ভূ-রাজনীতির ধারা বদলে দিতে পারে ভ্যাকসিন

আপডেট : ০৭ জুন ২০২১, ১৬:০৭

করোনা ভাইরাস মহামারি বিশ্বে ধনী ও দরিদ্র দেশগুলোর প্রকট বিভাজন নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। এক বছরের বেশি সময় বিপর্যস্ত পৃথিবী। প্রথম দিকে পশ্চিমা দেশগুলোতে মৃত্যুর মিছিল দেখা গেলেও এখন সেদেশগুলো অনেকটা হার্ড ইম্যুনিটির পথে বলে মনে হচ্ছে। অন্যদিকে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলো এখন করোনার ফলে বেসামাল অবস্থায়।

হাতেগোনা কয়েকটি দেশচাহিদা অনুযায়ী ভ্যাকসিন তৈরি করলেও বাকি বিশ্ব সেটা পারেনি। এই বিষয়টাই ভূ-রাজনীতির দৃশ্যপট বদলে দেবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। কারণ, চাহিদা ও সরবরাহের নিয়মের বাইরে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সূচকগুলো এতে ক্রিয়াশীল হয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কূটনীতিও। রাশিয়া ও চীন ভ্যাকসিনকে সম্পর্ক উন্নয়নের মোক্ষম সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়েছে। তারা একে কূটনীতিতে প্রভাব বিস্তারের একটি উপায় বিবেচনা করছে। চীন ও রাশিয়ার পাশাপাশি ইসরাইলকেও তালিকায় রাখা যায়। অপরদিকে পশ্চিমা শিল্পোন্নত দেশগুলো অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের দিকেই বেশি ব্যস্ত রয়েছে। অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র অতি সম্প্রতি ভারতের মতো করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে ভ্যাকসিন সহায়তা দেওয়ার কথা বলেছে।

ভূ-রাজনীতির ধারা  পালটে দিতে পারে ভ্যাকসিন

যেসব দেশ ভ্যাকসিন উৎপাদন করে না তারা উৎপাদনকারী দেশগুলোর জন্য একটি বাজার। এক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে ব্যাক সিটে দেখা গেল। জোটভুক্ত ২৭টি দেশের মানুষকে টিকাদান নিয়েই মনোযোগ নিবদ্ধ রাখে ইইউ। ২৭ জাতি জোটটি বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনার সময় পায়নি। এ পর্যন্ত জনগণকে টিকাদানের ক্ষেত্রে ৩৪টি দেশ এগিয়ে আছে। তালিকায় যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের পরে আছে কানাডা। অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সক্ষমতা না থাকার পরও ইউরোপ ও আমেরিকা লাখ লাখ ডোজ আমদানি করে কানাডা জনগণের সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। একই কথা কাতার, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বেলায়ও প্রযোজ্য। দেখা যাচ্ছে উন্নত শিল্পোন্নত দেশগুলো ভ্যাকসিন তৈরি করেছে, আর্থিক সমৃদ্ধ দেশশুলো সেই ভ্যাকসিন কিনে নিজেদের প্রয়োজন পূরণ করেছে। এর বাইরে যে আরো অনেক দেশ রয়েছে সেখানে টিকা দেওয়ার হার খুব সামান্য। এদিকে জানা গেছে, সরবরাহে সীমাবদ্ধতা থাকায় যুক্তরাষ্ট্র অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন কিনে জমা করে রেখেছে।

অল্পসংখ্যক দেশ ভ্যাকসিন উৎপাদন করলেও তা বাজারে সমতার ভিত্তিতে সরবরাহ হচ্ছে না। কিছু ধনী দেশ ক্রেতা হিসেবে একে একচেটিয়া করে ফেলেছে। অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশকে এর নাগাল পেতে হিমশিম খাচ্ছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) পক্ষ থেকে জোরদার করা হয়েছে কোভাক্স প্রকল্প।

ভ্যাকসিন পাওয়ার ক্ষেত্রে আর্থিক অবস্থা যেন বাধা হয়ে না দাঁড়ায় সেই লক্ষ্যে ২০২০ সালের মার্চে জি-২০ দেশগুলো প্রকল্পের সূত্রপাত করে। পরের মাসে ডব্লিউএইচও এটি অনুমোদন করে। ইইউ ছাড়া কয়েকটি আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থাও বিষয়টি অনুমোদন করেছে। তবে গত এক বছরেও প্রকল্পটি খুব একটি সাফল্যের মুখ দেখেনি। বরং অভ্যন্তরীণ ঘাটতির কারণ দেখিয়ে ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্র ভ্যাকসিন রফতানির ওপর বাধা নিষেধ আরোপ করে রেখেছে।

Bangladesh starts COVID vaccination drive | Coronavirus pandemic News | Al  Jazeera

ভূ-রাজনীতির ধারণার সঙ্গে শীতল যুদ্ধের যুগ থেকে মানুষ পরিচিত। মূল কথা, একটি দেশ বৈশ্বিকভাবে কতটা জায়গা জুড়ে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। নিরাপত্তা ইস্যু, প্রযুক্তি, সামরিক সরঞ্জামাদি ও সহযোগিতা কেন্দ্র করে আগে ভূ-রাজনীতির চর্চা হতো। এসব ইস্যুতে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিশ্বে শীর্ষ স্থানীয়। কিন্তু করোনা মহামারির সময় দেখা গেল উন্নত দেশগুলো নেতৃত্বের অবস্থানে নেই। বরং সেখানে এগিয়ে এসেছে তার প্রতিপক্ষের দেশগুলো।

ইত্তেফাক/টিআর