ফেসবুক এমন একটি প্ল্যাটফরম, যেইখানে সকলেই যেন বিশেষজ্ঞ! সকলেই গোয়েন্দা, সকলেই সাংবাদিক—জগতের সকল বিষয়ে বিশেষ জ্ঞান রাখেন! আর এই কারণেই ফেসবুকে এমন কোনো বিষয় নাই, যাহার উপর ভুল তথ্যের শেষ নাই। ধরা যাউক নকল চাউল কিংবা নকল ডিমের কথা। একজন হয়তো জ্ঞানগর্ভ পোস্ট দিলেন—‘কীভাবে চিনবেন নকল ডিম?’ কবে কোথায় আবিষ্কার হইয়াছিল, চীন মিয়ানমার হইয়া কী করিয়া এই কৃত্রিম ডিম বাংলাদেশে ঢুকিতেছে—তাহারও ফিরিস্তি থাকে কখনো। গুজবের নাকি লক্ষ ডানা থাকে, যাহা সাধারণ সত্যের তুলনায় লক্ষগুণ বেগে ধাবিত হইতে পারে। সেই কারণে এই ধরনের আজগুবি পোস্ট হাজার হাজার মানুষ শেয়ার করেন, পৌঁছে যায় লক্ষ লক্ষ মানুষের টাইমলাইনে। তাহার পর ধরা যাক প্লাস্টিক বা কৃত্রিম চাউলের কথা। প্লাস্টিক চাউল কীভাবে গোপনে বাজারে ঢুকিতেছে, তাহার শার্লকহোমস মার্কা পোস্ট প্রদান করিয়া কিছু কিছু মানুষ যেন গুজবের হাটে বেচাকিনা করিতে চাহিতেছেন।
পোলট্রির ডিম কিংবা মাংস লইয়া এই ধরনের ভিত্তিহীন, কাল্পনিক, অবৈজ্ঞানিক তথ্য দিয়া যাহারা সোশ্যাল মিডিয়ায় সংবাদ পরিবেশন করিতেছেন, তাহারা পরোক্ষভাবে ক্ষতি করিতেছেন আমাদের সমৃদ্ধ পোলট্রি শিল্পের। ব্রয়লার মুরগি খাইলে ক্যানসার হইবার আশঙ্কা অমূলক বলিয়া জানাইয়াছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নাল হইতে শুরু করিয়া দেশের পোলট্রি ও পুষ্টিবিজ্ঞানীরা। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গবেষক জানাইয়াছেন দেশের ৯০ শতাংশ ফিড উন্নত ফর্মুলায় এবং আধুনিক ফিড মিলগুলিতে তৈরি হইতেছে। তাই পোলট্রি বা ফিশফিড লইয়া শঙ্কার কোনো কারণ নাই। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত সংবাদ হইতে জানা গিয়াছে, পোলট্রি ফিডের বার্ষিক উত্পাদন ৬০ লক্ষ টন। ফিড মিলে উত্পাদিত হইতেছে প্রায় ৯০ ভাগ। অবশিষ্ট ১০ ভাগের মধ্যে বেশির ভাগই তৈরি হইতেছে হাতে। যদিও ট্যানারি শিল্পের উত্পাদিত বর্জ্য কিছু ক্ষেত্রে পোলট্রি শিল্পের খাদ্য হিসাবে ব্যবহার করা হয় বটে, তবে তাহা মোট চাহিদার মাত্র দেড় শতাংশ। বর্জ্যের বড়ো অংশ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টে ধ্বংস ও বাকিটা নদীতে ফেলা হয়। তবে কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ীর কারণে বর্জ্যের যেই সামান্য অংশ পোলট্রি ও মাছের খাবারে মিশাইতেছে সেইখানে সরকারের নজরদারিও বাড়িতেছে। এখন এই নজরদারি আরো জোরদার করিলে এই অংশটুকুও সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। একই সঙ্গে ওয়ার্ল্ডস পোলট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশে নিরাপদ পোলট্রি উত্পাদনে এখন অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়াছে।
মনে রাখিতে হইবে, বর্তমান পোলট্রি খাতে প্রায় ৩০-৩৫ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ রহিয়াছে। কর্মরত রহিয়াছেন ৬০ লক্ষাধিক মানুষ। বিপিআইসিসির হিসাবমতে, ২০২১ সালের চাহিদা মিটাইতে বত্সরে প্রায় ১ হাজার ৮১৯ কোটি ডিম, ৩৩-৩৫ লক্ষ টন মুরগির মাংস উত্পাদন করিতে হইবে। এই চাহিদা পূরণে বড়ো ধরনের বিনিয়োগের প্রয়োজন। কিন্তু এই শিল্প খাতে নানাবিধ অপপ্রচার এবং অস্থিতিশীল বাজারের কারণে অনেকেই বিনিয়োগের আগ্রহ হারাইয়া ফেলিতেছেন। অথচ ২০২৫-৩০ সালের চাহিদা পূরণ করিতে হইলে বিনিয়োগ প্রায় দ্বিগুণ করিতে হইবে। সুতরাং গুজব প্রতিহত করিয়া মনোযোগ দিতে হইবে নিরাপদ পোলট্রি উত্পাদনে।
