মার্কিন সেনাদের গুলিতে নয়, তিন সন্তানসহ আত্মঘাতী হয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) প্রধান আবু বকর আল-বাগদাদি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, বাগদাদি তার তিন সন্তানকে নিয়ে একটি বদ্ধ সুড়ঙ্গে লুকানোর চেষ্টা করেন। মার্কিন সেনাদের সঙ্গে থাকা কুকুর তাকে তাড়া করলে উপায় না দেখে আইএস নেতা শরীরে বাঁধা বিস্ফোরক ফাটিয়ে দেন। ট্রাম্প বলেন, বাগদাদি কুকুরের মতো মারা গেছে...কাপুরুষের মতো মারা গেছে। বিশ্বের এক নম্বর সন্ত্রাসী নেতার বিচার সম্পন্ন হয়েছে। খবর বিবিসি ও সিএনএনের
শনিবার থেকেই মার্কিন মিডিয়ায় লেখা হচ্ছিল উত্তর-পশ্চিম সিরিয়ার ইদলিব প্রদেশে মার্কিন বিশেষ বাহিনীর সেনা অভিযানে আইএসের প্রতিষ্ঠাতা এবং শীর্ষ নেতা আবু বকর আল-বাগদাদি মারা গেছেন। শনিবার রাতে ট্রাম্পও এক টুইটে পরোক্ষভাবে এ ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। গতকাল ওয়াশিংটন সময় সকালে হোয়াইট হাউজে এক সংবাদ সম্মেলনে তা নিশ্চিত করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি অভিযানের বিস্তারিত বিবরণ দেন। ট্রাম্প বলেন, আল- বাগদাদি যে বাড়িতে লুকিয়ে ছিলেন রাতের বেলায় মার্কিন স্পেশাল ফোর্স সেখানে অভিযান চালায়। আটটি হেলিকপ্টার অভিযানে অংশ নেয়। প্রচণ্ড গোলাগুলির পর আমেরিকান কমান্ডোরা বাড়িটি ঘিরে ফেলে দরজা দিয়ে না ঢুকে দেওয়াল ভেঙে বাড়ির আঙিনায় প্রবেশ করে। আল-বাগদাদি সেসময় তার তিন সন্তানকে নিয়ে একটি বদ্ধ সুড়ঙ্গে লুকানোর চেষ্টা করেন। মার্কিন সেনাদের সঙ্গে থাকা কুকুর তাকে তাড়া করলে উপায় না দেখে আইএস নেতা শরীরে বাঁধা বিস্ফোরক ফাটিয়ে দেন। বিস্ফোরণে সুড়ঙ্গটি তার শরীরের ওপর ধসে পড়ে।
সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, বিস্ফোরণে আল-বাগদাদির শরীর ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। সঙ্গে থাকা তিনটি শিশুও নিহত হয়েছে। ট্রাম্প বলেন, আইএস নেতার বেশ কজন সহযোগীও নিহত হয়েছেন। ট্রাম্প বলেন, ছিন্নভিন্ন শরীরের ডিএনএ পরীক্ষা করে আল-বাগদাদির পরিচয় নিশ্চিত করা হয়। তিনি বলেন, দুই ঘণ্টা ধরে চলা অভিযানের শুরুতে ১১টি শিশুকে সেখান থেকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়। তারা অক্ষত রয়েছে।
বিবিসিকে একজন প্রত্যক্ষদর্শী
উত্তর-পশ্চিম সিরিয়ায় ইদলিব প্রদেশে বারিশা নামের একটি গ্রামের একজন গ্রামবাসী শনিবার গভীর রাতে চালানো ঐ নাটকীয় সেনা অভিযানের কথা বিবিসিকে বলেছেন। তিনি বলেন, ৩০ মিনিট ধরে হেলিকপ্টার থেকে হামলা চালানো হয়। দুটি বাড়িকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়। অভিযানে একটা বাড়ি গুঁড়িয়ে যায় এবং সেখানে সেনাবাহিনী ঢোকে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও বলেছেন, মার্কিন বাহিনী ঐ অভিযানে ব্যাপক অস্ত্র ব্যবহার করেছে। ২০১১ সালে আইএস নেতাকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করেছিল আমেরিকা। পরে পুরস্কারের অঙ্ক বাড়িয়ে ২৫ মিলিয়ন ডলার করা হয়। ঐ পুরস্কারের লোভেই কেউ বা কারা তার সন্ধান দিয়েছে কি না তা জানা যায়নি। তবে ট্রাম্প তার বক্তব্যে এ অভিযানে নানাভাবে সহায়তা করার জন্য সিরিয়া, তুরস্ক, রাশিয়া এবং কুর্দিদের প্রশংসা করেন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, অভিযানস্থল থেকে তারা স্পর্শকাতর নথিপত্র সংগ্রহ করেছেন যার মধ্যে আইএসের ভবিষ্যত্ পরিকল্পনাও ছিল। কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেসের কমান্ডার মাজলুম আবদি বলেছেন, শনিবার রাতের এ অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে তারাও এতে অংশ নেন। আবু বকর আল-বাগদাদি নিহত হওয়ার খবর এর আগেও অনেকবার পাওয়া যায়, কিন্তু পরে তার সত্যতা পাওয়া যায়নি। বিবিসির সিরিয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞ বলেছেন, অন্তত ৩৫ বার তার নিহত হবার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু পরে দেখা গেছে, সেসব খবর সঠিক ছিল না।
আবু বকর আল-বাগদাদি কে?
আবু বকর আল-বাগদাদির আসল পরিচয় কী তা নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে। আল-বাগদাদি তার আসল নাম নয় বলে মনে করা হয়। নাম আবু বকর আল-বাগদাদি। তবে তার আসল নাম ইব্রাহিম আওয়াদ আল-বদরি। ধারণা করা হয়, ১৯৭১ সালে ইরাকের সামারার কাছে সুন্নি পরিবারে তার জন্ম। অল্প বয়সে গভীরভাবে ধর্মের দিকে ঝুঁকে পড়েন। ১৯৯৬ সালে বাগদাদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামিক স্টাডিজের ওপর ব্যাচেলর ডিগ্রি পান। এরপর কোরআনিক স্টাডিজে মাস্টার ডিগ্রি ও পরে ডক্টরেটও পান। জানা যায়, এই সময়েই বাগদাদ শহরের কাছে একটি মসজিদে শিশুদের কোরআন শিক্ষাও দিতে শুরু করেন তিনি। সেই সঙ্গে চলতে থাকে তার ফুটবল চর্চাও। ক্লাব ফুটবলে রীতিমতো তারকা হয়ে উঠেছিলেন বাগদাদি। ২০০৪ সালে ইঙ্গ-মার্কিন আক্রমণের শিকার হয়ে ক্যাম্প বুকাতে বন্দি হন বাগদাদি। সেখানে তিনি সাবেক ইরাকি গোয়েন্দা কর্মকর্তাসহ অন্য বন্দিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। ২০০৩ সালে যখন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইরাকে সামরিক অভিযান চলে, তখন আল-বাগদাদি বাগদাদের একটি মসজিদের ইমাম ছিলেন বলে দাবি করা হয় কোনো কোনো রিপোর্টে।
