘ ১৬ দিন হাসপাতালে নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন থেকে অবশেষে চলেন গেলেন আল্লাহর কাছে।

জানা গেছে, গোলাম সারোয়ার সাঈদী ছিলেন একজন পীরজাদা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত আড়াইবাড়ি দরবার শরিফের প্রয়াত পীর সাহেব আল্লামা হজরত মাওলানা শাহ মুহাম্মদ গোলাম হাক্কানীর (রহ.) সুযোগ্য সন্তান তিনি।এছাড়া আড়াইবাড়ী দরবার শরিফের প্রতিষ্ঠাতা আল্লামা হজরত মাওলানা আবু সাঈদ আসগর আহমাদ আল-কাদেরীর (র.) নাতি তিনি।গোলাম সারোয়ার সাঈদীর প্রপিতামহ ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার নারুই গ্রামের হযরত মাওলানা মুকসুদ আলী (র.)। তিনি দেশবরেণ্য আলেম ছিলেন। গোলাম সারোয়ার সাঈদীর দাদা মাওলানা আবু সাঈদ আসগর আহমাদ ১৯৩৭ সালে কসবা উপজেলার পৌর সদরের আড়াইবাড়ি আলিয়া মাদরাসা ও একটি সমৃদ্ধ পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করেন।পরবর্তীতে তার ছেলে মাওলানা মুহাম্মদ গোলাম হাক্কানী এর হাল ধরেন। তারপর মোহাম্মদ গোলাম সারোয়ার সাঈদী ২০০৪ সালে মাদরাসাকে কামিল মানে উন্নীত করেন।পাশাপাশি গড়ে তোলেন আড়াইবাড়ী ইসলামিয়া ছায়েদীয়া এতিমখানা, লিল্লাহ বোর্ডিং, আড়াইবাড়ি হাক্কানীয়া হাফেজি মাদরাসা, আড়াইবাড়ি সাইয়েদা সুরাইয়া নূরানী মাদরাসা, ইসলামী বুক ক্লাব।

বর্তমানে ইবতেদায়ি, জুনিয়র, দাখিল, আলিম ও ফাজিল কেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে সেখানে।প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই মাদরাসাটি এলাকায় শিক্ষা বিস্তার, অনৈসলামিক কার্যকলাপ রোধসহ বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছে।দায়িত্ব নিয়ে মাদরাসার পাঠাগারকে মূল্যবান ও দুষ্প্রাপ্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ বইয়ে সমৃদ্ধ করেন মাওলানা মোহাম্মদ গোলাম সারোয়ার সাঈদী।তিনি দেশ-বিদেশে বিভিন্ন সেমিনার সিম্পোজিয়ামে অংশগ্রহণের মাধ্যমে অর্জিত অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের মাঝে বিলিয়ে দেন।মাওলানা শাহ মুহাম্মদ গোলাম হাক্কানীর তৃতীয় ছেলে মাওলানা মো. গোলাম সারোয়ার সাঈদী। তার পাঁচ ছেলে ও চার মেয়ের মধ্যে সাঈদীই সবচেয়ে বেশি পরিচিত। অন্যরা ব্যবসা ও চাকরিতে নিজেদের ক্যারিয়ার গড়ে তুললেও মোহাম্মদ গোলাম সারোয়ার সাঈদী পারিবারিক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালন করে গেছেন।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করা মাওলানা মো. গোলাম সারোয়ার সাঈদী বিগত কয়েক বছরে ইউটিউব চ্যানেলে ইসলাম বিষয়ক নানা বিষয়ে বয়ান করতেন। এসব বয়ান তাকে বিশেষ পরিচিতি এনে দিয়েছে।এদিকে দেশের জনপ্রিয় মুফাসসির মিজানুর রহমান আজহারী তার প্রিয় নানাভাই’ অধ্যক্ষ গোলাম সারওয়ার সাঈদীর মৃত্যুতে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে একটি হৃদয়ছোঁয়া পোস্ট দিয়েছেন।

ইত্তেফাক/এএএম

  • সর্বশেষ খবর
  • সর্বাধিক পঠিত