ম্যারাডোনা-মেসির দেশ আর্জেন্টিনা বেশ কিছুদিন ধরিয়াই অর্থনৈতিকভাবে দুর্দশার মধ্য দিয়া যাইতেছে। চার বত্সর পূর্বে ব্যবসায়বান্ধব সরকারের হাওয়া তুলিয়া প্রেসিডেন্ট হইয়াছিলেন মরিসিও ম্যাক্রি। কিন্তু তিনি দেশের অর্থনীতিকে টানিয়া তোলা দূরে থাকুক বরং অনেকখানি অতলে নামাইয়া দিয়াছেন বলিয়াই মালুম হইয়াছে। ম্যাক্রি দারিদ্র্যকে শূন্যের কোঠায় আনিবার অঙ্গীকার করিয়াছিলেন। কিন্তু ঘটনা ঘটিয়াছে ঠিক বিপরীত। বর্তমানে এক-তৃতীয়াংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করিতেছে দেশটিতে। আর্জেন্টিনা মাত্র গত বত্সরেই আইএমএফের নিকট হইতে ৫৭ বিলিয়ন ডলার ধার করিয়াছেন। অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করিয়া আবর্তিত এইবারের নির্বাচনে ম্যাক্রি এইসব নেতিবাচক পরিস্থিতির ফল পাইয়াছেন সরাসরি। রবিবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী আলবার্তো ফার্নান্ডেজের নিকট বিপুল ভোটে পরাজিত হইয়াছেন। ফার্নান্ডেজ ও ম্যাক্রি যথাক্রমে ৪৮ শতাংশের অধিক ও ৪১ শতাংশের কম ভোট পাইয়াছেন।
আইএমএফ হইতে ম্যাক্রি যেই ঋণ করিয়াছেন তাহার কিস্তি মান্য করিবার অঙ্গীকার করিয়াছেন ফার্নান্ডেজ। কিন্তু ইহা কেমন করিয়া সম্ভব হইবে তাহা ভাবিয়া পাইতেছেন না বিশেষজ্ঞরা। আর্জেন্টিনা যে কেবল দারিদ্র আর ঋণে জর্জরিত তাহা নহে। দেশটিতে বর্তমানে মুদ্রাস্ফীতির হার ৫৬ শতাংশ। ইহা ব্যতীত শ্রমিকদের পক্ষ হইতে বেতন এবং পেনশনভোগীদের পক্ষ হইতে ভাতা বাড়াইবার জোর দাবিও বলবত্ আছে। তবে মধ্যপন্থি ফার্নান্ডেজের উপরে যে দেশবাসী বেশ আস্থা রাখিতেছে তাহা ভোটের দিন সন্ধ্যাতেই প্রমাণিত হইয়াছে। তাহার জয়লাভ স্পষ্ট হইয়া উঠিতেই রাজধানী বুয়েনস আয়ারসহ দেশ জুড়িয়া বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষকে রাস্তায় নামিয়া উল্লাস প্রকাশ করিতে দেখা দিয়াছে। প্রেসিডেন্ট পদে ফার্নান্ডেজের নির্বাচিত হইবার দিনে ক্রিস্টিনা ফার্নান্ডেজের ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে জয়লাভও সাধারণ ভোটারদের সবিশেষ খুশির কারণ হইয়াছে। উল্লেখ্য, এইবার ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে লড়িলেও, ইতিপূর্বে ২০০৩ হইতে ২০০৭ সাল পর্যন্ত দেশটির প্রেসিডেন্ট পদ অলংকৃত করিয়াছিলেন। প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন আর্জেন্টিনাকে ২০০১-২০০২ সালের বৈদেশিক ঋণের ফাঁদ হইতে মুক্ত করিবার ক্ষেত্রে তাঁহার প্রশাসন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখিয়াছিল। দুই ফার্নান্ডেজের মিলিত প্রয়াসে এইবার আর্জেন্টিনার ভাগ্য ফিরিবে বলিয়া উভয় পক্ষের সমর্থকেরা মনে করিতেছেন।
ভোটের ফলাফল যাহাই হউক না কেন, আর্জেন্টিনার এইবারের নির্বাচনটি সঠিক ইস্যুর ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হইবার কারণে পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হইয়াছে। সুনির্দিষ্টভাবে বলিতে গেলে বর্তমানে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি যেহেতু টালমাটাল সেহেতু এই ইস্যুটিই কেন্দ্রে আসা উচিত ছিল। হইয়াছেও তাই। সাম্প্রতিক সময়ের এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের অনেক দেশের নির্বাচনে ধর্ম, জাতি-পরিচয়, অভিবাসীর বৈধতা-অবৈধতার মতো প্রসঙ্গ আসিয়া রাজনীতির আকাশ ছাইয়া ফেলে। লোকে মূল কারণ না খুঁজিয়া এই ধরনের ইস্যুতে আবেগপ্রবণ হইয়া ভোট প্রদান করিয়া অগণতন্ত্রমনা প্রার্থীকেও ক্ষমতায় বসাইবার নির্বুদ্ধিতা করে। আর্জেন্টিনা এইসব অযথা-ইস্যুর বাহিরে থাকিয়াছে। আর্জেন্টিনার ভোটাররা এই কারণে অভিনন্দন পাইবার যোগ্য।
