পদ্মা সেতু ঘিরে জাজিরায় পর্যটকের পদচারণা, বাড়ছে ব্যবসা-বাণিজ্য

আপডেট : ০১ জুন ২০২৬, ১২:৩৫

পদ্মা সেতু চালুর পর বদলে গেছে দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা। এর প্রভাব শুধু যাতায়াতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং শরীয়তপুরের জাজিরা এলাকায় তৈরি হয়েছে নতুন পর্যটন সম্ভাবনা। ঈদুল আজহার ছুটিতে সেই সম্ভাবনার বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে পদ্মা সেতুর জাজিরা প্রান্তে, যেখানে প্রতিদিনই ভিড় করছেন হাজারো দর্শনার্থী।

একসময় দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের কাছে ঈদ বা দীর্ঘ ছুটি মানেই ছিল ফেরিঘাটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা, নদী পারাপারের দুর্ভোগ এবং দুর্ঘটনার শঙ্কা। মাওয়া, কাঠালবাড়ি ও মাঝীরঘাট ছিল সেই ভোগান্তির প্রতীক। কিন্তু পদ্মা সেতু চালুর পর পাল্টে গেছে সেই চিত্র। ঢাকার সঙ্গে শরীয়তপুর, মাদারীপুরসহ দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হওয়ায় মানুষের জীবনযাত্রায় এসেছে বড় পরিবর্তন।

ঈদের ছুটিতে জাজিরা প্রান্তে গিয়ে দেখা যায়, পদ্মা সেতু ও পদ্মা নদীর মনোমুগ্ধকর দৃশ্য উপভোগ করতে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে ছুটে আসছেন মানুষ। জাজিরা ক্যান্টনমেন্ট এলাকা, পুনর্বাসন সাইট, বৃক্ষায়ন প্রকল্প, সেতুর নিচের অংশ এবং নদীর পাড়ের বেড়িবাঁধ ঘিরে গড়ে উঠেছে দর্শনার্থীদের অন্যতম আকর্ষণকেন্দ্র।

সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত পদ্মাপাড়জুড়ে থাকে উৎসবমুখর পরিবেশ। কেউ পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসছেন, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় মেতে উঠছেন। অনেকেই স্মৃতি ধরে রাখতে ছবি তুলছেন পদ্মা সেতুর পটভূমিতে। দর্শনার্থীদের ভিড়কে কেন্দ্র করে নদীর তীরে গড়ে উঠেছে ফুচকা, চটপটি, বাদাম, খেলনা ও বিভিন্ন পণ্যের অস্থায়ী দোকান। এতে স্থানীয় অর্থনীতিতেও প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা জিহাদুল ইসলাম সুমন বলেন, একসময় শরীয়তপুরকে মানুষ নদীভাঙনের জেলা হিসেবেই চিনত। এখন পদ্মা সেতুর কারণে মানুষ এখানে বেড়াতে আসে। এতে স্থানীয় তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া হলে এলাকাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।

পদ্মা সেতু চালুর ফলে যাত্রী পরিবহন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর অনেক স্পিডবোট ও ট্রলার মালিক নতুন করে পর্যটননির্ভর সেবায় যুক্ত হয়েছেন। মাঝীরঘাট এলাকার স্পিডবোট মালিক হারুন খান বলেন, আগে আমরা নদী পারাপারের কাজ করতাম। সেতু চালুর পর সেই কাজ বন্ধ হয়ে যায়। এখন পর্যটকদের নদীতে ভ্রমণের সুযোগ করে দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছি।

মাদারীপুর থেকে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা ফয়সাল আহমেদ বলেন, পদ্মা সেতু, পদ্মা নদী ও আশপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য একসঙ্গে উপভোগ করা যায় বলে এখানে আসা। পরিবার নিয়ে সময় কাটানোর জন্য জায়গাটি বেশ উপভোগ্য।

জাজিরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আল ইমরান বলেন, ঈদের ছুটিতে এখানে পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আনসার সদস্যদের সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে। ভবিষ্যতে এলাকাটিকে পরিকল্পিত পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।

তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে কিছু চ্যালেঞ্জও। স্থানীয়দের অভিযোগ, পদ্মা সেতুর ডান তীর সংরক্ষণ বাঁধের বিভিন্ন স্থানে নদীভাঙনের ঝুঁকি দেখা দিচ্ছে। তারা মনে করেন, পর্যটন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হলে দ্রুত কার্যকর নদীভাঙন প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।

একসময় যে পদ্মা নদী ছিল মানুষের শঙ্কার কারণ, আজ সেই নদীকেই ঘিরে জাজিরায় তৈরি হয়েছে আনন্দ, সম্ভাবনা ও নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র। পদ্মার বাতাসে এখন মিশে থাকে উৎসবের আবহ, আর দর্শনার্থীদের পদচারণায় প্রাণ ফিরে পেয়েছে এ অঞ্চলের জনপদ।

ইত্তেফাক/এমএএম