তুরস্কের সিরিয়া অভিযান : কিছু প্রশ্ন

আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০১৯, ২১:৫৪

সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে কুর্দি অধ্যুষিত এলাকায় তুরস্কের সামরিক অভিযান দীর্ঘদিন ধরে চলা সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আট বছরের কিছু বেশি সময় আগে সিরিয়ায় বাশার আল আসাদ পরিবারের চার দশকের শাসনের বিরুদ্ধে যে অহিংস গণ-আন্দোলন শুরু হয়েছিল তা ক্রমেই আন্তর্জাতিক সংকটের রূপ নেয়। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের কথা এককথায় বলতে গেলে এটি বহু সংখ্যক স্থানীয় গ্রুপ, আইএস গ্রুপ এবং বাইরের কয়েকটি দেশের মধ্যে যুদ্ধ। এখন এক মার্কিন মিত্র এমন একটি গ্রুপের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছে যে গ্রুপটি বছরের পর বছর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছে। লক্ষণীয় যে, আট বছরের যুদ্ধ শেষ হওয়ার লক্ষণ যখন স্পষ্ট হয়ে এসেছিল তখন নতুন করে শুরু হলো এই লড়াই। এর একদিকে এখন তুরস্ক প্রতিপক্ষ কুর্দি মিলিশিয়া গ্রুপগুলো। ফলে সংশ্লিষ্টদের মনে জেগেছে কিছু প্রশ্ন। এসব কৌতুহলের জবাব নিয়ে এই প্রতিবেদন।

 

১. কত কুর্দি আছে সিরিয়ায়

কুর্দিরা সিরিয়ার সবচেয়ে বড়ো সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠী। ২০১১ সালে দেশটির জনসংখ্যা ছিল ২ কোটি ১০ লাখ। ঐ সময় কুর্দিরা ছিল মোট জনসংখ্যার ৫ থেকে ১০ শতাংশের মতো। তাদের বেশির ভাগের বসবাস উত্তরে তুরস্ক সীমান্তের কাছে। আরব ও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর পাশাপাশি তুরস্কেও যথেষ্ট সংখ্যক কুর্দি বসবাস করে। সিরিয়া ও তুরস্ক ছাড়াও ইরান, ইরাক ও জর্দানে কুর্দিরা আছে। তবে কোনো দেশেই তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ নয়।

 

২. সিরীয় কুর্দিরা যেভাবে যুদ্ধে জড়াল

শাসক বাশার আল আসাদের বিরুদ্ধে ২০১১ সালে শুরু হওয়া শান্তিপূর্ণ গণ-আন্দোলন এক বছরের মধ্যেই সশস্ত্র গৃহযুদ্ধের রূপ নেয়। আসাদ সরকার ধীরে ধীরে পুরো দেশের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারায়। একেকটি মিলিশিয়া গোষ্ঠী একেক অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে। এসব মিলিশিয়াদের মধ্যে আছে সরকারপন্থি গ্রুপ, বিদ্রোহী যারা দেশে একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করেছে, রয়েছে কট্টরপন্থি ইসলামি গ্রুপ, আইসিসের মতো চরমপন্থি জঙ্গি গ্রুপ আবার পশ্চিমা ঘেঁষা ধর্মনিরপেক্ষ গ্রুপগুলো। এদের মধ্যে ছিল কুর্দি মিলিশিয়ারাও।

 

৩. যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে যুদ্ধে জড়াল

সিরিয়ায় পুরোদমে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার কয়েক বছর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র এতে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত হয়নি। কেবল কয়েকটি বিদ্রোহী গ্রুপ অর্থ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সহায়তা করেছে। ২০১৪ সালে আইসিস ইরাক ও সিরিয়ায় বিশাল অঞ্চল জুড়ে প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার পর প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রশাসন সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে বাধ্য হয। ঐ বছর যুক্তরাষ্ট্র জঙ্গি বিরোধী আন্তর্জাতিক বহুজাতিক জোটে যোগ দেয়। প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে পড়ে সিরিয়া সংঘাতে।

 

৪. কুর্দিরা যেভাবে মার্কিন মিত্র হলো

আইসিস যখন সিরিয়া আধিপত্যের বিস্তার ঘটাতে শুরু করে তখন তাদের প্রতিরোধ করার জন্য ওয়াইপিজে গ্রুপটির উদ্ভব ঘটে। যুক্তরাষ্ট্র যখন সিরিয়ায় আইসিসের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য জোট মিত্র খুঁজছিল তখন ওয়াইপিজেকে নির্ভরযোগ্য মিত্র হিসেবে পেয়ে যায়। তুরস্কের অবশ্য এই গ্রুপটির বিষয়ে আপত্তি ছিল।

 

৫. সিরীয় কুর্দিরা যেভাবে বিশাল এলাকার নিয়ন্ত্রণ পায়

কুর্দি মিলিশিয়ারা সিরিয়ার উত্তরাঞ্চল থেকে আইসিসকে ধীরে ধীরে হটিয়ে দেয়। তাদের কারণে আইসিস প্রায় ১১ হাজার যোদ্ধা হারায়। স্বাভাবিকভাবে আইএসএসের ফেলে যাওয়া জায়গার নিয়ন্ত্রণ ওয়াইপিজের দখলে চলে আসে। দেখা গেল সিরিয়র মোট ভূখণ্ডের প্রায় চতুর্থাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে ওয়াইপিজে। উত্তরাঞ্চলীয় যে অঞ্চলটি ওয়াইপিজের দখলে আসে সেখানে কুর্দি ছাড়াও আরব ও অন্যান্য বহু জাতিগোষ্ঠী বাস করে।

 

৬. তুরস্ক কেন তাদের সেখান থেকে উত্খাত করতে চায়

ওয়াইপিজে কুর্দি গেরিলা গ্রুপ কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টির (অপর নাম পিকেকে-পার্টিয়া কারকারিন কুর্দিস্তানে) একটি শাখা। পিকেকে দশকের পর দশক ধরে তুরস্কের অভ্যন্তরে সশস্ত্র লড়াই করেছে। তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই পিকেকেকে একটি সন্ত্রাসবাদী সংগঠন গণ্য করে থাকে। কুর্দি নিয়ন্ত্রিত এলাকা যেহেতু সীমান্তের পাশেই তুরস্ক বিষয়টিকে নিরাপত্তার প্রতি হুমকি বিবেচনা করছে। বর্তমান সামরিক অভিযানের মূল কারণ সেখানেই।

 

৭. এই সংকটে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা

ওবামা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে ২০১৬ সালে সিরিয়ারন ডেমোক্র্যাটিক ফোর্স বা এসডিএফের ব্যানারে সিরিয়ার বিদ্রোহীদের জোটটি গঠিত হয়। এই জোটের অন্যতম অংশীদার ছিল কুর্দি যোদ্ধারা। সিরীয় কুর্দিদের সঙ্গে তুরস্কের কুর্দি গেরিলাদের সঙ্গে সিরীয় কুর্দিদের সম্পর্ক নেই, এমন ধারণা প্রতিষ্ঠার জন্য জোটটি গঠন করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র ঐ সময় তুরস্ক সীমান্তের কাছে টহল শুরু করেছিল। ৬ অক্টোবর ট্রাম্প সিরিয়া থেকে অবশিষ্ট এক হাজার সৈন্য দেশে ফিরিয়ে আনার ঘোষণা দেন। এর দুদিন পর কুর্দি বিরোধী সামরিক অভিযান শুরু করে তুরস্ক। উল্লেখ্য, চলতি বছর মার্চে সিরিয়ায় আইসিস সর্বশেষ ঘাঁটির পতনের পর সেখানে মার্কিন সৈন্য উপস্থিতির কার্যকারিতা ফুরিয়ে গিয়েছিল। এখন মার্কিন মিত্র তুরস্ক আরেক মার্কিন মিত্রের (সাবেক) লড়াই করছে। কুর্দিদের কাছে ট্রাম্প এখন বিশ্বাস ঘাতক। তবে বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের তাগিদ থেকে ট্রাম্প এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

 

৮. কেন যুক্তরাষ্ট্র হঠাত্ সিদ্ধান্ত বদলাল

ট্রাম্প বরাবর বলে এসেছেন যুক্তরাষ্ট্রের অবশ্য সিরিয়া থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করা উচিত। কেননা তার দেশ অন্তহীন যুদ্ধে লিপ্ত থাকতে পারে না। গত বছর ডিসেম্বরেই তিনি সিরিয়া ও আফগানিস্তান থেকে সৈন্য ফিরিয়ে                আনার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবে বাদ সেধেছিলেন তার সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী জিম ম্যাটিস। ম্যাটিস বলেছিলেন     ঐ দেশগুলোর পরিস্থিতি এখনো যথেষ্ট নাজুক। সৈন্য ফিরিয়ে নিলে স্থিতিশীলতা বিপন্ন হবে। যাহোক ট্রাম্পের সঙ্গে বিতর্কের জেরে ম্যাটিস চলতি বছর ১ জানুয়ারি পদত্যাগ করেন। ৬ অক্টোবরের সৈন্য প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়ার আগে ট্রাম্প ফোনে এরদোগানের সঙ্গে আলাপ করেছিলেন।

 

৯. সব মার্কিন সৈন্য কী সিরিয়া ছেড়েছে

তুরস্ক-সিরিয়া সীমান্তের কাছ থেকে সব সৈন্য নয় বরং কিছুসংখ্যক মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার করা হয়েছে। কুর্দি নিয়ন্ত্রিত সিরিয়ার অপর অংশে এখনো মার্কিন সৈন্য রয়েছে। তুরস্ক সামরিক অভিযান শুরুর পর ঐ সৈন্যরা অনিরাপদ অবস্থায় পড়েছে। যে কারণে পেন্টাগন এখন সব সৈন্য ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দিয়েছে। ১৪ অক্টোবর ট্রাম্প প্রশাসন তুরস্কের এই পদক্ষেপের জবাবে দেশটির দুটি মন্ত্রণালয় ও কয়েক জন সরকারি কর্মকর্তার ওপর  নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। তবে ট্রাম্প একথাও বলেছেন যে, পিকেকে কোনো কোনো দিক দিয়ে আইসিসের চেয়েও নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার    জন্য তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সকে তুরস্কে পাঠান। শেষ পর্যন্ত এরদোগান শর্ত সাপেক্ষে অভিযান বন্ধ করতে রাজি হন।

 

১০. ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে লাভবান কে

স্পষ্টতই ট্রাম্প এরদোয়ানের অনুকূলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সীমান্তের প্রায় ২০০ বর্গকিলোমিটার জায়গার নিয়ন্ত্রণ এখন তুর্কীবাহিনীর হাতে। তুরস্কের মিত্র সিরিয়ার বিদ্রোহী আরব গ্রুপগুলো এ থেকে কমবেশি লাভবান হবে। তবে আইসিস যে এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে নতুন করে মাথাচাড়া দেওয়ার চেষ্টা করবে না, সে আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কুর্দিদের হাতে প্রায় ১১ হাজার আইসিস সদস্য বা সহযোগী বন্দি আছে। তারা যে কোনো বন্দি দশা থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। সিরিয়া সরকারও এ উপকৃত হবে কারণ প্রতিপক্ষ কুর্দিরা এখন তাদের শরণাপন্ন  হয়েছে। যে কুর্দিরা ছয় বছর আসাদবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়েছে। আসাদের আন্তর্জাতিক মিত্র রাশিয়া ও ইরানও এর ফলে লাভবান হবে। কারণ তাদের জন্য ঐ অঞ্চলে প্রভাববিস্তারের আরো বেশি সুযোগ খুলে গেল। বিশেষ করে তুরস্ক ও কুর্দিদের মধ্যে পাওয়ার ব্রোকার হিসেবে কাজ করতে পারে রাশিয়া।