‘এসিল্যান্ড, ইউএনও, এডিসি, ডিসি ছেলেকে চাকরিচ্যুত ও বাস্তুচ্যুত করে পেটে লাথি মেরেছে’। তাই মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় মর্যাদা হিসেবে তাদের সালাম/স্যালুট শেষযাত্রার কফিনে চাননি মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেন। মৃত্যুর দুই দিন আগে মুক্তিযোদ্ধার লিখে যাওয়া এমন চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ছাড়াই তাকে দাফন করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দিতে যাওয়া ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশকে ফিরিয়ে দিয়েছে পরিবারের সদস্য ও এলাকাবাসী।
চিঠিতে লিখে যাওয়া ইচ্ছা অনুযায়ী গতকাল রাষ্ট্রীয় মর্যাদা (গার্ড অব অনার) ছাড়াই দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে। জানাজার পূর্ব মুহূর্তে ম্যাজিস্ট্রেট মহসীন উদ্দিনের নেতৃত্বে পুলিশ প্রশাসনের চৌকস দল গার্ড অব অনার জানাতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসে। এমনকি মরদেহ জাতীয় পতাকায় আচ্ছাদিত করা হয়নি।
দিনাজপুর সদর উপজেলার যোগীবাড়ী গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেন হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় জাতীয় সংসদেরত্ হুইপ ইকবালুর রহিম এমপি বরাবর চিঠি লেখার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
চিঠিতে তিনি যা লিখে গেছেন তার মূল কথা হচ্ছে, হুইপ ইকবালুর রহিম এমপির সুপারিশে ছেলে নুর ইসলামের ‘নো ওয়ার্ক নো পে’ ভিক্তিতে এসিল্যান্ডের গাড়িচালক হিসেবে চাকরি হয় ২০১৭ সালে। সেই সুবাদে নুর ইসলাম সদর এসিল্যান্ডের গাড়ি চালাতেন। তিনি কর্মস্থলের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে হুইপ ইকবালুর রহিম এমপির সঙ্গে সাক্ষাত্ করেন। এ সময় তিনি সেখানে উপস্থিত এডিসি রাজস্বকে বিষয়টি দেখতে বলেন।
হুইপকে বিষয়টি অবগত করায় প্রশাসন থেকে প্রথমে নুর ইসলামকে তার বসবাসরত খাস পরিত্যক্ত বাড়ি ছাড়ার নোটিশ দেওয়া হয়। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে এসিল্যান্ডের স্ত্রী নুর ইসলামকে বাথরুম পরিষ্কার ও মাংস রান্না করতে বলেন। মাংস রান্না ঠিক না হওয়াসহ বিভিন্ন অজুহাতে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে চাকরিচ্যুত করা হয়। পরে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়াকে নিয়ে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে দেখা করতে গেলে জেলা প্রশাসকও ক্ষিপ্ত হয়ে যান। এ ছাড়া নুর ইসলাম তার স্ত্রী-সন্তান নিয়ে মাফ চাওয়ার জন্য এসিল্যান্ডের স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে গেলে তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করেও দেখা করতে পারেননি। বর্তমানে তার ছেলেটি চাকরিচ্যুত ও বাস্তচ্যুত হয়ে স্ত্রী-পুত্র পরিজন নিয়ে অর্ধাহারে অনাহারে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ২২ অক্টোবর চিঠিতে তিনি স্বাক্ষর করে ডাকযোগে হুইপ বরাবরে প্রেরণ করেন। পরের দিন তিনি হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় মারা যান।
জানাজার আগে মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেনের পরিবারপরিজন দায়িত্ব দিলে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মোফাজ্জল হোসেন দুলাল জানাজায় উপস্থিত সবার উদ্দেশ্যে বলেন, অন্যায়ভাবে মুক্তিযোদ্ধার ছেলেকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। সেই ক্ষোভ থেকেই তিনি এই চিঠি লিখে গেছেন। আমরা তার লিখে যাওয়া চিঠির অসিয়ত অনুযায়ী দাফন করতে চাই।
এ ব্যাপারে সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এসিল্যান্ড আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘নুর ইসলামের চাকরি স্থায়ী ছিল না। তাছাড়া তার গাড়ি চালানো ভালো ছিল না এবং কয়েকবার দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে। চাকরিচ্যুতের বিষয়টি জানিনা, এটি আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলতে পারবেন।’
জেলা প্রশাসক মাহমুদুল আলম বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কিছুই জানতাম না। মৃত্যুর খবর পেয়ে প্রশাসন থেকে গার্ড অব অনার প্রদান করতে যাওয়ার পর বিষয়টি অবগত হই’।
