রক্তশূন্যতা থেকে হূদেরাগ

আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০১৯, ২০:৫৭

বর্তমান বিশ্বে অপরিণত বয়সে মৃত্যুর প্রধান কারণ হূদেরাগ। পশ্চিম গোলার্ধে প্রতি দুই জনের মধ্যে এক জনের অপরিণত মৃত্যুর কারণ হূদেরাগ। এই হূদেরাগীর অনেকেরই আবার রক্তশূন্যতা থাকে। আমাদের শরীরের ওজনের ৮ শতাংশ থাকে রক্ত, এর মধ্যে প্লাজমা (৫ শতাংশ) ও তিন প্রকার কোষ (৩ শতাংশ) থাকে। লোহিত রক্তকোষের মধ্যে হিমোগ্লোবিন নামক লৌহসমৃদ্ধ প্রোটিন থাকে, যা অত্যন্ত জরুরি। হিমোগ্লোবিন অনেক জরুরি কাজ করে থাকে। যেমন—

১. ফুসফুস থেকে বিশুদ্ধ অক্সিজেন দেহের সব কোষে পৌঁছে দেয়।

২. দেহের কোষসমূহ থেকে দূষিত কার্বন ডাইঅক্সাইড ফুসফুসে নিয়ে যায়।

৩. দেহের ‘অম্ল-ক্ষারক’ রক্ষা, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং লৌহ/প্রোটিন সংরক্ষণ ইত্যাদি কাজ করে থাকে।

যদি মানুষের বয়স ও লিঙ্গ অনুসারে হিমোগ্লোবিন কম থাকে, তবে ঐ অবস্থাকে এনিমিয়া বা রক্তশূন্যতা বা রক্তস্বল্পতা বলে। শরীরে আয়রনের অভাব, বি১২ ভিটামিন বা ফলিক অ্যাসিডের অভাব, রক্তপাত, কিডনি রোগ, অস্থিমজ্জার কর্মহীনতা বা যেকোনো ধারাবাহিক/ দীর্ঘমেয়াদি রোগের কারণে এনিমিয়া হতে পারে। হূদেরাগীদের এনিমিয়া যেমন বিপজ্জনক, তেমনি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা হয় যখন রক্তসল্পতার রোগী হূদেরাগে পতিত হয়। উচ্চরক্তচাপ, ইসকেমিক হার্ট ডিজিজ, হার্ট ফেইলির কিংবা এরিদমিয়া যে হূদেরাগই হোক না কেন, সবই জটিল হয়ে যায় যখন সঙ্গে এনিমিয়া যোগ হয়। কারণ এসব রোগের সময় হূদ্যন্ত্রকে অনেক বেশি কাজ করতে হয়। ফলে বেশি অক্সিজেনের প্রয়োজন হয়। অন্যদিকে এনিমিয়ায় রক্তে হিমোগ্লোবিন কম থাকায় অক্সিজেন পরিবহন কষ্টসাধ্য হয়ে যায়। হূদ্যন্ত্রের অক্সিজেনের চাহিদা পূরণ না হওয়ার কারণে ইসকেমিয়া, এরিদমিয়া ও ফেইলরের মাত্রা বেড়ে যায়। রোগীর কষ্ট ও চিকিত্সা ব্যয় বেশি হয়।

হূদেরাগীদের রক্তশূন্যতা হলে যেসব সমস্যা হতে পারে—

১. হূদ্যন্ত্রের দেওয়াল মোটা হওয়া,

২. হূদ্যন্ত্রের প্রকোষ্ঠের আকার বৃদ্ধি পাওয়া, অনিয়ন্ত্রিত হূত্স্পন্দন।

৩. কিডনি রোগের মাত্রা বেশি হওয়া,

৪. ইসকেমিক হার্ট ডিজিজের মাত্রা বেশি হওয়া এবং ব্যায়ামের ক্ষমতা কমে যাওয়া।

৫. মানসিক বা আর্থিক সমস্যা।

যা করতে হবে—

হূদেরাগ ও রক্তশূন্যতা এককভাবে যতটুকু সমস্যা সৃষ্টি করে, যৌথভাবে অনেক গুণ বেশি অসুবিধা তৈরি করে। তাই হূদেরাগ থাকলে সঠিক চিকিত্সার পাশাপাশি এনিমিয়া প্রতিরোধের জন্য চিকিত্সক নির্দেশিত সুষম খাবার, আয়রন, ভিটামিন ও শাকসবজি, ফলমূল খেতে হবে। কারো শুধু এনিমিয়া থাকলে সঠিক চিকিত্সার পাশাপাশি হূদেরাগ হওয়ার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা নিয়ন্ত্রণ/ চিকিত্সার ব্যবস্থা করতে হবে। যেমন ওজন নিয়ন্ত্রণ, ডায়াবেটিসের চিকিত্সা, চর্বি নিয়ন্ত্রণ, ধূমপান ইত্যাদি পরিহার করতে হবে।

শেষ কথা

The Heart never sleeps. জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সব সময় হূদ্যন্ত্রকে কাজ করতে হয়। হূদ্যন্ত্র হিমোগ্লোবিনের সঙ্গে অক্সিজেনকে দেহের প্রতিটি কোষে পৌঁছে দেয়। তাই হূদ্যন্ত্রকে যেমন সুস্থ থাকতে হবে, তেমনি হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ ও গুণাগুণ ঠিক রাখতে হবে। এই দুটি অঙ্গের কর্মতত্পরতার ওপর মানুষের দৈহিক, মানসিক ও আর্থিক সুস্থতা নির্ভর করে এগিয়ে যাবে। অসুস্থতায় রেজিস্টার্ড চিকিত্সকের পরামর্শ নিতে হবে।

 

nঅধ্যাপক ডা. লিয়াকত হোসেন তপন

অধ্যক্ষ, শেখ সায়েরা খাতুন মেডিক্যাল কলেজ, গোপালগঞ্জ

মেডিনোভা মেডিকেল সার্ভিসেস লি.

উত্তরা শাখা, ঢাকা