অনাথ কিশোরীদের ঠিকানা চাঁদমনি

আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০১৯, ১৭:০৭

নানারঙের মানুষ আছে পৃথিবীতে। কত রকম ইচ্ছে-অভিপ্রায় তাদের। তবে মানবিকতা থাকে কতজনের মাঝে? খুব কম মানুষের মাঝেই এই বোধ কাজ করে! তেমনই এক মানবিকতাপূর্ণ মানুষ ব্যাংকার পিজিরুল আলম দুলাল। নিঃসন্তান এই ব্যক্তি সম্পূর্ণ নিজ উদ্যোগে অনাথ কিশোরীদের জন্য গড়ে তুলেছেন নিরাপদ আশ্রম চাঁদমনি। যেখানে পরম স্নেহে বেড়ে উঠছে ৫০ জন কিশোরী। যাদের বুঝতে দিচ্ছেন না বাবা-মায়ের আভাব। তাদের জন্য ব্যবস্থা করা হয়েছে থাকা-খাওয়াসহ প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষার সুযোগ। প্রতিবছর অনাথ বালিকাদের সংখ্যা বাড়ছে, বাড়ছে ব্যয়ও। চাঁদমনি নিয়েই আমাদের এই প্রতিবেদন—

মো. আমিরুজ্জামান ও তাইজুল ইসলাম তাজু

 

সমাজের অসহায় ও এতিম বালিকাদের অনাথ আশ্রম চাঁদমনি। ওদের কারো মা নেই, কারো বাবা নেই। কারো মা-বাবা কেউই নেই। অনাথ বালিকাদের আশ্রয়স্থল চাঁদমনি। নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার চাওড়াডাঙ্গী বালাপাড়া গ্রামে একজন সাদামনের মানুষ পিজিরুল আলম দুলাল চাঁদমনি নামের এই আশ্রম তুলেছেন। এতে আশ্রয় পাচ্ছে অনাথ শিশু-কিশোরীরা। তাদের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে তার নিরন্তর চেষ্টা চলছে।

দুলাল পৈতৃক জমিতে ১৯৯৯ সালে গড়ে তোলেন চাঁদমনি অনাথ আশ্রমটি। যেখান থেকে এ পর্যন্ত ৬০০ জনের মতো অনাথ লেখাপড়া শেষ করে চাকরি করছেন, কেউবা বিয়ে করে সংসারি হয়েছেন। এর মধ্যে ২ জন মাস্টার্স ও ৬ জন গ্রাজুয়েট ডিগ্রি অর্জন করেন।

চাঁদমনিতে বাস করা প্রায় ৫০ জন অনাথের থাকা-খাওয়া, চিকিত্সা, পোশাক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বেতনসহ আনুসাঙ্গিক কাজে প্রতিমাসে ৭০ হাজার টাকার মতো ব্যয় হচ্ছে। যা পুরোটাই বহন করছেন পিজিরুল আলম, তার আত্মীয়স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষিরা। প্রতিষ্ঠানটি কোনো সরকারি সহযোগিতা গ্রহণ করেনি। প্রতিষ্ঠানটিতে ২ জন পুরুষ শ্রমিক ও ২ জন নারী কর্মী বাবুর্চির কাজ করছেন।

কথা হয় চাঁদমনির প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক পিজিরুল আলমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমার বয়স এখন ৭৫ বছর। আমার মৃত্যুর পরও যেন চাঁদমনি ভালোভাবে চলতে পারে সেজন্য ১১ সদস্য নিয়ে একটি পারিবারিক কমিটি গঠন করা হয়েছে। আমার অবর্তমানে আমার ভাগ্নি অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী কণা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ফাহমিদা টুম্পা এটি দেখভাল করবেন।’

এই সমাজসেবা কাজে আর্থিকভাবে যারা সহযোগিতা করেছেন তাদের কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন পিজিরুল আলম। বিশেষ করে বোন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা মাসুদা বেগম, ভগ্নিপতি অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা আবদুল কাদের ও চাচাতো ভাই ডা. শামীমসহ অনেকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি শর্ত ছাড়াই যেকোনো ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সহযোগিতা গ্রহণ করেন।

চাঁদমনিতে টিনসেডের ১০টি রুমে বসবাস করেন অনাথ বালিকারা। যেখানে রয়েছে শোয়ার ঘর, নামাজ ঘর, রান্না ঘর ও বাথরুম। পায়চারির জন্য পেছনে রয়েছে প্রশস্ত জায়গা। যার বাউন্ডারি ওয়াল খুবই প্রয়োজন। লাইব্রেরি রয়েছে, তবে সেটি সমৃদ্ধ নয়। সামান্য কিছু বই রয়েছে। সংগ্রহ শালায় পুরোনো রেডিও, পালকি, গরুর গাড়ি, ঘানিসহ ১৯৭১ সালের গণহত্যার জলঢাকা কালীগঞ্জ বধ্যভূমির শহীদদের তালিকা রাখা হয়েছে। এ বছর ডিসেম্বরে হস্তশিল্প মেলার আয়োজন নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে চাঁদমনির প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক। লোকজ সংস্কৃতির এই মেলা আগে আয়োজিত হয়েছে ৬ বার।

প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক পিজিরুল আলম জানান, দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে অনাথ বালিকাদের নেওয়া হয়। এজন্য অনাথ বালিকা সম্পর্কে যাচাই-বাছাই করে নিশ্চিত হন তারা। শর্ত থাকে বাল্যবিয়ে দেওয়া যাবে না এবং এইচএসসি পাশ পর্যন্ত থাকতে হবে। এছাড়া সমাজসেবা ও নিঃসন্তানের কারণে এ কাজে আসা বলে জানান তিনি।

চাঁদমনির ঠাঁই পাওয়া একজন জবা। বর্তমানে ৯ম শ্রেণির ছাত্রী। নীলফামারীর ডিমলা থেকে ৯ বছর আগে এখানে আসে। বাবা-মা মারা যাওয়ার পর এতিম হয়ে চাঁদমনিতে আশ্রয় পায়। জবার কথায়, ‘প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালককে আমরা সবাই মামা বলে সম্মোধন করি।’ টেংগনমারীর জাকিয়া আক্তার পড়ছে এইএসসিতে। তার বাবা নেই, মা আছে। মায়া চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ছে। সে ১ বছর আগে এখানে এসেছে। তার মা আছে, কিন্ত বাবা নেই। জলঢাকার বালাগ্রামের আঁখি মনি ৭ম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে। দুই বোনের মধ্যে বড় বোনের বিয়ে হয়েছে। সংসারে বাবা থাকলেও মা নেই তার। তাই এখানে ঠাঁই হয়েছে তার। সকলের জীবনকাহিনিতে আছে নানা ঘটনা।

পিজিরুল আলম দুলাল তার পেনশনের সব টাকা চাঁদমনির কাজেই ব্যয় করেছেন। এছাড়া তার পৈত্রিক ও নিজের প্রায় সবটুকু জমি চাঁদমনি প্রতিষ্ঠানের কাজে দিয়ে দিয়েছেন। সমাজকে আলোকিত করতে অবিরত ছুটছেন পিজিরুল আলম দুলাল। চাঁদমনির বর্তমান বার্ষিক ব্যয় প্রায় ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা। বিদায়বেলায় অনাথ বালিকাদের আতিথেয়তা ও নিষ্পাপ মুখগুলো বারবার মনে করে দিচ্ছিল আমাদেরও সামাজিক দায়বদ্ধতা আছে। সেই সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে ভুপেন হাজারিকার বিখ্যাত সেই গানটি ‘মানুষ মানুষের জন্য একটু সহানূভূতি সে কী পেতে পারে না।’