মো. আমিরুজ্জামান
সৈয়দপুর (নীলফামারী) সংবাদদাতা
‘রসগোল্লা’ নামটি শুনলেই যে কারো জিভে জল চলে আসে। বর্তমান দ্রব্যমূল্যের বাজারে যেখানে ৫ টাকা দিয়ে একটি চকলেট বা এককাপ চা পাওয়া যায় না সেখানে একই দামে রসগোল্লা খাওয়াচ্ছেন বৃদ্ধ কান্তিপদ রায়। তিনি বাড়িতে রসগোল্লা তৈরি করে সাইকেলে করে গত প্রায় ৬ যুগ ধরে মাইলের পর মাইল পাড়ি দিয়ে বিক্রি করছেন এই রসগোল্লা।
প্রায় দেড় ইঞ্চি বৃত্ত সাইজের রসগোল্লাটি রসে মাখানো। অত্যন্ত সু-স্বাদু। যারা কান্তির রসগোল্লা খেয়েছেন তারা বারবার তাকে খোঁজেন। সৈয়দপুর শহর পার্শ্ববর্তী পার্বতীপুর ও তারাগঞ্জ উপজেলার ছেলে-বুড়ো, শিশু-কিশোর সবাই রসগোল্লা বিক্রেতা কান্তিপদকে কান্তি দা বলে ডাকেন। অতি পরিচিত এ ব্যক্তি তার রসগোল্লা ফেরি করে বিক্রি করা ছাড়াও অনেক অনুষ্ঠানে অর্ডার নিয়ে থাকেন।
সৈয়দপুর শহরের বাঁশকাড়ির কিশোরী সালমা, মুন্সিপাড়ার অলিমা খাতুন, নতুন বাবুপাড়ার জয়গুন নেছা ও কয়ানিজপাড়ার পারুল বেগম জানান, কান্তিপদের রসগোল্লা তাদের বাসায় সবসময় থাকে। আত্মীয়স্বজন এলে অল্প ব্যয়ে মেহমানদারী হয়। এছাড়া বাচ্চারাও পছন্দ করে তাই কেনা চাই রসগোল্লা। তারা জানান, কান্তি দা’র রসগোল্লা বেশ সুস্বাদু, দামেও কম।
সৈয়দপুর উপজেলার বাঙালিপুর ইউনিয়নের লক্ষ্মণপুর বালাপাড়া গ্রামের শিবকান্ত রায়ের ছেলে কান্তিপদ রায়। তার দুই মেয়ে এক ছেলে। ছেলেটি বিয়ের পর ব্রেন টিউমার আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। ফলে ছেলের বউ, নাতি-নাতনিকে দেখাশোনা ও ভরণ-পোষণের দায়িত্ব পড়ে তার ওপর।
রসগোল্লা বিক্রেতা কান্দিপদের স্ত্রী সুশিলা রানী বলেন, আমার শ্বশুরের আমল থেকে আমরা রসগোল্লা বিক্রি করি। প্রতিদিন কয়েক মন মিষ্টি তৈরি করতাম। ছেলে মারা যাওয়ার পর আর্থিক অনটন ও নানা সমস্যায় জর্জরিত। আমি পাড়ায় পাড়ায় গাভীর দুধ সংগ্রহ করি। আর রসগোল্লা তৈরিতে পরিবারের সকলে শ্রম দেওয়ায় ব্যয় হয় কম। তাই সামান্য দরে বিক্রি করলেও আমাদের লোকসান হয় না। এর আয় দিয়ে সবার ভরণ-পোষণ চলে।
বৃদ্ধ কান্তিপদ রায় বলেন, সকাল ১০টায় বাইসাইকেলে করে শহরের বিভিন্ন মহল্লার অলি-গলি, সড়ক ও দোকানে এ রসগোল্লা ফেরি করে বিক্রি করি। অনেকে পাইকারি নেয়। এভাবে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিক্রি করে বাসায় ফিরি। এতে প্রতিদিন ৪ থেকে ৫শ’ টাকা লাভ হয়। তবে সহজ শর্তে ঋণ পেলে এ ব্যবসার পরিধি আরো বাড়তো বলে মনে করেন এ মিষ্টির কারিগর ও বিক্রেতা।
তিনি আরো বলেন, পৈতৃক সূত্রে পাওয়া এ ব্যবসার শুরুতে রসগোল্লার দাম অনেক কম ছিল। তখন ৩ টাকায় বিক্রি করেছি। বর্তমানে দুধ, উপকরণ ও জ্বালানির দাম বাড়ায় মিষ্টির দামও বেড়েছে। তবে বিগত ২৫ বছর ধরে ৫ টাকায় মিষ্টি বিক্রি করছি। এ দর আর বাড়াইনি। প্রথমে আকারে বড় ছিল। এখন আকারে সামান্য ছোট করেছি। তবে চাহিদা কমেনি। যতদিন বাঁচবেন মিষ্টি বিক্রির ব্যবসা করবেন বলে জানান তিনি।
শহরের দোকানগুলোতে রসগোল্লা ২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। তার ওপর কৃত্রিম রঙ ও বিষাক্ত কেমিক্যাল হাইড্রোসের ব্যবহার দেখা যায়। এছাড়া মিষ্টি তৈরির ঘর নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর। দীর্ঘদিন পড়ে থাকা রসগোল্লা ও তার উপকরণ বারবার মিশিয়ে চালানো হয়। আস্থা হারিয়ে তাই কান্তিপদ রায়ের সস্তার রসগোল্লাই গ্রহণ করছেন ক্রেতারা। ফলে প্রতিদিন বাড়ছে তার ক্রেতা ও আয়ের পরিধি।
