যে বাড়িতে মিশে আছে হাজারো ইতিহাস

আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০১৯, ১৭:০৬

মামুন হায়দার

 

কালের স্রোতে পৃথিবী বদলে গেছে। হারিয়ে গেছে জমিদারি প্রথাও। জমিদার নেই! নেই জমিদারি শাসন ব্যবস্থাও! কিন্তু তাদের বাড়িগুলো আজও রয়ে গেছে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে স্মৃতির মিনার হয়ে থাকা এমনই এক ঐতিহ্যবাহী জমিদার বাড়ি রয়েছে ধনবাড়িতে। যা স্থানীয়দের কাছে নবাব প্যালেস বা নবাব মঞ্জিল নামে বেশ পরিচিত। পর্যটকরা এর নির্মাণশৈলী দেখলে বুঝতে পারবেন কতটা সুসজ্জিত জমিদার বাড়িটি। একটু হলেও বাড়তি সৌন্দর্য খুঁজে পাওয়া যাবে।

 

জমিদার বাড়ির শতবর্ষী পুরোনো দেয়ালগুলো আমাদের ইতিহাস আর কালের সাক্ষী। ক্ষয়ে পড়া চুন-সুরকির আস্তরণগুলোয় লুকিয়ে আছে ঐশ্বর্য্যমণ্ডিত ঐতিহ্য। জমিদারের বিলাসি প্রাসাদের কারুকার্য খচিত ভবনের সমারোহ। ভবনের দেয়ালের প্রতিটি পরতে পরতে সৌন্দর্যের ছোঁয়া। দেয়ালগুলো শুধুই দেয়াল নয়, যেন ইতিহাস রচয়িতার অলঙ্কার খচিত জীবন্ত ইতিহাসের বইয়ের পাতা, যেখান থেকে আমাদের নবীন চোখ পড়ে নিতে পারে হাজার বছরের ইতিহাস। রাজপ্রাসাদের সামনের সুবিস্তৃত বাগানও শুধুই বাগান নয়, শত বছরে হয়তো শত বার ঝরে গেছে গোলাপের পাঁপড়ি, কামিনীর পাতা, তবুও আজ পাতায় পাতায় লেখা রয়ে গেছে রাজা-রানির রোমান্টিকতার কড়চ। পাঁপড়িগুলোয় রাজকুমারীর হাতের স্পর্শ। তাই ভ্রমণপিপাসু ও ইতিহাসপ্রেমীরা ঐতিহ্যের খোঁজে বারবারই ছুটে চলেন জমিদার বাড়িতে।

জমিদার বাড়িটি অবস্থিত টাঙ্গাইল জেলার ধনবাড়ি উপজেলাতে। প্রায় ১৮০০ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি সময়ে এই জমিদার বংশ বা জমিদার বাড়িটি প্রতিষ্ঠা করেন ব্রিটিশদের কাছ থেকে বাহাদুর, নওয়াব, সি আই ই খেতাবপ্রাপ্ত জমিদার খান বাহাদুর সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী। তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্বদ্যািলয়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার প্রথম প্রস্তাবক এবং ব্রিটিশ সরকারের প্রথম মুসলিম মন্ত্রী। তারই অমর কৃর্তি ধনবাড়ি জমিদার বাড়ি বা নওয়াব প্যালেস। এই জমিদার বাড়ির রয়েছে একটি সুদীর্ঘ ইতিহাস। ধারণা করা হয়, মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে ধনপতি সিংহকে পরাজিত করে মোগল সেনাপতি ইস্পিঞ্জর খাঁ ও মনোয়ার খাঁ ধনবাড়িতে জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন। তাদের কয়েক পুরুষ পরের নবাব ছিলেন সৈয়দ জনাব আলী। সৈয়দ জনাব আলী ছিলেন সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরীর বাবা। তিনি তরুণ বয়সে মারা যান।

নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী বিয়ে করেন বগুড়ার নবাব আবদুস সোবহানের মেয়ে আলতাফুন্নাহারকে। আলতাফুন্নাহার ছিলেন নিঃসন্তান। তার মৃত্যুর পর নবাব বিয়ে করেন ঈশা খাঁর শেষ বংশধর সৈয়দা আখতার খাতুনকে। নওয়াব আলী চৌধুরীর তৃতীয় স্ত্রীর নাম ছিল সকিনা খাতুন। নওয়াব আলী চৌধুরী ১৯২৯ সালে মৃত্যুবরণ করেন। নবাব ওয়াকফ নামায় তার তৃতীয় স্ত্রীর একমাত্র ছেলে সৈয়দ হাসান আলী চৌধুরী এবং মেয়ে উম্মে ফাতেমা হুমায়রা খাতুনের নাম উল্লেখ করে যান।

সৈয়দ হাসান আলী চৌধুরী পরবর্তীকালে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের শিল্পমন্ত্রী নির্বাচিত হন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৮ সালেও তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং ১৯৮১ সালে মৃত্যুবরণ করেন। এই জমিদার বাড়ির বর্তমান উত্তরাধিকারী তার একমাত্র সন্তান সৈয়দা আশিকা আকবর।

তারপরও অনেক সময় বয়ে গেছে, পৃথিবী বদলেছে, বদলেছে শাসন ব্যবস্থা। বাংলাদেশেও এখন আর নেই জমিদারি শাসন ব্যবস্থা, ধনবাড়িও তার ব্যতিক্রম নয়। জমিদার নেই, তবে অপূর্ব স্থাপত্যকর্মের কারণে ক্রমেই জমিদার বাড়িটি পরিণত হতে থাকে পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় স্থানে। তাই নবাবের উত্তরাধিকারীরা জমিদার বাড়িতে গড়ে তোলেন পিকনিক স্পট, যা নবাব সৈয়দ হাসান আলী রয়্যাল রিসোর্ট হিসেবে বেশ খ্যাতি লাভ করেছে।

 

কী আছে নবাব প্যালেসে

টাঙ্গাইলের বুক চিড়ে বয়ে যাওয়া বংশাই ও বৈরান নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত এই প্রাচীন জমিদার বাড়িটি অপূর্ব স্থাপত্যশৈলী এবং কারুকার্য সত্যিই মনোরম এবং মনোমুগ্ধকর। তবে রিসোর্ট তৈরির পর নবাব প্যালেসে বেড়েছে চাকচিক্য এবং আধুনিকতা। চার গম্বুজ বিশিষ্ট অপূর্ব মোগল স্থাপত্যরীতিতে তৈরি এই শতাব্দি প্রাচীন নবাব প্যালেস। পুরো নবাব মঞ্জিল বা নবাব প্যালেসটি প্রাচীরে ঘেরা। প্রাসাদটি দক্ষিণমুখি এবং দীর্ঘ বারান্দা সংবলিত। ভবনের পূর্বদিকে বড় একটি তোরণ রয়েছে। তোরণের দুই পাশে প্রহরীদের জন্য রয়েছে দুটি কক্ষ। তোরণটি জমিদার নওয়াব আলী চৌধুরী  ব্রিটিশ গভর্নরকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য নির্মাণ করেন। প্রাচীরঘেরা চত্ত্বর অংশে আবাসিক ভবন দুটি ছাড়া আরো আছে ফুলের বাগান, চিড়িয়াখানা, বৈঠকখানা, নায়েব ঘর, কাচারি ঘর, পাইক-পেয়াদা বসতি এবং দাস-দাসী চত্ত্বর। দর্শনার্থীদের জন্য প্রাসাদের ভেতরের বেশ কয়েকটি কামরা ঘুরে দেখার সুযোগ আছে। তাছাড়া বারান্দাতেও শোভা পাচ্ছে মোগল আমলের নবাবী সামগ্রী, সেগুলো ছুঁয়ে দেখতে পারেন। মোগল আমলের আসবাবপত্র আপনাকে মুগ্ধ করবেই।

প্যালেসটির পাশেই রয়েছে ৩০ বিঘার বিশালাকার দিঘী। দিঘীর গভীরতা খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন। সুন্দর ও মনোরম শান বাঁধানো ঘাট রয়েছে। ইচ্ছে করলে সৌখিন ভ্রমণপ্রেমীরা এখানে নৌকাভ্রমণ ও মাছ ধরতে পারেন। সেখানে দর্শনার্থীদের ঘোরার জন্য রয়েছে দুটি সাম্পান। তাছাড়া নবাবী স্টাইলে পুরো রিসোর্ট ঘুরে দেখার জন্য রয়েছে ঘোড়া ও ঘোড়ার গাড়ির ব্যবস্থা। ইচ্ছে হলে দেখতে পারেন গারোদের সংস্কৃতি ও নাচ। এজন্য আপনাকে আগেই জানিয়ে রাখতে হবে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে। এখানে আরো দেখতে পাবেন ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলা।

রিসোর্ট থেকে ৩০ মিনিটের দূরত্বে ঐতিহ্যবাহী মধুপুর বন। মধুপুর থেকে ৩০ মিনিটের পথ পেরুলেই রয়েছে আদিবাসী গারো পল্লী। সেখানে উপলব্ধি করা যায় গারোদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও জীবনধারা, যা পর্যটকদের মনের খোরাক জোগায়। রয়েছে মনোমুগ্ধকর রাবার বাগান, আনারস বাগান, বাঁশ বাগান, যা অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন। এছাড়া রয়েছে ৭০০ বছরের পুরোনো একটি মসজিদ। মোগল স্থাপত্যের নিদর্শন এই মসজিদের মোজাইক ও মেঝেতে মার্বেল পাথরে নিপুণ কারুকার্য অসাধারণ। মসজিদটির পাশে একটি কক্ষ রয়েছে, যা নবাব বাহাদুর সৈদয় নওয়াব আলী চৌধুরীর মাজার। ১৯২৯ সালে নবাবের মৃত্যুর পর থেকে এখানে ২৪ ঘণ্টা কোরআন তিলাওয়াত করা হচ্ছে, যা এখনো ১ মিনিটের জন্য বন্ধ হয়নি। কোরআন তিলাওয়াতের হাফেজ নিযুক্ত রয়েছেন। তারা প্রতি ২ ঘণ্টা পরপর একেকজন কোরআন তিলাওয়াত করে থাকেন।

 

যেতে চাইলে

 

রাজধানী ঢাকার মহাখালীর টাঙ্গাইল বাসস্ট্যান্ড থেকে ঢাকা-ধনবাড়ি সরাসরি বাস সার্ভিস চালু আছে। বিনিময়, মহানগর কিংবা শুভেচ্ছা পরিবহনে পৌঁছাতে পারবেন ধনবাড়ি। এছাড়া আজমপুর, আবদুলাহপুর ও সায়েদাবাদ থেকেও বিভিন্ন পরিবহনের বাসে চড়ে যাওয়া যাবে। ধনবাড়ি বাসস্ট্যান্ড থেকে অদূরেই জমিদার বাড়ি, ইচ্ছে করলে হেঁটে কিংবা রিকশায় পৌঁছাতে পারেন সেখানে।