যশোর অফিস
যশোরের ঐতিহ্য খেজুরের রস, গুড়, পাটালি। তাই শীতের আগমনি বার্তার সঙ্গে সঙ্গে রস, গুড়, পাটালি তৈরিতে প্রস্তুত হচ্ছেন খেজুরগাছিরা। কথায় আছে যশোরের যশ খেজুরের রস। খেজুর রসের প্রসঙ্গ মনে উঠলেই তাই যশোরের কথা সবার সামনে চলে আসে। এই জেলায় উত্পন্ন খেজুরের রস গুণে মানে স্বাদে সর্বোত্কৃষ্ট। যশোরের খেজুরের রস, গুড় শুধু এই অঞ্চলের মানুষের চাহিদাই মেটায় না, গুড় পাটালি আকারে ছড়িয়ে পড়ে দেশ-বিদেশে। তাই শীতের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে ব্যস্ত সময় পার করছেন এ অঞ্চলের খেজুরগাছিরা। গাছ তোলা, হাঁড়ি প্রস্তুত, ঠিলে ধোয়া, রস জ্বালানোর চুলা তৈরিসহ নানা কাজে তাদের ফুরসত নেই।
যশোর সদর উপজেলার হাটবিলা গ্রামের মিজানুর রহমান বলেন, শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্রামে বেড়ে যায় গাছিদের ব্যস্ততা। রস সংগ্রহ আর বিক্রিতে দা গাছি নিয়ে মেঠোপথ ধরে নিরন্তর ছুটে চলেন তারা। তাই মৌসুমের শুরুতে যশোরের গাছিরা ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন গাছ তোলা, হাঁড়ি প্রস্তুত, ঠিলে ধোয়া, রস জ্বালানোর চুলা তৈরির কাজে। আর কয়েকদিন পরেই মধুবৃক্ষ থেকে গাছিরা সংগ্রহ করবেন সুমিষ্ট খেজুরেররস। এসব রস জ্বালিয়ে তৈরি করা হবে সুস্বাদু পাটালি ও গুড়।
মনিরামপুর উপজেলার ঢাকুরিয়া গ্রামের গাছি আজিবর গাজী বলেন, আমাদের এলাকার নলেন গুড়ের কদর আছে সারাদেশে। এ গুড় থেকে তৈরি করা যায় সন্দেশ, ক্ষির, পায়েসসহ নানান রকমারি খাদ্য—যার স্বাদের জুড়ি নেই। তিনি বলেন, আশ্বিনের শেষের দিকে খেজুরগাছকে প্রস্তুত করতে হয় রস আহরণের জন্য। গাছের বাকল কেটে ‘গাছ তোলা’ হয়। তারপর গাছ কাটতে হয়। কোমরে মোটা দড়ি বেঁধে ধারাল বিশেষ দা দিয়ে সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিন গাছ কেটে রস সংগ্রহ করতে হয়। সুমিষ্ট রসের সুগন্ধে ভিড় জমায় পিঁপড়া, মৌমাছি, কাঠবিড়ালী, পাখি। এই রসের নাম শুনলেই জিভে পানি এসে যায়। এখানকার মাটি ও আবহাওয়ার কারণে কেবল যশোর জেলাতেই নলেন গুড়ের সুনাম রয়েছে।
বাঘারপাড়া উপজেলার তেজরোল গ্রামের রফিকুল ইসলাম বলেন, আমাদের এ অঞ্চলের মানুষ রস ও গুড় দিয়ে তৈরি করেন বিভিন্ন ধরনের পিঠা। আবার অনেকে নানান ধরনের পাটালি তৈরি করেন। এখানকার নারিকেলের পাটালি মানুষের বিশেষ পছন্দের। তাই আমরা আত্মীয়স্বজনদের বাড়ি পাঠাই। একই উপজেলার বারবাগ গ্রামের জাবের আলী বলেন, খেজুরগাছের সঙ্গে সঙ্গে যশোরে এখন গাছিদের দেখা মেলা ভার। নতুন কেউ এই পেশায় না আসায় খেজুরের গাছ কাটা সম্ভব হচ্ছে না। যারা আছেন তারাও নানা কারণে এ পেশা ছেড়ে দেওয়ার চিন্তা করছেন। কারণ এই কাজে অনেক কষ্ট।
বসুন্দিয়া গ্রামের নাজিম উদ্দিন বলেন, গ্রামে গ্রামে এখন ইটভাটা। সেখানে দেদারসে পোড়ানো হচ্ছে খেজুরগাছ। সে কারণে দিন দিন গাছের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। তাছাড়া লোকবলের সংকট তো আছেই।
সদর উপজেলার উপসহকারী কৃষি অফিসার মাহবুব আলম বলেন, যশোর জেলার ঐতিহ্য ধরে রাখার স্বার্থে খেজুরগাছ লাগানোর জন্য কৃষকদের বিভিন্ন পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আমরা স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদকে সঙ্গে নিয়ে রাস্তার দুই ধারে খেজুরগাছ ও তালগাছ রোপণ করছি। ভিন্নমান ও স্বাদের খেজুরের গুড়ের জন্য যশোরের কারিগরদের যেমন সুনাম রয়েছে তেমনি কদর আছে রস সংগ্রহকারী গাছিদেরও।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, যশোর জেলায় ৭ লাখ ৯১ হাজার ৫১৪টি খেজুরগাছ রয়েছে। যা থেকে গতবছর ৪ হাজার ৬৪০ মেট্রিক টন গুড় ও প্রায় ৪০ মেট্রিক টন রস উত্পাদিত হয়েছে।
