g অয়েজুল হক
ভোরের দিকে শীত শীত ভাব। ফালুর বউ রেশমার ভেতর শীত শীত ভাব নেই। চৈত্র মাসের চড়া গরমের মতো মেজাজ, দরাজ গলা। ঘুম থেকে উঠে প্রথম কথা, ‘এখনো লাশের মতো পড়ে আছে। ঘরে পেঁয়াজ নেই, মরিচ নেই।’
ফালু লাশ নয়, জলজ্যান্ত মানুষ। লাফ দিয়ে উঠে চোখ মুছতে মুছতে বলল, ‘তোমার যে মেজাজ, তাতে পেঁয়াজ না খাওয়াই ভালো।’
রেশমা ফালুর কথা শুনে কান্না শুরু করে। এই মহিলার বড় যোগ্যতা রাগ, হাসি, কান্না তিনটি জিনিস প্রায় একসঙ্গে করতে পারে। এসব গুণ সাধরণত পাতি শ্রেণির নেতাদের ভেতর থাকে। এই রাগ তো নিমিষেই পা জড়িয়ে ধরবেন, পা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে খিলখিল করে হাসবেন। রেশমা বেগমকে নেতা নেতা মনে হয়। পাতি নেতা। ফালু সান্ত্বনার সুরে বলে, ‘কাঁদছ কেন?’
রেশমা ফুপিয়ে ফুপিয়ে বলল, ‘কেন কাঁদি জানো না? প্রতিদিন রাস্তায় হাঁকডাক শুনি—করলা, মূলা, টমেটো, লালশাক, ফুলকপি, বাঁধাকপি, সিম, লাউ। শীত এসে গেল একটা কিছু চোখে দেখলাম না।’ হঠাত্ করে গলার স্বর পরিবর্তিত হয়। চোখদুটো লাল হয়ে ওঠে। চিত্কার করে বলল, ‘দশ বছরের সংসার, কী পেলাম? পেঁয়াজ নেই, মরিচ নেই। একটা ডিমভাজি করে খাব তারও উপায় নেই। সংসারের নিকুচি করি।’
রেশমাকে এখন আর নেতা নেতা মনে হচ্ছে না। মনে হয় ভূতে ধরা রুগি। ফালুর আর বসে থাকা ঠিক নয়। সে একটা ব্যাগ হাতে বেরিয়ে পড়ে। বাজারের পাশে চায়ের দোকানে এককাপ চা খেতে ঢোকে। এখানে জহির সাহেব চিত্কার দিচ্ছেন। বিষয় :শীত। শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর গুরুত্ব প্রয়োজনীয়তা বোঝাচ্ছেন। কথার ভেতর ফালু যোগ দেয়, ‘শীত আসবে আসবে করছে এখনো আসছে না।’
ফালুর কথা শেষ না হতেই জহির সাহেব ধমকের সুরে বলেন, ‘এই বেটা, শীত আসবে মানে! শীত কিসে আসবে বল, বাস, ট্রেন, প্লেন না রকেটে?’
হঠাত্ অনাকাঙ্ক্ষিত ধমকে ফালু কেঁপে ওঠে। তার হাতে থাকা চায়ের পেয়ালা ঝনঝন শব্দে নিচে পড়ে। কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, ‘শীত কি এগুলোতে আসে! শীত মানুষ নাকি!’
ফালুর মানুষ শব্দে জহির সাহেবের রাগ আরো বেড়ে যায়। লাল চোখে বলেন, ‘মানুষ আছে কেউ, মানুষ কই?’
‘এই যে আপনি মানুষ, আমি গরু।’
‘তুই গরু, তোর বাকি পা দুটো কোথায়? লেজ কোথায় রেখে এসেছিস?’
জহির সাহেব শান্ত হন না। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে আরো দুজন। তাদের গায়ের ওপর গরম চা ছিটকে পড়ায় তারা প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত। সমানে বলছে, শালা বেকুব কোথাকার। একটা থাপ্পড় দেব। ধেয়ে ধেয়ে আসছে। ফালু দিশেহারার মতো বলে, ‘হ, আপনারা যেটা বলবেন সেগুলোই ঠিক। গেলাম।’
‘গেলাম মানে! সুন্দর করে বল, চললাম।’
জহির সাহেবের হাবভাবে মনে হয় তিনি পা পাড়া দিয়ে ঝগড়া করার মানসিকতা নিয়েই এখানে বসেছেন। যে আসবে তার সঙ্গেই ঝগড়া করবেন। কথা বললেই তার একটা ভুল বের করবেন। কিছু ডিগ্রি থাকায় মানুষকে মানুষ মনে করেন না। আগে ছিলেন কলেজপ্রধান। সবাই স্যার বলত। স্বেচ্ছায় শিক্ষকতা ছেড়ে পদ চেয়ে দলে যোগ দিয়েছেন। পদের জন্য, পদের মোহে দল। এখন কেউ স্যার বলে না নেতা বলে ডাকে। আগে একা একা পথ চলতেন এখন তার চারপাশে বডিগার্ড থাকে। চায়ের দোকানেও বডিগার্ড আছে। তারা ফালুর দিকে লাল চোখে তাকাচ্ছে।
ফালু চা খেতে এসে পড়েছে এক মহাবিপদে। সাগরে কখন ঝড় ওঠে ফালুর মতো সাধারণ অশিক্ষিত মানুষের সেটা জানার কথা নয়। বাঁচার একটাই উপায় এখান থেকে ভোঁ দৌড় দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া। ভাবনার সঙ্গে সঙ্গেই পকেটমারের চুরি করে মরিয়া হয়ে দৌড়ে পালানোর মতো করে পালিয়ে যায় ফালু। বাজারের ভেতর মানুষ কিলবিল করছে। থরে থরে সাজানো শীতের সবজি। একেকটার দাম শুনে একেকবার কেঁপে ওঠে। পাশের একজন বলে, ‘ভাই, আপনার কী মৃগী ব্যারাম আছে?’
ফালু অবাক হয়ে বলে, ‘কই না তো। তবে আমার বউয়ের আছে। রেশমা। ভূতে ধরা ব্যারামও আছে।’
‘বারবার কেঁপে উঠছেন কেন?’
‘দাম শুনে কেঁপে উঠছি। আপনার পকেটে টাকা না থাকলে আপনিও কেঁপে উঠতেন।’
চড়া দামের ব্যাপারে লোকটা ফালুর সঙ্গে একমত হয়। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, ‘লাউ, মূলা, পেঁয়াজ, মরিচ তো না—সব যেন আগুনের দলা। চাকরি না করে যদি নেতা হতে পারতাম!’
জহির সাহেব এখানে থাকলে নিশ্চই বলতেন, এই গাধা বাজার ভরা আগুনের দলা নিয়ে মানুষ বসে আছে? নেতা হবে, ইস নেতা হওয়া যেন মুখের কথা!
বড় একটা দোকান দেখে ফালু দাঁড়ায়। বড় দোকানে দাম কম হতে পারে। দাম শুনে আবার কেঁপে ওঠে ফালু।
দোকানদার হাসি মুখে বলে, ‘ভাই, হুট করে দাম বাড়াতে কী যে উপকার হইছে, বলার না। প্রতিজ্ঞা করেছি, ছেলে হোক আর মেয়ে হোক নামটা পেঁয়াজ রাখব। ছেলে হলে পেঁয়াজ আলী, মেয়ে হলে পেঁয়াজী খাতুন।’
বাইরে শোরগোল শোনা যায়। কৌতূহল নিয়ে ফালু বাজার থেকে বের হয়। অনেক মানুষের জটলা। নেতা জহির সাহেবকে ধরা হয়েছে। হাতে হাতকড়া। লোকজন বলছে, সিন্ডিকেটে জড়িত। সিন্ডিকেট কী! যে কেটই হোক জহির সাহেব বিপদে পড়েছেন সেটা তার চোখমুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে। টেনে হিঁচড়ে তাকে নিয়ে যাওয়া দেখে, ফালু বিড়বিড় করে বলে, ক্ষমতা ভালো তার অপব্যবহার ভালো নয়। এজন্য পদও কখনো বিপদের কারণ হয়। g
