শান্তিতে নোবেল এবং একজন আবি আহমেদ

আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০১৯, ২০:৫৪

তৃতীয় বিশ্বেরও তলানিতে তার দেশ, যেখানে গরিবি সীমাহীন, দুর্নীতি লাগামহীন। বাক্স্বাধীনতা ছাপার অক্ষরেও ঝাপসা হয়ে পড়ার দশা, সংবাদমাধ্যম সরকারি মুখপত্রে পরিণত। আছে জাতিগত বিভাজনের ক্ষত। মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘার মতো আছে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে দুই দশকের কাজিয়া। এই আগুনে বাস্তবতায় দেশের শাসনভার কাঁধে নিয়ে বৃষ্টির পয়গাম নিয়ে এলেন তিনি। এবং কী আশ্চর্য, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার মাত্র ১০০ দিনের মধ্যে বৃষ্টিও নামালেন! ‘জাদুকরি’ বিশেষণেও তার এই চমত্কারিত্বের পুরোটা ধরা পড়ে না। জাদুকরেরও জাদুকর এই মানুষটির নাম আবি আহমেদ; ‘কালো’ ইথিওপিয়ার ‘কালো’ প্রধানমন্ত্রী।

আক্ষরিক অর্থেই বিদ্যমান ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একা আবি আহমেদের ব্যক্তিমানুষের লড়াইকে স্যালুট জানাল এবার নোবেল কমিটি। প্রায় প্রতিবারই শান্তিতে নোবেল ঘোষণার পর এর যৌক্তিকতা নিয়ে কমবেশি বিতর্ক ওঠা প্রায় নিয়মে দাঁড়িয়ে গেছে। প্রশ্ন তোলা হয় নোবেল প্রবর্তনের সার্থকতা নিয়েও। তবে এবার এমন কি শান্তিতে নোবেল পাওয়ার অন্যতম ‘হকদার’ ডোনাল্ড ট্রাম্পের তরফেও কোনো ট্যাঁ-ফোঁ শোনা যায়নি!

প্রতিবেশী দেশ ইরিত্রিয়ার সঙ্গে গত দুই দশক ধরে ইথিওপিয়ার যুদ্ধ-বিবাদ চলছিল। এই দুই গরিব দেশের রাজনীতিতেই জোশ জোগাত সেই খরুচে যুদ্ধ। যে পরিমাণ টাকা একে-অপরকে ঘায়েলের জন্য দেশ দুটি রাজকোষ উজাড় করে ঢালছিল, তাতে তাদের চেহারা পালটে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট ছিল—কিন্তু তা হয়নি। কারণ, ‘জাতীয়তাবাদ’ নামের তুরুপের তাস আবি আহমেদের পূর্বসূরিরা ক্ষমতার দান মারতে যাচ্ছে তাই এস্তেমাল করেছেন। আবি আহমেদ সেই দান পালটে দিলেন।

ক্ষমতায় বসার মাত্র ১০০ দিনের মধ্যে দুই দশকের এই বিবাদ মেটাতে শান্তিচুক্তি করলেন। এবং এই কদিনের মধ্যেই সেই সব বিরোধী রাজনীতিককে দেশে ফিরিয়ে আনলেন যারা রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের মুখে বিদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। সংবাদ মাধ্যমের গলায় চেপে ধরা ফাঁস আলগা করেছেন। বাক্স্বাধীনতার স্বাদ ভোগ করতে শুরু করেছে ইথিওপিয়াবাসী। নিজের মন্ত্রিসভায় অর্ধেক আসনে নারীদের বসিয়েছেন আবি আহমেদ। নারীর ক্ষমতায়নের পক্ষে এর চেয়ে ভালো উদাহরণ আর কী হতে পারে ? এমন কী প্রধান বিচারপতি পদে বসিয়েছেন এক অসামান্য নারীকে। এসব পদক্ষেপে রাজনীতির আত্মঘাতী স্রোত থেকে দেশকে সার্বিক উন্নয়নের ধারায় নিয়ে যাওয়ার লক্ষণ স্পষ্ট।

আরো আছে, এই ১০০ দিনের মধ্যে একদিন ২০ কোটির বেশি গাছ লাগানোর রেকর্ডও গড়েছেন আবি আহমেদ। বৈশ্বিক উষ্ণতার বিরুদ্ধে এমন ‘সবুজ’ জবাব কতজন রাষ্ট্রপ্রধান দিতে পেরেছেন? বস্তুত যে দেশের মানুষ স্বপ্ন দেখতেই  ভুলে গিয়েছিল, তাদের নতুন করে শুধু স্বপ্নই দেখালেন না, স্বপ্নকে সাকার দিলেন আবি আহমেদ। এ কথা তর্কাতীতভাবে সত্য যে দেশের অভ্যন্তরে জাতিগত বিভেদ-বিভাজন যত জিইয়ে রাখা যায়, রাজনীতির বাহাস তত জ্বালানি পায়। এই সুযোগে দেশবাসীর কণ্ঠরোধ, সংবাদ মাধ্যমের গলায় ফাঁস বসানোর কাজটি সেরে ফেলা যায় অনেকটা নিয়মতান্ত্রিকতায়। আর প্রতিবেশীর সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদ থাকলে তো কথাই নেই; মসনদমুখী রাজনীতির সবচেয়ে বড়ো হাতিয়ার ‘জাতীয়তাবাদ’ তখন করায়ত্ত। সুতরাং এই মোক্ষম জিগির তুলে উন্নয়নের খামতি-ক্ষত ঢাকতে বেগ পেতে হয় না শাসকদের। আবি আহমেদের পূর্বসূরিরা তাই করেছেন, ইতিহাস সাক্ষী।

চারদিকে একবার চোখ বুলালে দেখা যায়, বিশ্বের বৃহত্, চওড়া, প্রশস্ত—সব কিসিমের গণতন্ত্রের কাণ্ডারিরাও এই কাজে বেহদ পটু। সে সব দেশের মানুষেরও কমবেশি বিশ্বাস, সরকারের পাশে থাকা নাগরিক হিসেবে তাদের কর্তব্য। এতে নাগরিক স্বাধীনতা যতটাই খর্ব হোক, ভিন্নমত যতই পাথরে চাপা পড়ুক। কেননা, সেনারা সীমান্তে লড়ছেন। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ব্যতিব্যস্ত সরকার। আবি আহমেদেরও এই সহজ আয়োজন থেকে সরে আসার কোনো কারণ ছিল কী—যখন একমাত্র লক্ষ্য হতো সিংহাসন?

কাঁটাতারে গণ্ডিবদ্ধ ভূখণ্ড দেশ নয়, সেই ভূখণ্ডে থাকা প্রত্যেক মানুষের মনের মধ্যে দেশ জাগরূক থাকে। আবি আহমেদ এই কথাটা জানেন বলেই দেশের রাজনৈতিক এস্টাবলিশমেন্টের বিরুদ্ধে লড়েছেন, দেশের বুকে চেপে জেঁকেবসা দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়েছেন। এই লড়াই তখনই লড়া যায় যখন গণতন্ত্রের প্রতি, শান্তির প্রতি দায়বদ্ধতা থাকে। শুধু সীমান্তে যুদ্ধ বন্ধ করাই শান্তি প্রতিষ্ঠা নয়, দেশে গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠাও শান্তির অপর নাম। নোবেল কমিটি সেই শান্তির উপাসককে স্বীকৃতি দিল।

n লেখক :সাংবাদিক