কীসের টানে ইউরোপে?

আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০১৯, ২০:৫৩

ইউরোপ-আমেরিকার রাজনীতিতে সাম্প্রতিক বত্সরগুলিতে অভিবাসী ও অভিবাসন প্রসঙ্গটি বৃহত্ হইয়া উঠিয়াছে। অজানা ভীতি, বর্ণবাদী বিদ্বেষ সর্বোপরি অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হইবার বিরামহীন প্রচারণার জেরে অভিবাসী ও অভিবাসনকে কেন্দ্র করিয়া ভোটের ফলাফলও অনেকখানি প্রভাবিত হইতেছে পশ্চিমের দেশগুলিতে। এত সন্দেহ, এত অসম্মান প্রত্যক্ষ করিবার পরেও অযুত-নিযুত মানুষ কী কারণে পশ্চিমা দেশগুলিতে ঢুকিতে চেষ্টা করিতেছে? গৃহযুদ্ধ কিংবা রাজনৈতিক কারণে দেশত্যাগকারীদের কথা বাদ দিলে, অন্যরা কেন জীবনের ঝুঁকি লইয়া অবৈধ পথে পশ্চিমা দেশগুলিতে ঢুকিতে চাহিতেছে? উল্লেখ্য, চলতি বত্সরে কেবল ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়া ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টাকালে ১ হাজার মানুষ প্রাণ হারাইয়াছেন। একই উদ্দেশ্যে আফ্রিকার সাহারা মরুভূমি পাড়ি দিতে যাইয়া কত লোক প্রাণ হারাইয়াছে তাহার কোনো সঠিক হিসাব কেহ সংরক্ষণ করিতেছে না। সম্প্রতি আফ্রিকা হইতে গৃহযুদ্ধ বা রাজনৈতিক কারণ ব্যতীত অন্যান্য কারণে ইউরোপে আগত অভিবাসীদের উপরে একটি গবেষণা চালাইয়া ইহার কারণগুলি বুঝিবার চেষ্টা করিয়াছে জাতিসংঘ। ইউরোপে অনুমতিহীনভাবে অবস্থানকারী আফ্রিকার ৩৯টি দেশের প্রায় ২ হাজার ব্যক্তির সাক্ষাত্কারের ভিত্তিতে গবেষণাটি সম্পন্ন করা হইয়াছে।

‘স্কেলিং ফেন্সেস’ শীর্ষক গবেষণাটিতে দেখা যাইতেছে যে, সাক্ষাত্কার প্রদানকারী ব্যক্তিদের মধ্যে ৭১ শতাংশই যুদ্ধপীড়িত নহে বরং আফ্রিকা মহাদেশের মধ্যে তুলনামূলকভাবে উন্নতিশীল ও শান্তি বিরাজমান দেশগুলি হইতে আগত। এই ক্ষেত্রে উদাহরণস্বরূপ নাইজেরিয়া ও সেনেগালের নাম উল্লেখ করা যাইতে পারে। প্রশ্ন উঠিতে পারে, এইসব দেশ হইতে লোক কেন ইউরোপের উদ্দেশে দিকশূন্য হইয়া ধাবিত হইতেছে? গবেষণা হইতেই উত্তর মিলিতেছে। এইসব লোক দারিদ্র্য, সুযোগহীনতা এবং সামাজিক নিরাপত্তা জালের অনুপস্থিত হইতে মুক্তি পাইবার জন্যই দেশ ছাড়িতেছে। আরো লক্ষ্য করিবার মতো ব্যাপার এই যে, আগতদের মধ্যে শতকরা ৫৮ ভাগ লোক নিজ দেশে জাতীয় আয়স্তর অপেক্ষা ৬০ ভাগ বেশি বেতনে চাকুরি করিতেন। কিন্তু দেশের পরিস্থিতি এতটা প্রতিকূল যে উল্লিখিত বেতনেও তাহারা পরিবার-পরিজন লইয়া স্বাচ্ছন্দ্যে দিন যাপন করিতে পারিতেছিলেন না।

পরিতাপের বিষয় এই যে, সমৃদ্ধির সোনার হরিণটিকে ধরিবার লক্ষ্যে জীবন বাজি রাখিয়া ইউরোপে আসিলেও বহুজনের ক্ষেত্রে ইহা অধরাই থাকিয়া যাইতেছে। তাহা হইলে পুরো বিষয়টি কী দাঁড়াইতেছে? ছাড়িয়া আসা কিংবা পড়িয়া থাকা দেশের কোনোটিতেই এই সমস্ত লোকের জীবনমানের চাকা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ঘুরিতেছে না। পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলিতে অনুমতিহীনভাবে প্রবেশকারীদের জন্য বৈধ চাকুরির সুযোগ না থাকায় পরিস্থিতি ক্রমাগত জটিল হইয়া পড়িতেছে। ফাঁকতালে পড়িয়া যেই দেশগুলি হইতে এই মানুষগুলি আসিয়াছে, সেই দেশগুলি তাহাদের মেধার ব্যবহার হইতে বঞ্চিত হইতেছে। এই সমস্যা কেবল আফ্রিকা নহে, বরং এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলির ক্ষেত্রেও সত্য। একদিকে মেধাসম্পদ হাতছাড়া হইয়া যাওয়া, অন্যদিকে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও পশ্চিমা দেশগুলিতে প্রত্যাশামাফিক কর্মসংস্থান না হওয়া পশ্চিমে অভিবাসীবিরোধী হাওয়ার এই সময়ে এই দুই সমস্যার সমাধানের কোনো হদিস আপাতত মিলিতেছে না।