২০১৬ সালে ঢাকার গুলশানে হোলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলায় ২২ জন নিহত হয়েছিলেন এবং এ ঘটনার পর জঙ্গিরাই নিজেদের ইসলামিক স্টেট বা আইএস পরিচয় বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছিল। বাংলাদেশ সরকার বরাবরই কথিত আইএসের উপস্থিতির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে। যদিও বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের হামলার পর আইএসের দাবি প্রকাশ হয়েছে নানা মাধ্যমে।
সংগঠনটি আইসিস নামেও পরিচিত। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকায় পুলিশকে লক্ষ্য করে বিচ্ছিন্ন কয়েকটি হামলার পরেও একই কায়দায় দায় স্বীকার করেছে কথিত আইএস। হোলি আর্টিজানের ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জঙ্গি তত্পরতার বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে এবং এ পর্যন্ত অন্তত ৮০ জন নিহত হয়েছে। এসব অভিযানের মধ্যেই চলতি বছরের শুরুতে খবর পাওয়া যায় যে সিরিয়া ফেরত আইএস সন্দেহভাজন জঙ্গি সদস্যকে গ্রেফতারের পর রিমান্ডে নিয়েছে ঢাকার কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি)।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলেছেন, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এরকম অন্তত ৫০ জন বিভিন্ন দেশ থেকে গিয়ে সিরিয়া আর ইরাকে আইএসের সঙ্গে জড়িত হয়েছিলেন যাদের ‘ফরেন টেররিস্ট ফাইটার’ বলে বর্ণনা করছেন কর্মকর্তারা। হোলি আর্টিজান হামলার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে অভিযুক্ত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান নাগরিক তামিম চৌধুরী সিরিয়া-ইরাকে গিয়েছিলেন বলে জানা যায়। ২০১৪ সালে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এক ব্রিটিশ নাগরিককে গ্রেফতার করে পুলিশ যিনি আইএসের জন্য সদস্য সংগ্রহ করছেন বলে পুলিশ জানিয়েছিল। এমনকি সন্দেহভাজন জঙ্গিদের তালিকাও ঢাকায় ইমিগ্রেশনে দিয়ে ছিল পুলিশ। কিন্তু এখন আইএসের প্রতিষ্ঠাতা এবং শীর্ষ নেতা আবু বকর আল-বাগদাদির মৃত্যুর খবর যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিত করার পর বিশ্লেষকরা মনে করছেন এর প্রভাব পড়বে বাংলাদেশেও। তারা মনে করছেন, বাগদাদির মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এদেশে আইএস ভাবাদর্শে বিশ্বাসীরা ক্রমশ আরো দুর্বল হবে।
ঢাকায় পুলিশের মুখপাত্র মাসুদুর রহমান বলছেন, ‘কোনো সংগঠন নেতৃত্বশূন্য হলে অবশ্যই তারা মনোবল হারায়। গণমাধ্যমে আমরা দেখছি যে, তার মৃত্যু হয়েছে। এটি সত্যি হলে অবশ্যই তাদের তত্পরতা আরো দুর্বল হবে সেটিই স্বাভাবিক। বাগদাদির মৃত্যুর প্রভাব বাংলাদেশে কতটা পড়বে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাংলাদেশে আমরা কখনো সরাসরি আইএস পাইনি। হয়তো অনলাইনে ভাবাদর্শ প্রচার বা এমন ঘটনা হয়েছে। এদের অনেককে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নানা ব্যবস্থার পাশাপাশি আমাদের শক্ত নজরদারিও আছে।’ জঙ্গি বিষয়ক বিশ্লেষক ও আইএসসহ বৈশ্বিক জঙ্গি সংগঠনগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন তাসনিম খলিল। তিনি বলছেন, বাগদাদিকে নিয়ে কথিত আইএস যে মিথ তৈরি করে ছিলা সেই গল্পের কফিনে পেরেক ঠুঁকে দিয়েছে বাগদাদির মৃত্যু। নিজেকে একজন খলিফা হিসেবে দাবি করেছিলেন বাগদাদি যা কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে।
তাসনিম খলিল বলেন, দুটি গ্রুপ বাংলাদেশে সক্রিয়। এর একটি আল-কায়েদা (ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট) এবং আরেকটি জেএমবি যেটি পরে ভারতেও বিস্তৃত হয়েছে। আইএসের পতনে এদের লাভ হবে ও বিস্তার ঘটবে। তবে বৈশ্বিকভাবে আইএসের এখন আর তেমন কোনো অবস্থান নেই এবং এ অবস্থায় বাগদাদির মৃত্যু বাংলাদেশে আইএসপন্থিদের অবস্থান আরো দুর্বল করবে বলে মনে করেন তিনি। আইএস এফিলিয়েটেড সংগঠন বাংলাদেশ ভালো অবস্থানে নেই মন্তব্য করে তাসনিম খলিল বলেন, অনলাইনে হয়তো কেউ কেউ তত্পর।
আল-কায়েদার মতো ক্রম বিলুপ্তি ঘটবে
নিরাপত্তা বিশ্লেষক আব্দুর রব খান বলেন, ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আল-কায়েদার বিলুপ্তি শুরু হয়েছে এবং সংগঠনটি এখন আর তেমন আলোচনায় নেই। আমার ধারণা আইএসের অবস্থাও আল-কায়েদার মতোই হবে। যদিও সিরিয়ায় পিছু হটার পরেও লড়াই করছিল আইএস। কিন্তু এবার বাগদাদির মৃত্যুর পর তারা আরো দুর্বল হয়ে ধীরে ধীরে বিলুপ্তির দিকে যাবে। রব খান বলেন, বাংলাদেশ থেকে যারা সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেটে যোগ দিতে গিয়ে ছিল তাদের কারো অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। অনেকে প্রাণ হারিয়েছে কিংবা পরাজিত হয়ে হতাশ হয়েছে। এখন বাগদাদির মৃত্যুতে তারা আরো হতাশ হবে।
