‘অমানিশা’ বর্তমান যান্ত্রিক সভ্যতার পটচিত্র

আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০১৯, ১৭:৫৮

মা হ বু ব  আ ল ম

 

বর্তমান প্রেক্ষাপট আসলে কেমন? কিভাবে এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের বর্তমান বিশ্ব? বর্তমান বিশ্ব কি মানবিক নাকি যান্ত্রিক? যান্ত্রিকতা যেভাবে মানুষের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে সেখান থেকে মুক্ত হওয়াটাই মনে হয় বর্তমান সভ্য মানুষদের জন্য একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ। এই যান্ত্রিকতা থেকে মুক্তি পেতে চাইলে আসলে আমাদের কোন দিকে ধাবিত হওয়া উচিত। কোন ধরনের উদ্যোগ মানুষকে শুভ লক্ষ্যে ধাবিত করতে পারে, সেটা নির্দিষ্ট করা বেশ শক্ত কাজ। আসলে একজন নাট্যকার, কবি বা সাহিত্যিককেই যুগে যুগে সেই দায়িত্ব নিতে হয়েছে। তাদেরকে দায়িত্ব নিতে হয়েছে মানুষকে সঠিক পথ দেখিয়ে দেওয়ার। ‘অমানিশা’ নাটকও তেমনি এক প্রেক্ষাপট নিয়ে রচিত হয়েছে। নাটকটি রচনা করেছেন বাংলাদেশের নাট্যকার রুবাইয়াত্ আহমেদ, আর নির্দেশনা দিয়েছেন ভারতের শুভজিত্ ব্যানার্জী। নাটকটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিমূর্ত নাটক ‘রক্তকরবী’ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে রচিত এবং বলা বাহুল্য, অনেকাংশে সেই আদলেই নির্মিত। প্রত্যেকেই রাজাকে সেখানে যেভাবে জালের আড়ালে লুকিয়ে রাখেন, এখানেও রাজাকে জালের আড়ালেই আবিষ্কার করেন দর্শক। ‘রক্তকরবী’র সঙ্গে ‘অমানিশা’কে একসূত্রে যেভাবে গাঁথা হয়েছে, সেই দিকটি অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। তবে নাট্যকার রুবাইয়াত্ আহমেদ নাটকের প্রায় শেষ অংশে কবির বক্তব্যে যেভাবে দর্শককে নীতি কথা শোনালেন, সেটা অনেকটা স্কুলে বা কলেজে বসে শিক্ষকের নীতি বাক্য কপচানোর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, লারনার্স এডুকেশনাল সোসাইটি সবাইকে শুদ্ধ করার দায়িত্ব নিয়েছেন। তখন ফ্রান্সিস বেকনের অব স্ট্যাডিজ থেকে একটি লাইন মনে পড়ছিল ‘Some books are to be tasted, others to be swallowed, and some few to be chewed and digested.’

মনে হচ্ছিল, ‘অমানিশা’ বোধহয় এভাবেই চিবিয়ে গলাধঃকরণ করতে হবে। কিন্তু খানিকবাদেই সেই ছাত্রাবস্থা থেকে রেহাই পাওয়া গেছে। কিন্তু নাটকজুড়ে তার একটি ছায়া মাথার উপরে ঘুরপাক খাচ্ছিলই বটে—তা নাটক ও নাট্য দুটোতেই। আমরা নাটককে যেহেতু ইংরেজিতে play বলছি, সেহেতু তার মধ্যে একটু-আধটু খেলা খেলা ভাব না থাকলে বোধহয় খুব একটা জমে ওঠে না। তবে রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’র সঙ্গে ‘অমানিশা’কে এক সুতায় গাথা একেবারেই যে সহজ কাজ ছিল না তাও বলার অপেক্ষা রাখে না। সেই কঠিন কাজটি নির্দেশক শুভজিত্ ব্যানার্জী বেশ ভালোভাবেই করেছেন এবং সহজ করে তুলবার চেষ্টা করেছেন আর পেরেছেনও বলা যায়। বর্তমান যুব সমাজ যেভাবে যান্ত্রিক দিকে ধাবিত হচ্ছে, তা যে কতটা ভয়ংকর রূপ ধারণ করতে পারে, তা নির্দেশ করে ‘অমানিশা’। সেক্ষেত্রে ‘অমানিশা’ বর্তমান যান্ত্রিক সভ্যতার পটচিত্র। নাট্যকার ও নির্দেশক মিলে দর্শককে একটি শুভ দিক বাতলে দিয়েছেন, এটাই বা কম কী! নির্দেশকের মঞ্চ ব্যবহার বেশ ভালো লেগেছে। পুরো মঞ্চ বা পুরো অডিটোরিয়াম তিনি বেশ যুক্তিযুক্ত ভাবেই ব্যবহার করেছেন। তার নির্দেশনায় নন্দিনী চরিত্রে সোনারেখা নাথ এবং ঋতুরেখা নাথ বেশ ভালো অভিনয় করেছেন। তবে ‘রক্তকরবী’র নন্দিনীর চেয়ে ‘অমানিশা’র নন্দিনী অনেক স্বাচ্ছন্দ্য ও সাবলীল ছিলেন বলে মনে হয়েছে। কবি চরিত্রে অমিতাভ নাথ পার্থকে আরো খানিকটা প্রাণবন্ত দেখলে ভালো লাগত। কেননা যে মানুষটি সমাজকে বদলে দিচ্ছে, তার কণ্ঠে যদি জোর না থাকে, তাহলে অন্য সবকিছুও শক্তিহীন মনে হয়। আবার নাটকের গতির সঙ্গে সামঞ্জস্যতাও হারিয়ে ফেলে। এছাড়াও পার্দ্রী চরিত্রে স্বরূপ ঘোষ সান, ডাক্তার চরিত্রে সন্তোষ ভট্টাচার্য, প্রকাশক চরিত্রে রত্নদ্বীপ চক্রবর্তী, কিশোর চরিত্রে সুজয় দেবরয় এবং রাজা চরিত্রে মনিদ্বীপ দাস সুমন অভিনয় করেছেন। রাজাকে নির্দেশক দুটি ভিন্ন মাত্রায় উপস্থাপন করাতে অভিনয়ের ক্ষেত্রেও একটি ভিন্ন মাত্রাও যোগ হচ্ছিল।  নাট্যকার রুবাইয়াত্ আহমেদের ‘অমানিশা’কে প্রাণবন্ত করে তুলতে নির্দেশক শুভজিত্ ব্যানার্জীকে আলোতে সহযোগিতা করেছেন সৌমিক কান্তি নাথ, পোশাক ও পরিকল্পনায় মঞ্জিরা দে। তবে ‘অমানিশা’তে নির্দেশককে যে কাজটি সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করেছে, তা হলো দ্রব্যসামগ্রী ও পোশাক। মঞ্জিরা দে তার দায়িত্ব বেশ নান্দনিকভাবেই ফুটিয়ে তুলেছেন পুরো নাটকে। বেশ সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল তার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন। সর্বোপরি, মহাকাল নাট্য সম্প্রদায় আয়োজিত নাট্যোত্সবে লারনার্স এডুকেশনাল সোসাইটির প্রযোজনা অমানিশা বাংলাদেশের মানুষ অনেক দিন মনে রাখবে তাদের উপস্থাপন ও অভিনয়ের জন্য হলেও।

ছবি কামাল উদ্দিন কবির