সেরা বাংলাবিদদের গল্প

আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০১৯, ১৯:০৮

গত ১১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হলো বাংলা ভাষা নিয়ে মেধাভিত্তিক টিভি রিয়ালিটি শো ইস্পাহানী মির্জাপুর বাংলাবিদ-এর তৃতীয় বর্ষের মহোত্সব। এবারের প্রতিযোগিতায় দেশসেরা বাংলাবিদ নির্বাচিত হয়েছেন তিন জন। তাদের সঙ্গে কথা বলে বিস্তারিত জানাচ্ছেন জুনায়েদ হাবীব

নতুন প্রজন্মকে শুদ্ধ বাংলা ভাষার ব্যবহার, বানান চর্চা, উচ্চারণ ও ব্যাকরণের সঠিক প্রয়োগ সম্পর্কে সচেতন করার লক্ষ্যে এমএম ইস্পাহানি মির্জাপুর বাংলাদেশ ২০১৭ সাল থেকে প্রতিবছর ‘বাংলাবিদ’ প্রতিযোগিতা আয়োজন করছে। দেশের ৬৪ জেলা থেকে এ প্রতিযোগিতায় প্রায় ৮৫ হাজারেও অধিক নিবন্ধন হয়। এরপরে বিভিন্ন বিভাগ ভিত্তিক প্রতিযোগিতার বাছাই পর্ব শেষে সেরা ৮০ জন বাংলাবিদদের নিয়ে স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল আইয়ের স্টুডিওতে ধারণ করা হয় বাংলাবিদ-এর মূল পর্বগুলো। সেখান থেকে সেরা ৬ প্রতিযোগীদের নিয়ে ইস্পাহানী মির্জাপুর বাংলাবিদ আয়োজন করে মহোত্সব বা চূড়ান্ত পর্ব। প্রতিবার এই আয়োজনটির বিচারক প্যানেলের গুরু দায়িত্ব পালন করছেন প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক ও কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক,

মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ত্রপা মজুমদার ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ভাষাচিন্তক ডা. সৌমিত্র শেখর। এর উপস্থাপনায় ছিলেন খাইরুল বাশার। ২০১৯ বর্ষের মহোত্সবে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে দেশসেরা নির্বাচিত তিন বাংলাবিদকে পুরস্কার প্রদান করেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। এই তিন বাংলাবিদকে নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজন।

 

‘চিকিত্সা শাস্ত্রে বাংলার ব্যবহার নিশ্চিতকরণে কাজ করতে চাই’

—শাজেদুর রহমান শাহেদ

প্রথম স্থান অর্জনকারী

বগুড়া জেলার শাহজানপুর উপজেলার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের কনিষ্ঠ সন্তান শাজেদুর রহমান শাহেদ। তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা সেখানেই।

বগুড়া ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত এ শিক্ষার্থীর ছোটবেলা থেকেই ছিল বাংলা ভাষার প্রতি আলাদা ঝোঁক। গতবছর চ্যানেল আইয়ের পর্দায় প্রচারিত বাংলাবিদ-এর একটি পর্ব দেখে এতে অংশগ্রহণ করার আগ্রহ জন্মায় তার। সেই থেকে শত চেষ্টায় অসংখ্য পর্ব পেরিয়ে সক্ষম হন বাংলাবিদ-এর সর্বশেষ আসরে জায়গা করে নিতে। দেশসেরা প্রথম বাংলাবিদ হওয়ার স্বপ্ন অবশেষে তিনি পূরণ করতে সক্ষম হন। তিনি প্রথম স্থান অধিকার করে ১০ লক্ষ টাকার পুরস্কার হিসেবে পান। শাহেদের চোখে যেন স্পষ্ট আনন্দের ছোঁয়া। তিনি বললেন, ‘বাংলাবিদ মঞ্চ যে শুধু আমাকে বাংলা চর্চার অনুপম সুযোগ করে দিয়েছে, তা-ই নয়, বরং বৈচিত্র্য ও বর্ণাঢ্য অভিজ্ঞতার মাধ্যমে আলোকিত করেছে আমাদের জীবনকে। বাংলাবিদ-এর একেকটি ধাপ ছিল আমার জন্য অনেক বড় কিছু। একেক করে অসংখ্য পর্ব সম্পন্ন করে পৌঁছাতে পেরেছি জাতীয় পর্বে। অবশেষে ফাইনাল রাউন্ড বাংলাবিদ মহোত্সবে সেরা প্রথম স্থান অধিকার করেছি। বাংলাবিদ-এর এই বৃহত্ আয়োজনটি ছিল আমার জীবনের সুন্দর ও শ্রেষ্ঠতম একটি অধ্যায়। একজন চিকিত্সক হওয়ার স্বপ্ন আমার।’

জীবনের সর্বাবস্থায় নিজের ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কটা অক্ষুণ্ন রাখতে সর্বদা, বিশেষত আগামীতে চিকিত্সা শাস্ত্রে বাংলার ব্যবহার নিশ্চিতকরণে কাজ করে যেতে চান বলেও জানিয়ে দিলেন ১৬ বছর বয়সী এই তরুণ।

‘বাংলা নিয়ে আমার পরিবার ছিল মূল অনুপ্রেরণার উত্স’

—অন্তিকা জান্নাত

দ্বিতীয় স্থান অর্জনকারী

বাবার হাত ধরে প্রতিবছর অমর একুশে বইমেলায় যেতেন ময়মনসিংহ বিদ্যাময়ী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণিপড়ুয়া অন্তিকা জান্নাত। দু বছর আগের ঘটনা, একটি ম্যাগাজিনে গল্প পড়তে গিয়ে চোখ যায় ইস্পাহানী মির্জাপুর বাংলাবিদ-এর নিবন্ধন ফরমের বিজ্ঞাপনের দিকে। সঙ্গে সঙ্গে নিবন্ধন করার কথা তার মাকে জানালে তিনি প্রথমে তার সেই ইচ্ছে নাকচ করে দেন। তবুও দমে থাকেনি অন্তিকার বাংলাবিদ হওয়ার স্বপ্ন। ২০১৮ সালে বাংলাবিদ-এ অংশগ্রহণের ইচ্ছে থাকলেও নিবন্ধন করেননি। তবে সেটা আর হয়নি ২০১৯-এ। করে ফেললেন বাংলাবিদ-এ অংশগ্রহণের জন্য নিবন্ধন। এভাবে বিভাগীয় বাছাই পর্ব থেকে শুরু করে চ্যানেল আইয়ের স্টুডিওতে ধারণ করা বিশেষ এপিসোডগুলো সম্পন্ন করে পৌঁছান বাংলাবিদ মহোত্সবের আসরে।

বাংলাবিদ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে অন্তিকা বলেন, ‘বাংলাবিদ-এ অংশগ্রহণ করে দ্বিতীয় হয়েছি, শুধু এটাই আমার জন্য প্রাপ্তি ছিল না। বাংলাবিদ আমাকে দিয়েছে নানা গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সান্নিধ্য, সঙ্গে পেয়েছি জীবনের অমূল্য উপহার ১৯ জন বন্ধু। এখনো মনে পড়ে রাত জেগে পড়াশোনা আর চা খাওয়ার স্মৃতি। মনে পড়ে সেই চ্যানেল আই স্টুডিওর কথা, যেখানে দিনের পর দিন পরীক্ষা দিয়েছি। কখনো ভুল করে পিছিয়ে পড়া, আবার ঘুরে দাঁড়ানো—সবকিছু মিলিয়ে অনেক অসাধারণ অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ হয়েছি।’ এতদূর আসতে পেরোতে হয়নি কম বাধাও! অন্তিকা আরো বলেন, ‘মাঝেমধ্যে কিছু মানুষ বলত, আমি এসব পারব না। তবুও আত্মবিশ্বাসী ছিলাম যে, আমি চেষ্টা করলে অবশ্যই পারব।’ বাংলাবিদ-এর সিলেকশন রাউন্ড থেকে মহোত্সবের মঞ্চ পর্যন্ত আসার পিছনে যারা ছিলেন, তাদের ‘পরিবার’ হিসেবে উল্লেখ করে অন্তিকা বলেন, ‘তারাই আমার মূল প্রেরণার উত্স।’

 

‘বাংলা নিয়ে জানার আগ্রহের

কমতি ছিল না’

—অয়ন চক্রবর্তী

তৃতীয় স্থান অর্জনকারী

অয়ন চক্রবর্তী, বরিশাল জিলা স্কুলের দশম শ্রেণিতে অধ্যয়ন করছেন বর্তমানে। স্কুল শিক্ষিকা মনিকা রায়ের উত্সাহেই তিনি বাংলাবিদ-এ নিবন্ধন করেছিলেন। ধারণা ছিল হয়তো বিভাগীয় সেরা ৬-এ থাকবেন, কিন্তু তার ধারণাকে মিথ্যে করে পুরো বরিশাল বিভাগকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যান দেশসেরা তৃতীয় বাংলাবিদ-এ। এখনো যেন অয়নের কাছে বাংলাবিদ-এর দেশসেরা তৃতীয় হওয়াটা স্বপ্নের মতো। অয়ন চক্রবর্তী বলেন, ‘বাংলাবিদ-এর ক্যাম্পে থাকা দিনগুলোর কথা সবসময় মনে পড়ে। বিজয়া দশমীর দিনে বাংলাবিদ ক্যাম্পের সবাই মিলে বিভিন্ন পূজামণ্ডপ দেখতে যাওয়া, একসঙ্গে আড্ডা দেওয়া বা দলবেঁধে ক্যান্টিনে খাবার খেতে যাওয়া—এরকম আনন্দঘন মুহূর্তগুলোর কথা স্মৃতিতে অমলিন হয়ে আছে।’ অয়ন চক্রবর্তী একজন বড় সাহিত্যক হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। তিনি বলেন, ‘ছোট থেকেই বিদ্যালয়ের ঘণ্টা শেষে ছুটে যেতাম গ্রন্থাগারে। আমি মনে করি, বাংলাবিদ-এ অর্জন করা এই সাফল্যের পেছনে সেই বই পড়াটাই কারণ হিসেবে কাজ করেছে।’