আহসান জোবায়ের
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কিছু দুর্গম অঞ্চল রয়েছে, যেখানে আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। বর্তমানে বিজ্ঞানের উত্কর্ষতার যুগে এসেও পৃথিবীর অনেক দেশে আজও বিদ্যালয়ে যাওয়া একেবারেই সহজসাধ্য বা আনন্দের কিছু নয়। সে এক ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের শিশুরা বিদ্যালয়ে যাওয়ার জন্য ব্যবহার করে নৌকা কিংবা নিস্তব্ধতায় মোড়া ভয়ঙ্কর জঙ্গল অথবা পাহাড়ি কোনো সংকীর্ণ পথ। পাহাড়ি কিংবা মহাসাগরীয় দুর্গম অঞ্চলের স্কুলে যাওয়ার পথ এতটা সহজ হয় না। দুর্গম পথ আর নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সেখানকার শিশুরা স্কুলে যাওয়া-আসা করে। গ্রামগুলো প্রত্যন্ত অঞ্চলে হওয়ায় বিদ্যালয়ে যাওয়া শিশুদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। বিদ্যালয়ের দূরত্ব এত বেশি যে, শিশুরা বিদ্যালয়ে যাওয়ার আগ্রহই হারিয়ে ফেলে। বাবা-মায়েরা খুব একটা উত্সাহ পান না তাদের সন্তানকে দুর্গম পথে বিদ্যালয়ে পাঠাতে।
ইউনেস্কোর সমীক্ষা অনুযায়ী, গ্রাম থেকে স্কুলের দূরত্ব দীর্ঘ হওয়ায় এবং প্রতিকূল পরিবেশের কারণে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ২৬.৩ মিলিয়ন এবং বিশ্বের ২৬০ মিলিয়ন শিশু শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। এশিয়া ও পৃথিবীর বিভিন্ন দুর্গম অঞ্চলের শিশুরা শিক্ষার আলোয় আলোকিত হওয়ার জন্য এসব বিপজ্জনক পথ পাড়ি দিয়ে নিয়মিত বিদ্যালয়ে যায়। আর এভাবেই সমস্ত প্রতিকূলতা কাটিয়ে তারা পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন অঞ্চলের শিশুদের বিপদসঙ্কুল বিদ্যালয়ে যাত্রাপথের গল্প দিয়ে সাজানো হয়েছে আজকের এই আয়োজন—
রিয়ো নেগ্রো নদী, কলম্বিয়া
কলম্বিয়ার রিও নদীর তীরে অবস্থিত গ্রামগুলোর মানুষদের যোগযোগের জন্য রিয়ো নেগ্রো নদী থেকে ৪০০ মিটার ওপরে অবস্থিত ৮০০ মিটারের স্টিল ক্যাবলে ঝুলে যাতায়াত করতে হয়। শুধু গ্রামবাসীদেরই নয়, গ্রামের শিশুদেরও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই পথ অতিক্রম করে বিদ্যালয়ের ক্লাসে নিয়মিত অংশগ্রহণ করতে হয়।
এই কেবল সিস্টেমের গতিবেগ ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার। এই কেবল সিস্টেম নদীর দু-পাশেই আছে। তবে এভাবে নদী পার হতে সময় লাগে ১ মিনিট। এর গতিবেগ এত বেশি যে, তা শিশুদের জন্য তা বেশ বিপজ্জনক বটে। তারপরও রিও গ্রামের শিশুরা শিক্ষাগ্রহণের জন্য এভাবেই বিদ্যালয়ে নিয়মিত যাতায়াত করে।
দক্ষিণ চিনের ঝাং ঝিওয়ান গ্রাম
চীনের দক্ষিণে হুনান প্রদেশের পাহাড়ের কোলে ঝাং ঝিওয়ান নামে একটি গ্রাম রয়েছে। গ্রামটির আশেপাশের এলাকার শিশুদের জন্য নেই কোনো বিদ্যালয়। পাহাড় পেরিয়ে দূরবর্তী বিদ্যালয়ে যেতে হয় তাদের। সেই পাহাড় পেরুনোর জন্য শিশুদের বিশেষ কাঠের তৈরি মই ব্যবহার করতে হয়। ৬০ মিটার লম্বা কাঠের তৈরি মইটিতে শিশুদের নেই কোনো সুরক্ষা ব্যবস্থা। যেকোনো সময় পিচ্ছিল এই কাঠের সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থেকেই যায়।
বিপজ্জনক অবস্থায় সারাবছর এভাবেই মই বেয়ে, পাহাড় ডিঙিয়েই বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে হয় এসব শিশুদের। স্থানীয়দের দ্বারা তৈরি সিঁড়িটি ৩-৫ বছর অন্তর অন্তর পরিবর্তন করা হয়। বিদ্যালয়ে যাওয়ার বিকল্প একটি পথ রয়েছে বটে, কিন্তু সেই পথ দিয়ে যেতে সময় লাগে ৪-৫ ঘণ্টা।
ইন্দোনেশিয়ার লিবাক
ইন্দোনেশিয়ার লিবাক অঞ্চলের সাংঘিয়ান তানজুয়াং গ্রামের অধিবাসীদের নদী পারাপারের জন্য ব্যবহার করতে হয় একটি ভাঙা ঝুলন্ত সেতু। সেতুর নিচ দিয়ে বয়ে চলেছে খরস্রোতা চিরাঙ নদী। শুধু গ্রামের অধিবাসীদেরকেই নয়, গ্রামের শিশুরাও এই সেতু ব্যবহার করে থাকে। গ্রামের বিদ্যালয়গামী শিশুরা প্রতিদিন ঠিক সময়ে স্কুলে পৌঁছানোর জন্য এই ভাঙা সেতুই ব্যবহার করে থাকে।
ঝাঙ্কার গ্রাম, ভারত
হিমালয়ের পাদদেশে ভারতের জম্মু ও কাশ্মির রাজ্যের এক মনোরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ঘেরা কার্গিল জেলায় অবস্থিত ঝাঙ্কার গ্রামটি। গ্রামটিতে যোগাযোগ ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। গ্রাম থেকে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করা দুরূহ বলে গ্রামের শিশুদেরকে স্কুলের হোস্টেল থেকে পড়াশোনা করতে হয়। কিন্তু গ্রাম থেকে শিশুদের এই আবাসিক বিদ্যালয়ে যেতে পাড়ি দিতে হয় এক দুর্গম পথ। হিমালয়ের কাছাকাছি হওয়ায় পথটি প্রায় সময় থাকে বরফে ঢাকা। এই বরফে ঢাকা পিচ্ছিল পথ পাড়ি দিয়ে তাদের সেই আবাসিক বিদ্যালয়ে যেতে হয়।
ধায়িং গ্রাম, নেপাল
নেপালের পাহাড়ি অঞ্চলে ধায়িং গ্রাম। ভালো রাস্তা নেই বললেই চলে। পাহাড়ের নিবিড় ছায়ায় গড়ে উঠেছে আরো ছোট ছোট গ্রাম। গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে পাহাড়ি নদী ত্রিশুল। গ্রামের মানুষদের এই নদী পারাপারের জন্য নেই কোনো সেতু। আর এই গ্রামের শিশুদের স্কুলযাত্রা তাই বেশ দুর্গমই বলা চলে। শিশুদের জন্য এটি বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক স্কুুলযাত্রা হিসেবে পরিচিত।
প্রতিদিন স্কুুলে যাওয়ার জন্য এই গ্রামের শিশুদেরকে নদী পারপারের জন্য দড়ি টানা সেতু ব্যবহার করতে হয়। এই সেতু পার হওয়ার জন্য তারা ব্যবহার করে দড়ি, এরপর ৭ পৃষ্ঠায়
