g শফিক হাসান
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশেষ টিমের চৌকস কর্মী নেয়ামত হোসেন যেদিন দুটো পেঁয়াজ উদ্ধার করতে সমর্থ হলো, হইচই পড়ে গেল চারদিকে। সবার জিজ্ঞাসা, কিভাবে সম্ভব হলো! দেশে কালো টাকার মালিকের অভাব নেই। হিংস্র এক টাকার কুমিরের বাসার সামনে থেকে ময়লা অপসারণের সময় সেখানে অভিযান চালানো হলে বেরিয়ে আসে দুই দুইটি আস্ত পেঁয়াজ। অবস্থা বেগতিক দেখে সেই কালো টাকার মালিক সপরিবারে লাপাত্তা হলো। রাস্তায় পড়ে থাকল তার অনৈতিক উপায়ে অর্জিত কোটি কোটি টাকার নোট!
অপরাধী শনাক্ত ও ডাসা পেঁয়াজ উদ্ধারের কারণে খাসা পুরস্কারও জুটে যায়। সরকারিভাবে উপাধি পায় ‘জাতীয় বীর’। বর্তমানে এই বীরের একমাত্র কাজ পেঁয়াজ অভিযান অব্যাহত রাখা। আমদানিকারক, মজুতদার, আড়তদার ও খুচরা ব্যবসায়ীদের মধ্যে পেঁয়াজ-প্রেম জাগ্রত রাখতে প্রতিদিন সকালে দোকান খোলার আগে বাধ্যতামূলকভাবে সবাইকে গাইতে হয় ‘পেঁয়াজ সংগীত’। অ্যাসেম্বলির নেতৃত্বে থাকে নেয়ামত। সারা দেশে সংগীতচর্চা চালু হলেও পরিস্থিতির উন্নত হয়নি। কারণ, যারা বাটপারি করার, তারা ঠিকই ঝোপ বুঝে কোপ মারছে। গতকাল পত্রিকার প্রথম পাতায় খবর বেরিয়েছে—বিমানবন্দরে পেঁয়াজ চোরাচালানে ধরা পড়েছে দুজন। যোগসাজশ করে তিন কেজি পেঁয়াজ পাচারের তালে ছিল। সেগুলো জব্দ করা হলে দুই অপরাধীর জায়গা পেল জেলখানায়। স্বজনেরা তাদের দেশবিরোধী কর্মকাণ্ডে যারপরনাই ব্যথিত।
পেঁয়াজ উদ্ধারের পরপরই ধরা পড়ল আরেক ভয়ংকর অপরাধী। যুক্তরাজ্যপ্রবাসী এক লোক সন্তানের জন্য বাংলা পাঠ্যবই নিয়ে যাচ্ছিলেন। বর্ণমালা পরিচিতি অংশে লেখা ‘প-তে পেঁয়াজ’! সযত্নে পেঁয়াজের ছবিটা কেটে অ আ মন্ত্রণালয় থেকে সার্কুলার জারি হলো— অপব্যবহার রোধে পাঠ্যবইয়ে পেঁয়াজের ছবি বা নাম ব্যবহার করা যাবে না।
নারীরা কানের ঝুমকায় সোনার বদলে ব্যবহার করতে শুরু করেছে অমূল্য ধন পেঁয়াজ। এতে চুরি-ছিনতাই বেড়েছে। ছিনতাইকারীর হ্যাঁচকা টানে কারো কারো কানের লতি ছিঁড়ে গেল। কান হারালেও বিয়ের বাজারে সেসব মেয়ে ‘ভিআইপি’ হিসেবে গণ্য হলো।
নেয়ামতের বউ ফারজানার কানও ছিঁড়ল একদিন। পরদিন পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হলো— কত টাকা বেতন পেলে একজন ব্যক্তির বউ কানে দুটি পেঁয়াজ ব্যবহার করতে পারে! ঘুষ-দুর্নীতির বিষয় রয়েছে কি না সংশয় প্রকাশ করা হলো প্রতিবেদনে। বসদের কাছেও নেয়ামতের ক্লিন ইমেজ থাকল না। ফারজানা ফিরে গেল ইমিটেশনে! বাধ্য হয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দাবি জানাল, ফ্যাশন হিসেবে পেঁয়াজের ব্যবহার বন্ধ করা হোক। দেশীয় অপরাধীদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মাফিয়ারাও অপকর্মে যুক্ত হচ্ছে। বাড়ছে অপরাধপ্রবণতা। সীমান্তে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার হলেও থামেনি অসাধু বাণিজ্য। একদিকে আমদানিতে দীর্ঘসূত্রতা, অন্যদিকে পাচারে বিদ্যুত্গতি—ব্যবসা মন্ত্রণালয়ের পাগল পাগল দশা হলো। বিরোধীদলের সমালোচনা, সাধারণ মানুষের গালমন্দ, টকশোর বক্রোক্তি বাড়তেই থাকল।
পরিস্থিতি সামাল দিতে যুগোপযোগী ভূমিকায় নামতে হলো নেয়ামত হোসেনকে। পেঁয়াজ চাষিদের প্রণোদনা দেওয়ার বিষয়ে আলাপ করল ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে। সরকারিভাবে প্রকাশিত-প্রচারিত হলো বিশেষ বুলেটিন—পেঁয়াজের অপচয় রোধ করুন। নতুন স্লোগানে বলা হলো—রান্নায় কান্না নয়, একটির অধিক পেঁয়াজ নয়, অর্ধেক হলে ভালো হয়। নিরুত্সাহিতকরণে রান্নাঘরের সামনে ঝুলিয়ে দেওয়া হলো পেঁয়াজের বড় পোস্টার। যাতে গৃহিণীরা ছবিতে পেঁয়াজের উপস্থিতি দেখেই সন্তুষ্ট থাকতে পারে! পেঁয়াজ চাষি পরিবারের ছেলেমেয়েদের বিয়ে হতে লাগল সম্ভ্রান্ত পরিবারে। গোপনে সংঘটিত হচ্ছে বাল্যবিয়েও। অন্যপক্ষ নাছোড়—পরে যদি ভালো সম্বন্ধটা ছুটে যায়!
শহরের বাসাবাড়িতে বুয়ারা সোনাদানা বাদ দিয়ে পেঁয়াজ চুরিতে মনোনিবেশ করলে টপাটপ চাকরি হারাতে লাগল। উল্টো গৃহবধূরা গোপনে অন্যের বাসায় গৃহকর্মীর চাকরি নিচ্ছে। স্বচক্ষে যদি দেখা ও খাওয়া যায় কাঁচাসোনা পেঁয়াজ! গৃহকর্তারা রাতারাতি সংলাপ পাল্টে ফেলল। ইলিশ বিক্রেতারা হাজার টাকা কেজি দাম হাঁকলে ক্রেতারা বলতে শুরু করল, ‘পেঁয়াজের দাম চাচ্ছ নাকি হে! দেশটা কি মগের মুল্লুক!’
উত্তরে শুনতে হয়, ‘সেই মগের মুল্লুক মিয়ানমারের পেঁয়াজই আসছে। ইলিশ না কিনে সেই পেঁয়াজ কিনে খান!’
তর্ক-বিতর্কের মাঝে রোহিঙ্গা ইস্যুর অনুপ্রবেশে সবারই দীর্ঘশ্বাস বাড়ে। কী জামানা এলো, রোহিঙ্গা পরিবারের ঘরে ঘরে নিত্যনতুন বাচ্চা! পেঁয়াজহীন একটি প্রজন্মের চিন্তার পাশাপাশি নিজেদের ভবিষ্যত্ আশঙ্কায় চিন্তিত অনেকেই। ইলিশে পেঁয়াজের বদলে পেঁপে-মুলা ব্যবহারের পরামর্শ দেয় গৃহকর্তারা। তবে হোটেলের চিত্র ভিন্ন। ঢাকার নামকরা আল নিজাম হোটেলের সামনে পেঁয়াজের গুণগান গেয়ে শোভা পেতে লাগল ডিজিটাল সাইনবোর্ড—এই সেই ঐতিহ্যবাহী হোটেল, যেখানে আগে প্রতিদিন একমণ পেঁয়াজ কাটা হতো। দুর্মূল্যের বাজারে এখনো আমরা গ্রাহকদের পেঁয়াজ দিচ্ছি।
খাবার খেতে নয়, একটুকরো পেঁয়াজ খাওয়ার লোভে হোটেলে বাড়লো ক্রেতার লাইন। এমন মচ্ছবে দেখে দূর থেকে যৌবনে বাম দল করা কেউ কেউ মন্তব্য করতে থাকলেন—পেঁয়াজ দীর্ঘজীবী হোক। লাইনে বিশৃঙ্খলা বাড়লে উদ্যোগী হতে হলো নেয়ামত হোসেনসহ চৌকস বাহিনীকে। গ্রাহকের ‘পেঁয়াজ জ্যাম’ বাড়তে বাড়তে একদিন ২২ মাইলে পৌঁছাল। বন্ধ হয়ে গেল পথঘাট, যানবাহন। বাধ্য হয়েই আল নিজাম হোটেলে পেঁয়াজের ব্যবহার বন্ধ করতে বাধ্যতামূলক নোটিস দিতে হলো।
নেয়ামত বাইরে যতই বীরত্ব দেখাক, ঘরে মেনি বেড়াল। তার স্ত্রী আরো দশ বাহিনীর বউয়ের সঙ্গে তুলনা করে বলতে লাগল, ফকিন্নির হালে রাখা হয়েছে তাকে; একটা পেঁয়াজও নেই! বিয়ের আগে ভেবেছিল, কত কোটি টাকা না জানি উপরি পায়! বউয়ের ঘ্যানঘ্যান চলতে থাকলে নেয়ামত সিদ্ধান্ত নেয়, চাকরি ছেড়ে গ্রামে পেঁয়াজ চাষই শুরু করবে। পেঁয়াজের স্ট্যাটাসের কাছে দেশের সবকিছুই এখন ফেল! g
