হামের পর ডেঙ্গু : মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা

আপডেট : ০৩ জুন ২০২৬, ০৬:০০

যাবতীয় রোগ-ব্যাধির প্রাদুর্ভাব কেবল সাধারণ মানুষের জীবনকেই বিপন্ন করে না, বরং দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতাকেও কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন করিয়া দেয়। বর্তমানে আমাদের দেশে ঠিক তেমনই এক উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হইয়াছে। একদিকে দেশব্যাপী হামের প্রকোপ এখনো সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয় নাই, তাহার উপর মস্ত বড় আপদ হিসাবে হাজির হইয়াছে এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু জ্বরের সংক্রমণ। গতকাল ইত্তেফাকের খবর অনুযায়ী এক দিনে ডেঙ্গুতে আরো এক জনের মৃত্যু এবং আক্রান্তের সংখ্যা তিন সহস্রাধিক ছাড়াইয়া যাইবার খবরটি উদ্বেগজনক। চলতি বৎসর ইতিমধ্যে ডেঙ্গুতে ছয় জনের মৃত্যু হইয়াছে এবং আসন্ন বর্ষাকালে ইহার প্রাদুর্ভাব আরো বাড়িয়া যাইতে পারে। হামের মতন এই সংক্রামক ব্যাধির বিস্তার ঘটিলে তাহা আমাদের জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে হইবে 'মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা' স্বরূপ।

অবশ্য বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর হইতেই এই দ্বিবিধ স্বাস্থ্যসংকট মোকাবিলায় নানামুখী ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণ করিয়াছে, যাহা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের তৎপরতায় ডেঙ্গুর মৌসুম শুরু হইবার পূর্বেই সর্বাত্মক প্রস্তুতি পরিদৃষ্ট হইতেছে। ইতিমধ্যে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসমূহে বিশেষ 'ডেঙ্গু কর্নার' চালু করিবার সিদ্ধান্ত গৃহীত হইয়াছে। তাহা ছাড়া, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল প্রাঙ্গণে একটি সুসজ্জিত ফিল্ড হাসপাতাল প্রস্তুত রাখা হইয়াছে এবং প্রয়োজনে জেলা পর্যায়েও এমন হাসপাতাল স্থাপনের পরিকল্পনা রহিয়াছে। চিকিৎসক ও নার্সদের ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনা বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণের যে কার্যক্রম শুরু হইয়াছে, তাহাও অত্যন্ত সময়োপযোগী। চিকিৎসাসামগ্রী ও স্যালাইনের মজুত বৃদ্ধির পাশাপাশি সিটি করপোরেশনের সহিত সমন্বয় করিয়া মশার উৎসস্থল ধ্বংসের কাজও শুরু হইয়াছে। একটি বিশেষ মোবাইল অ্যাপ চালুর পরিকল্পনা তথ্য ব্যবস্থাপনাকে আরো সহজ করিবে বলিয়া আশা করা যায়।

উপরোক্ত উদ্যোগসমূহ ইতিবাচক হইলেও ডেঙ্গু রোগের ভয়াবহতা ও প্রকৃতি অনুধাবন করা আবশ্যক। এই ব্যাপারে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা দরকার, যাহাতে প্রত্যেক নাগরিক তাহার বাড়িঘর ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখিতে পারেন। ডেঙ্গুর প্রজনন ক্ষেত্র যাহাতে গড়িয়া উঠিতে না পারে, সেই ব্যাপারে সতর্ক থাকা একান্ত প্রয়োজন। আমরা জানি, ডেঙ্গু একটি তীব্র ভাইরাসজনিত জ্বর, যাহা মূলত 'এডিস এজিপ্টিন্ট' নামক স্ত্রী মশার কামড়ের মাধ্যমে ছড়ায়। এই মশা সাধারণত স্বচ্ছ ও স্থির জলে ডিম পাড়ে। গৃহস্থালির ফুলের টব, ভাঙা প্লাস্টিকের পাত্র, ডাবের খোসা কিংবা পরিত্যক্ত টায়ারে জমিয়া থাকা পানি এডিস মশার বংশবৃদ্ধির প্রধান ক্ষেত্র। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর তীব্র জ্বর, চোখের পিছনে ব্যথা, পেশি ও হাড়ে প্রচণ্ড যন্ত্রণা এবং শরীরের বিভিন্ন স্থান হইতে রক্তক্ষরণ হইতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা না পাইলে ইহা প্রাণঘাতী রূপ ধারণ করে।

অতএব, এই মরণব্যাধি হইতে পরিত্রাণ পাইতে হইলে কেবল সরকারি উদ্যোগের উপর নির্ভর করিয়া বসিয়া থাকিলে চলিবে না; রাষ্ট্র ও নাগরিক উভয় পক্ষকেই আরো কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে হইবে; যেমন-সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাসমূহকে কেবল লোকদেখানো ঔষধ ছিটানো বন্ধ করিয়া বৈজ্ঞানিক উপায়ে লার্ভিসাইড প্রয়োগ করিতে হইবে এবং নিয়মিত ড্রেন ও জলাশয় পরিষ্কার রাখিতে হইবে। দেশের প্রান্তিক অঞ্চলের হাসপাতালসমূহে পর্যাপ্ত কিট ও ফ্লুইড স্যালাইন সরবরাহ নিশ্চিত করিতে হইবে, যাহাতে রোগীকে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় ছুটিয়া আসিতে না হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চিকিৎসার ভুল তথ্য ছড়ানো বন্ধ করিতে হইবে এবং গণমাধ্যমে সঠিক গাইডলাইন প্রচার করিতে হইবে। সর্বোপরি, নাগরিক সমাজকে অনুধাবন করিতে হইবে যে, নিজের ঘরবাড়ি পরিষ্কার রাখিবার দায়িত্ব তাহাদের নিজেদেরই। প্রতি তিন দিনে এক বার বাসাবাড়ির কোথাও যেন জল জমিয়া না থাকে, তাহা নিশ্চিত করিতে হইবে। ঘুমানোর সময় আবশ্যিকভাবে মশারি ব্যবহার করা এবং শিশুদের ফুল হাতা পোশাক পরিধান করানো উচিত। শরীরে জ্বরের লক্ষণ দেখামাত্রই বিলম্ব না করিয়া চিকিৎসকের শরণাপন্ন হইতে হইবে এবং রক্ত পরীক্ষা করাইতে হইবে। মোটকথা, সরকারের সার্বিক প্রস্তুতি ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং জনগণের সচেতন প্রয়াস-এই দুইয়ের মেলবন্ধনেই কেবল হাম ও ডেঙ্গুর মতন যুগপৎ বিপর্যয় হইতে দেশের জনসাধারণকে রক্ষা করা সম্ভব।

ইত্তেফাক/এনএন