উ্যমেনোমিকসের গুরুত্ব বাড়ছে

আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০১৯, ২০:০৪

সুনির্দিষ্ট তারিখ নেই; দিবসটিও প্রতীকী। যুক্তরাষ্ট্রের নারীরা প্রতি বছর এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহের কোনো একটি দিনকে উত্সর্গ করে মজুরি সংক্রান্ত লিঙ্গ-বৈষম্য দূর করার বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে। অদূর ভবিষ্যতে সম্ভব নয় জেনেও প্রতীকীভাবে এদিন উপস্থাপন করা হয় গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের পুরুষরা যে পরিমাণ আয় করেছে, ঠিক সেই পরিমাণ আয় করার জন্য নারীদের আরো কত বেশি পরিশ্রম করতে হবে? আর এ দিনটি পরিচিতি পায় ইকুয়্যাল পে ডে হিসেবে। ফুল টাইম চাকরিতে নিযুক্ত মার্কিন নারীরা তাদের পুরুষ সতীর্থদের তুলনায় গড়ে প্রায় ২০ শতাংশ কম আয় করে। অর্থাত্ পুরুষদের ১ ডলারের বিপরীতে তাদের ভাগ্যে জুটে ৮০.৫ সেন্ট। আফ্রো-আমেরিকান ও হিসপানিক নারীদের মধ্যে এই লিঙ্গগত মজুরি বৈষম্য সবচেয়ে বেশি। শেতাঙ্গ নন-হিসপানিক পুরুষদের বিপরীতে তাদের আয় যথাক্রমে ৬১ ও ৫৩ শতাংশ। সার্বিকভাবে যদিও এই ব্যবধান কমে আসছে; কিন্তু তার গতি খুবই ধীর প্রকৃতির। বর্তমান হার অব্যাহত থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের নারীরা চলতি শতাব্দীতে মজুরির সম-অধিকারের স্বাদ তো নিতেই পারবে না; উপরন্তু কখনো নিতে পারবে কি না তা নিয়েও যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে কখনো সমান মজুরি পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলেও, সেটি পাচ্ছি পাচ্ছি করতে করতেই বাস্তবায়নের সালটা দাঁড়াবে ২১০৬। তার মানে চলমান শতাব্দীতে আরাধ্য লিঙ্গ-বৈষম্যহীন মজুরির দেখা মিলছে না।

সমান শ্রম, ঘাম, মেধা ও বুদ্ধি খাটালেও মজুরির ব্যাপারে লিঙ্গগত বৈষম্য শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই বিদ্যমান নয়, এর উপস্থিতি বিশ্ব জুড়ে। প্রকৃতপক্ষে ধরায় এমন কোনো দেশই নেই যারা বুক ফুলিয়ে বলতে পারে যে, এ ব্যাপারে আমরা অন্তত ব্যতিক্রম। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের তথ্যানুসারে, বিশ্বে নরের বিবেচনায় নারীর আয় গড়ে ৬৩ শতাংশ। জেন্ডার প্রশ্নে মজুরির অসমতা শুধু নারীকেই তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে না; গবেষণা প্রতিষ্ঠান ম্যাককিনসে গ্লোবাল ইনস্টিটিউটের করা এক জরিপ থেকে উঠে এসেছে যে, মজুরি বৈষম্যসহ শ্রমশক্তিতে নারী ও পুরুষের মধ্যে কমতে থাকা নানা ব্যবধানের অবদানস্বরূপ ২০২৫ সাল নাগাদ বৈশ্বিক বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে যুক্ত হতে পারে ২৮ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার সুফল ভোগ করতে পারে উন্নত এবং উন্নয়নশীল সব দেশই। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতে যদি পুরুষদের মতো নারীরাও সমান কর্মঘণ্টা কাজ করে সমবেতন পায়, সমান হারে শ্রমশক্তিতে অংশ নেয় এবং সব খাতের সর্বস্তরে নিযুক্ত হয় তাহলে বছরপ্রতি মোট দেশজ উত্পাদনে আরো যুক্ত হতে পারে যথাক্রমে ৪.৩, ৪.২ ও ২.৯ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার সুফল ভোগ করতে পারে বিশ্বের নামিদামি সব কোম্পানিও। ব্যাপকভাবে গচ্চা দেওয়া করপোরেট নেতৃত্বের অবস্থানে নারীর অধিকতর প্রতিনিধিত্ব স্বাভাবিকভাবেই প্রতিষ্ঠানের নৈপুণ্যের উন্নতি ঘটাতে সহায়ক হয়ে দাঁড়ায়। মজুরি দেওয়া বা নেওয়ার লিঙ্গগত বৈষম্য একেবারেই নির্মূল করতে চাইলে সবার আগে এর কারণগুলো বোঝাটা খুবই জরুরি।

কেন এই বিদ্যমান মজুরি ব্যবধান?

কর্মস্থলে হ্রাসমান লিঙ্গ-বৈষম্য যে প্রবৃদ্ধির সহায়ক, তার প্রমাণ আছে অসংখ্য। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, কী কী ব্যাখ্যা করে এই বৈষম্যকে? পুরোদস্তুর বৈষম্য মানে পুরুষের সমান কাজ করা সত্ত্বেও শুধু তার লিঙ্গের ভিত্তিতে একজন নারীকে কম পারিশ্রমিক দেওয়া। যারা এ কাজটি করে তারা নিশ্চয়ই এর পেছনে কোনো না কোনো যুক্তি দেখান। বিশ্বের ৪০ শতাংশ দেশে নারী ও পুরুষ বিবেচনায় অর্থাত্ লিঙ্গভেদে মজুরির তারতম্য নিষিদ্ধ; কিন্তু তা কেবল কাগজেকলমেই। বাস্তব চিত্র পুরোপুরি ভিন্ন। লিঙ্গ-বৈচিত্র্য সত্যিই লাভজনক কি না, তা খতিয়ে দেখার জন্য এখন পর্যন্ত বহু গবেষণা সম্পন্ন হয়েছে এবং সেগুলো থেকে উঠে এসেছে বিভিন্ন রকম তথ্য। পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিকসের হয়ে  মার্কাস নোল্যান্ড (অত্র ইনস্টিটিউটের কার্যকরী সহসভাপতি ও ইস্ট-ওয়েস্ট সেন্টারের অনাবাসিক জ্যেষ্ঠ ফেলো), টাইলার মরান (ইনস্টিটিউটের গবেষণা বিশ্লেষক) এবং বারবারা কোসওয়ার (ল্যাটিন আমেরিকা স্টাডিজের সহযোগী অধ্যাপক ও ইনস্টিটিউটের সাবেক রিসার্চ ফেলা) ২০১৬ সালে ৯১টি দেশের ২১ হাজার ৯৮০টি ফার্মের ওপর পরিচালিত এক বৈশ্বিক জরিপের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখিয়ে দিয়েছেন যে, করপোরেট নেতৃত্বের অবস্থানে নারীর উপস্থিতি ফার্মের নৈপুণ্য বাড়িয়ে দিতে পারে। এই সহসম্পর্ক প্রতিফলন ঘটাতে পারে যে, হয়তো এটি বৈষম্যহীনতার প্রতিদান কিংবা নারীরা একটি ফার্মের দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়ক। করপোরেট নেতৃত্বে নারীদের উপস্থিতির সংখ্যার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা ও আউটপুট যেমন ইতিবাচকভাবে সহসম্পর্কিত, অন্যদিকে ঠিক তেমনি সাধারণ বৈশিষ্ট্যসমূহ যেমন নারী কর্মীদের নগণ্য সংখ্যা, প্রমীলা নির্বাহীদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের উপস্থিতি এবং পিতৃত্বজনিত ছুটির পর্যাপ্ততার সঙ্গে নেতিবাচকভাবে সহসম্পর্কিত।

ম্যাককিনসে গ্লোবাল ইনস্টিটিউট ২০১৫ সালে হিসাব বের করে, দৃশ্যটা যদি এমন হতো যে, নারীরা পুরুষদের সঙ্গে সম্পূর্ণ লিঙ্গ সমতা অর্জন করেছে তাহলে বিশ্বের মোট উত্পাদনের পরিমাণ অন্তত এক-চতুর্থাংশ বেড়ে যেত। যেসব দেশে জনসংখ্যা দ্রুত বুড়িয়ে যাচ্ছে, সেখানে নারীর অর্থনৈতিক ভূমিকা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক গুণ বেড়ে যায়, যে কারণে জাপানে উ্যমেনোমিকস টার্মটিই খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং রয়েছে এর বহুল ব্যবহার।  —ডেইলি মিরর অনুসরণে