মা-ইলিশ রক্ষার সময় চলছে

আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০১৯, ২১:২০

বাংলায় অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি প্রবাদবাক্য আছে, ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’। এই প্রবাদ বাক্যের দ্বারা স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করা যায়, বাঙালি জাতির সঙ্গে মাছ ও ভাতের সম্পর্ক কতটা অবিচ্ছেদ্য। আমাদের জাতীয় মাছ ইলিশ। বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক ইলিশ। বেশিরভাগ বাঙালির সবচেয়ে প্রিয় একটি মাছ। স্বাদে, গন্ধে ও বর্ণে লোভনীয় এই মাছ। বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন থেকে শুরু করে বিভিন্ন উত্সবে ও অতিথি আপ্যায়নে ইলিশ মাছ যেন অপরিহার্য একটি খাবার। যে মাছের চাহিদা ও জনপ্রিয়তা এত বেশি, সেই মাছের সংরক্ষণ ও পরিচর্যা কতটা জরুরি, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

ইলিশ মাছ অসম্পৃক্ত ফ্যাটি অ্যাসিডের আধার। ইলিশে রয়েছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, যা মানবদেহে কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমিয়ে হূদেরাগের ঝুঁকি কমায়। এছাড়া রয়েছে বিভিন্ন ধরনের অ্যামিনো অ্যাসিড, ভিটামিন ‘এ’ ও ‘ডি’। মানবস্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ ও ঝুঁকিবিহীন পুষ্টির উত্স এই মাছ।

মা-ইলিশ বলতে প্রজননক্ষম পরিপক্ব স্ত্রী ইলিশ মাছকে বোঝায়। ইলিশ (বৈজ্ঞানিক নাম :Tenualosa ilisha) একটি সামুদ্রিক মাছ। ইলিশ আহরণে প্রথম বাংলাদেশ। বিশ্বে আহরিত ইলিশের প্রায় ৭০ শতাংশ আহরণ করা হয় এই দেশে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশের ইলিশ মাছ ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়, যার মাধ্যমে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চিরদিনের জন্য স্থান পেল বাংলার ইলিশ।

মা-ইলিশ নিধন রোধে এবং ইলিশের অবাধ প্রজনন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় আগামী ০৯ অক্টোবর থেকে ২২ দিন, অর্থাত্ ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত (২৪ আশ্বিন থেকে ১৪ কার্তিক) ইলিশ প্রজনন এলাকায় সব ধরনের মাছ ধরা বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে। এ সময় ইলিশের প্রজননক্ষেত্রের চারটি পয়েন্ট দ্বারা পরিবেষ্টিত ৭ হাজার বর্গকিলোমিটার উপকূলীয় এলাকায় সব নদ-নদীতে এই নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে। চারটি পয়েন্ট হলো মীরসরাই ও চট্টগ্রামের মায়ানি; তজুমুদ্দিন ও ভোলার পশ্চিমে সৈয়দ আওলিয়া; কুতুবদিয়া ও কক্সবাজারের উত্তর কুতুবদিয়া এবং পটুয়াখালীর কলাপাড়া ও লতাচাপালী পয়েন্ট। এই সময়ে সারাদেশে ইলিশ মাছের আহরণ, পরিবহন, মজুত, বাজারজাতকরণ ও কেনাবেচা নিষিদ্ধ রয়েছে। নিষেধাজ্ঞার আইন অমান্যকারীকে কমপক্ষে এক বছর থেকে সর্বোচ্চ দুই বছর সশ্রম কারাদণ্ড অথবা ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা যাবে।

বৈচিত্র্যময় জীবন ইলিশের। ইলিশ প্রধানত সামুদ্রিক মাছ হলেও প্রজননকালীন এই মাছ ডিম ছাড়ার জন্য বেছে নেয় স্বাদুপানির উজানকে। এ সময় এরা বাংলাদেশ ও পূর্ব ভারতের নদীতে আগমন করে। বাঙালি কোনো সন্তানসম্ভবা মেয়ের বাবার বাড়িতে যাওয়ার মতো। এই সময়ে বর্ষায় এ দেশের নদীগুলো ‘মা’ ইলিশে ভরে ওঠে। এ সময় ইলিশ দৈনিক প্রায় ৭১ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে পারে। প্রজননের উদ্দেশ্যে ইলিশ প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার উজানে পাড়ি দিতে সক্ষম। সাগর থেকে ইলিশ যত ভেতরের দিকে আসে, ততই শরীর থেকে লবণ কমে যায়। এতে স্বাদ বাড়ে ইলিশের। বাংলাদেশে প্রতি বছর ৯-১০ শতাংশ হারে বাড়ছে ইলিশের উত্পাদন।

আশা করা যাচ্ছে, চলতি বছর ইলিশের উত্পাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে। ভারতের ২০০২ সাল থেকে ২০১৮ সালে ইলিশের জোগান ৫৬ শতাংশে কমেছে, সেখানে বাংলাদেশে ১৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে জাটকা আজ মেঘনা থেকে পদ্মা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র ও সুরমায় বিস্তৃতি লাভ করেছে। গত ৯ বছরের ব্যবধানে ইলিশের উত্পাদন বেড়েছে ৬৬ শতাংশ। সামনের মৌসুমে বেড়ে ৬ লাখ টন ছাড়িয়ে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে, যার বাজারমূল্য ১৮ হাজার কোটি টাকা। ইলিশ দেশের চাহিদা মিটিয়ে এখন বিদেশে রপ্তানি ছাড়াও ইলিশের নুডল্স, স্যুপ ও পাউডার তৈরির প্রযুক্তি আবিষ্কারের ফলে ইতিমধ্যে তা বাজারজাতকরণ শুরু হয়েছে।

বাংলাদেশ মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা ফলাফল বলছে, ১০ বছর আগে দেশের ২১টি উপজেলার নদ-নদীতে ইলিশ পাওয়া যেত। বর্তমানে ১২৫টি উপজেলার আশপাশ দিয়ে প্রবাহিত নদীতে এই মাছ পাওয়া যাচ্ছে। পদ্মার শাখা নদী মহানন্দা থেকে শুরু করে মৌলভীবাজারের হাকালুকি হাওর এবং ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ার মেদির হাওরেও ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে।

ইলিশ শুধু জাতীয় মাছ ও সম্পদ নয়; বহু মানুষের জীবন-জীবিকা ইলিশের ওপর নির্ভর করে। উপকূলীয় মত্স্যজীবী সম্প্রদায়ের প্রায় ৫ লাখ লোক ইলিশ আহরণে সরাসরি জড়িত। এছাড়া ২০ থেকে ২৫ লাখ লোক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ইলিশ পরিবহন, বিক্রয়, জাল ও নৌকা তৈরি, বরফ উত্পাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, রপ্তানি ইত্যাদির সঙ্গে জড়িত। নিষিদ্ধ সময়েই  বর্তমান সরকার নিবন্ধিত জেলেদের ভিজিএফের (ভালনারেবল গ্রুপ ফিডিং) আওতায় পরিবারপ্রতি ২০ কেজি চাল দিয়ে থাকে। পাশাপাশি এই সময়ে জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

জাতীয় পর্যায়ে দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) ১ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি আসে ইলিশ থেকে। মোট মত্স্য উত্পাদনের ১২ শতাংশই হচ্ছে ইলিশ। এই মাছের চাহিদা রয়েছে পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই। প্রতি বছর ইলিশ রপ্তানি করে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা আয় করা সম্ভব হচ্ছে।

বর্তমানে ২০ মে থেকে ৬৫ দিনের জন্য বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করেছে সরকার, যার ফলে সমুদ্রে ইলিশের পাশাপাশি অন্যান্য সামুদ্রিক প্রজাতির  উত্পাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সঠিক তত্ত্বাবধানে মত্স্য অধিদপ্তর, প্রশাসন ও বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কর্তৃক ইলিশ ব্যবস্থাপনা কৌশল মাঠপর্যায়ে সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করায় দেশব্যাপী ইলিশের বিস্তৃতি ও উত্পাদন বেড়েছে। এছাড়া ওয়ার্ল্ড ফিশ এবং বাংলাদেশ মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউট ইলিশ নিয়ে গবেষণা অব্যাহত রেখেছে। সরকারের পদক্ষেপের পাশাপাশি মত্স্যজীবীদের সচেতন হতে হবে এ ব্যাপারে। সরকার, মত্স্যজীবী ও জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলেই গড়ে উঠবে রুপালি ইলিশে ভরপুর বাংলাদেশ।

n লেখক :সহকারী প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা,

মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ তথ্য দপ্তর