লেবানন সংকটের নেপথ্যে

আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০১৯, ২১:৫৪

গত ১০ দিনেরও বেশি সময় ধরে লেবাননে সরকারবিরোধী আন্দোলন চলছে। বিক্ষোভ শুরু হয় হোয়াটসঅ্যাপে কলের ওপর কর আরোপের সূত্র ধরে। এর বিরুদ্ধে রাজপথে সাধারণ মানুষ নেমে এলে বেরিয়ে আসে সেখানকার তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের কথা। পাশাপাশি উঠে আসে বৈষম্য ও রন্ধ্রে রন্ধ্রে লেগে থাকা দুর্নীতিও। দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে চরম বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে। একপর্যায়ে সরকার সংকট নিরসনে সংলাপের জন্য বিক্ষোভকারীদের কাছে আহ্বান জানালে তা ফিরিয়ে দেয় তারা। তাদের বক্তব্য, আর আলোচনা নয় এবার তাদের একটাই দাবি সরকার পতন।

ঋণের ভারে জর্জরিত লেবানন। দাতা গোষ্ঠীর কাছ থেকে ঋণ নিয়ে তাদের দেওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী চলতে হচ্ছে দেশটিকে। সে অনুযায়ী নানা অর্থনৈতিক সংস্কারেও হাত দিয়েছে সরকার। কৃচ্ছ্রতাসাধন তথা ব্যয় সংকোচনের নীতিও বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। আবার নতুন আয়ের পথ খুঁজতে করারোপের ক্ষেত্রও খোঁজা হচ্ছে। তেমনই একটি ক্ষেত্র হোয়াটসঅ্যাপ। সেখানে কলের জন্য সরকার করারোপ করেছে। এতে করে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে সাধারণ মানুষ। তাদের বক্তব্য, সরকার তাদের আর্থিক দুর্দশা দূর না করে তাদের ওপর করের বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে। সাধারণ মানুষ বলছে, সরকারের অব্যবস্থাপনা ও অদূরদর্শী নীতির কারণে আজ দেশের এ অবস্থা হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা বলেন, যে ইস্যুটি নিয়ে প্রথমে আমরা রাস্তায় নামি, সেটি আমাদের একমাত্র ইস্যু নয়, আমাদের মূল দাবি এখন অর্থনৈতিক সংস্কার। তবে এটি কোনোভাবেই আমাদের গলায় ছুরি চালিয়ে নয়। আবার এটিও সত্য যে, ওই করারোপ না করলে আমরা সবাই এক ছাতার নিচে আসতে পারতাম না। তাই বলতে হবে সেটি আমাদের ঐক্যবদ্ধ করেছে। তারা বলেন, ব্যয় সংকোচনের নামে সরকার আমাদের অনেক সুবিধা কর্তন করে ফেলছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। সরকারের মধ্যে যে দুর্নীতি বাসা বেঁধে আছে, তা দূর করতে পারলে এ সংকট অনেকটা কমে আসবে।

দেশটিতে এখন ব্যাংকগুলোর অবস্থাও খারাপ। সেখানে চরম আর্থিক সংকট চলছে। লাগাতার বিক্ষোভের কারণে নগদ অর্থের সংকট দেখা দিয়েছে। এতে করে সাধারণ মানুষ বিপাকে পড়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, লেবাননের আর্থিক সংকট এখন মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে গেছে। মার্কিন ডলারের সংকটে পণ্য আমদানিতে প্রভাব পড়েছে। তাই দিন দিন দেশটির অবস্থা খারাপ থেকে অধিকতর খারাপের দিকে যাচ্ছে। এদিকে দেশটিতে বিক্ষোভের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় সরকারও অনেকটা শক্ত অবস্থানে গিয়েছে। এরই মধ্যে তারা বিক্ষোভকারীদের রাজপথ থেকে হটাতে সেনাবাহিনী নামিয়েছে। সেনাবাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সেনাবাহিনী এবং নিরাপত্তা কমান্ডাররা রাজপথের নিরাপত্তায় এখন থেকে কাজ করবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিক্ষোভ পরিস্থিতি সামাল দিতে এটি করা হলেও ভবিষ্যতে এ ধরনের চর্চা কোথায় গিয়ে ঠেকে তা বলা মুশকিল।

সরকারবিরোধী এই বিক্ষোভ এখন যে শুধু লেবাননে তা নয়, এই বিক্ষোভের উত্তাপ এখন দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। একই ধরনের বিক্ষোভ হচ্ছে চিলিতে। মেট্রোর ভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদে সেখানেও ব্যাপক বিক্ষোভ হচ্ছে। সম্প্রতি ১০ লাখ মানুষের বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে চিলি। এটিও এখন সরকারবিরোধী আন্দোলনে মোড় নিয়েছে। এছাড়া বিক্ষোভ হচ্ছে ইরাকে। সেখানেও সরকারবিরোধী বিক্ষোভে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটেছে। নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৭৯ জনে দাঁড়িয়েছে। আরো বিক্ষোভ হচ্ছে হংকং ও বার্সেলোনাতেও। ভৌগোলিক দিক থেকে এসব দেশের অবস্থান অনেক দূরে হলেও একটা বিষয়ে তারা এক জায়গায় পৌঁছাতে পেরেছে, তা হলো দাবি আদায়ে তারা একই পতাকাতলে আসতে সক্ষম হয়েছে। রাজপথকেই তারা বেছে নিয়েছে দাবি আদায়ের পথ হিসেবে।