সাধু সাবধান

আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০১৯, ১৭:৪৩

  জামসেদুর রহমান সজীব

 

এলাকার যে কয়েকজন ভাই-ব্রাদারদের আমরা সম্মানের চোখে দেখি তার মধ্যে একজন হলো সাধু ভাই। কিন্তু ইদানীং তাকে সম্মানের চোখে দেখা তো দূরে থাক, খালি চোখে দেখারও সুযোগ হয় না। এর অন্যতম কারণ হলো তিনি বাসা থেকেই খুব একটা বের হন না। আর তার কারণ হলো সাধু ভাইয়ের বউ ওরফে আমাদের ভাবি খুব চোখে চোখে রাখেন তাকে। এলাকার ছোট ভাই হিসেবে আমরা সাধু ভাইকে সম্মানের চোখে দেখলেও এলাকার বাদ বাকি মানুষ তাকে বদনজরে দেখে বেশিরভাগ। এতে সাধু ভাইয়ের বিশেষ কোনো দোষ নেই। কিন্তু লোকটার পোড়া কপালের জোর আছে খুব!

সম্প্রতি সাধু ভাইয়ের খোঁজ নিতে গিয়ে আমরা জানতে পারলাম তাকে বোবা বানিয়ে রাখা হয়েছে। কেননা তিনি যখনই মুখ খোলেন একটা না একটা ঝামেলা বাঁধিয়ে বসেন। সেদিন বাজারে গেছেন ইলিশ কিনতে। জাটকা চোখে পড়তেই তিনি মাছ বিক্রেতাকে বোঝাতে বসে গেলেন জাটকা বাজারজাতকরণ আইনতগত অপরাধ। কিন্তু এক পর্যায়ে দেখা গেল তিনি কেন মাছ বিক্রেতাকে পরামর্শ ঝাড়তে গেলেন, সেটাই অপরাধ হয়ে গিয়েছে। এই সমাজে যেখানে একজনের প্রয়োজনে অপরজন এগিয়ে আসে না তেমন, কী জানি কী করে মাছ বিক্রেতারা ঠিকই এগিয়ে এসে একজোট হয়ে সাধু ভাইকে প্যাঁদানি দিয়ে বাসায় পাঠিয়ে দিল।

মাছ না কিনে ফ্রিতে প্যাঁদানি খেয়ে বাসায় ফিরেও সাধু ভাইয়ের রক্ষা নেই। ভাবি আরেক দফা তুলাধুনা করলেন তাকে। বাজারে কেন বোকার মতো আচরণ করতে হবে এই বিষয়ে যখন ভাবি বিশেষ লেকচার উপস্থাপন করছেন, এমন সময়ে সাধু ভাই তাকে বোঝাতে গেলেন জাটকা ধরার অপকারিতা। তারপর সাধু ভাইয়ের ওপর যে মাইর পড়ছে তার সঙ্গে মাছ বিক্রেতাদের মাইর তুলনা করতে গেলে কিছুই না! রাগে দুঃখে এবং টুকটাক অপমানের কারণে সাধু ভাই ফেসবুকে ঢুকলেন হূদয়বিদারক স্ট্যাটাস দিতে। তিনি খেয়াল করেছেন, ফেসবুকে কিছু লিখে স্ট্যাটাস দিলে দারুণ সুখানুভূতি হয়। ‘আমার মন ভালো নেই’ লিখে সেদিন স্ট্যাটাস দেওয়ার পরপরই তার কেন জানি খুব ভালো লাগতে শুরু করেছিল। অফিস শেষে লোকাল বাসে বাদুড়ঝোলা হয়ে ফিরে আসার পথে মানিব্যাগ চুরি যাওয়ার পর যখন ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিলেন ‘মানিব্যাগটা চোরে নিয়ে গেছে, খুব কষ্ট লাগছে’, হুট করেই মানিব্যাগ চুরি যাওয়ার কষ্ট চলে যায়। পূর্ব অভিজ্ঞতার প্রেক্ষিতে তাই তিনি আজও স্ট্যাটাস লিখলেন ফেসবুকে, ‘অনেকদিন পর বউয়ের হাতে প্যাঁদানি খেলাম। কষ্ট লাগছে।’ মুহূর্তেই গাদাখানেক হা হা রিঅ্যাক্ট, সাধু ভাইয়ের শালি স্ট্যাটাসের কমেন্টে লিখল, ‘ছিঃ দুলাভাই! আমার বোনকে অপমান করলেন। এক্ষুনি আপুকে দেখাচ্ছি।’ এরপর যা ঘটল, তা বিশদ আকারে বর্ণনা করা না গেলেও আমরা শুনতে পেরেছিলাম তার কথা বলার পাশাপাশি ফেসবুকে স্ট্যাটাস লেখাও অনির্দিষ্টকালের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে!

আমরা যারা জুনিয়র, তাদের জন্য এ এক মহাবিপদ। সাধু ভাইয়ের ভয়াবহ ফলোয়ার আমরা। তিনি কিছু বললে বা ফেসবুকে কিছু লিখলে আমরা তা অমৃতবাণী হিসেবে গ্রহণ করি। এখন তার কথা বলাও বারণ, স্ট্যাটাস লেখাও বারণ। কিন্তু আমাদের অবাক করে দিয়ে সাধু ভাই ফেসবুকে ছবি আপলোড দিলেন। কোনোরকম ক্যাপশন বা বিবরণ ছাড়াই। আমরা সাধু ভাইয়ের প্রতিভা দেখে অবাক। ছবি আপলোড করতে তো আর কথা বলা বা লেখার দরকার পড়ছে না। লোকটার মাথায় আসলেই মাল আছে। কিন্তু শুরুতে ওই যে বললাম না, ভাইয়ের পোড়া কপালের জোর আছে! পাশের বাসার সদ্য বিবাহিত দম্পতি অভিযোগ নিয়ে হাজির হলেন সাধু ভাইয়ের বউয়ের কাছে। তাদের দাবি, সাধু ভাই ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে যেই সেলফি তুলে আপলোড করেছে, সেখানে নতুন বউকে দেখা যাচ্ছে! মাত্রই গোসল সেরে বারান্দায় কাপড় নেড়ে দিতে এসেছিল সে, ওই সময় নাকি সাধু ভাই জেনে-বুঝে ছবি তুলেছে! ব্যস, তিল হয়ে গেল তাল। আর সাধু ভাইয়ের অবস্থা বেসামাল! লাস্ট আপডেট আমরা এটা জানতে পেরেছি ভাবি কাজের বুয়াকে বের করে দিয়েছেন, এখন ঘরের সমস্ত কাজ করেন আমাদের শ্রদ্ধেয় সাধু ভাই। কাজের ঠ্যালায় কথা বলা, ফেসবুক স্ট্যাটাস দেওয়া তো দূরের বিষয়, নাওয়া-খাওয়া পর্যন্ত ভুলে যান সাধু ভাই।

ভাইয়ের এই চরম দুঃসময়ে আমাদের ভেতরকার দুঃখবোধ, মানবতাবোধ, চেতনাবোধসহ আরো কী কী যেন জেগে ওঠে। আমরা দলবেঁধে রওনা হই সাধু ভাইকে এই অচলাবস্থা থেকে পরিত্রাণ দিতে। কিন্তু শেষমেশ মাত্র দুজন গিয়ে উপস্থিত হই, বাকিরা ভাবির ভয়ে মাঝপথে পালিয়ে যায়। আমি আর পিয়াল গিয়ে ভাবির মুখোমুখি হই। গলা দিয়ে কোনো কথা বের হয় না। আমাদের অন্তর্যামী ভাবি সব বুঝে নেন। তিনি আমাদের আশ্বস্ত করেন, কিছুদিন পর সাধু ভাইয়ের ওপর থেকে সব বিধি-নিষেধ তুলে নেওয়া হবে। তিনি আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারবেন। আমরা দুজন খুশি হই। একজন এসে আমাদের চা-নাস্তা দিয়ে যায়। আমরা চায়ে চুমুক দিয়ে হাসিমুখে ভাবিকে জিজ্ঞেস করি, ‘সাধু ভাইকে তো দেখছি না। তিনি কি বাসায় নেই?’ ভাবি অবাক হন। তারপর জানালেন যেই লোক এসে চা-নাস্তা দিয়ে গেছে সেই আমাদের সাধু ভাই। শুনে আমাদের গলা শুকিয়ে আসে। বিস্কুট গলে চায়ের মধ্যে পড়ে আর চা ঠাণ্ডা হয়ে হিম সাগরে পরিণত হয়। আমাদের গলা দিয়ে আর কিছু নামে না।

ফিরেই আসব এমন সময়ে ক্লান্ত-শ্রান্ত খোমা নিয়ে সাধু ভাই এলেন। আমাদেরকে গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিতে এলেন। ভাইকে দেখে মনে হল কতদিন না খেয়ে আছে। বললাম, ‘চলেন ভাই। হোটেলে নিয়ে যাই আপনাকে, কিছু খেয়েদেয়ে ফিরে আসলেন নাহয়।’ সাধু ভাই কাঁদো কাঁদো হয়ে জানালেন তার শেষ সীমানা এই গেট পর্যন্তই। এর বাইরে বেরোলে পিঠের ছাল থাকবে না। শুনে আমাদেরই পিঠের ছাল চুলকাতে শুরু করল। পিয়াল পকেট থেকে একটা কার্ড বের করে ভাইয়ের হাতে দিয়ে বলল, ‘ভাই। আমার বিয়া। ভাবিরে নিয়া চলে আইসেন।’ সাধু ভাই ভূত দেখার মতো চেহারা করলেন। থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে পিয়ালকে বললেন, ‘সাবধান। সাধু সাবধান!’ আমি আর পিয়াল একে অন্যের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে ভাইকে বিদায় জানিয়ে চলে এলাম। কিন্তু সারাটা পথ হাজার ভেবেও বুঝতে পারলাম না যে, সাধু ভাই নিজেকে সাবধান করলেন নাকি আমাদের সাবধান করলেন!!   g