জল ভয়ঙ্করের দেশ!

আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৭:৫৩

তাহমিদ আহমেদ

পেশা হিসেবে ডাকাতি তাদের কাছে কম রোমাঞ্চকর নয়। শিংয়ের মতো বাঁকা সোমালিয়া দেশটি আরব সাগর ও লোহিত সাগরের পাশে অবস্থিত। এই শিংয়ের মতো হওয়ায় দেশটি হর্ণ অব আফ্রিকা নামেও পরিচিত। দেশটিতে প্রায় ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ঘরোয়া অনেক ঝামেলা চলে। ১৯৬০ সালে দেশটি স্বাধীনতা লাভ করলেও নিজেদের তেমনভাবে মেলে ধরতে পারেনি। নব্বইয়ের দশকে দেশটিতে মোহাম্মদ সাঈদ বারী সরকারের পতনের পর শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। সেসময়ই সোমালিয়া রাষ্ট্রটি অচল হয়ে পড়ে। ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হতে যাওয়া সোমালিয়ায় অনেক অভাব চলতে থাকে। এর ফলে পরবর্তী দশকে এখানে জলদস্যু বেড়ে যায়।

১৬৫০ থেকে ১৭৫০ সাল পর্যন্ত ছিল জলদস্যুদের স্বর্ণযুগ। সেসময় প্রায় সমগ্র বিশ্বই ছিল ব্রিটিশদের অধীনে। ব্রিটিশ শাসকরা তখন নিজেদের বাণিজ্যের জন্য ব্যবহার করতো সমুদ্রপথ। সমুদ্র পথে তারা বিভিন্ন অভিযানও চালাতো। তাদের জাহাজে থাকা শ্রমিকরা অযথাই অনেক পরিশ্রম করতো। তাদের নিজস্ব কোনো অধিকার ছিল না। তাদের ওপর অন্যায় অত্যাচার করা চলতো। কাজে সামান্য ভুল হলে তাদের সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হতো। এ রকম অত্যাচারের প্রতিবাদ করতে অনেক নাবিক জলদস্যুতে পরিণত হয়। সোমালিয়ার জলদস্যুরাও প্রতিবাদ করতে গিয়েই ভয়ঙ্কর এই পেশায় জড়িয়ে পড়ে। ৯০-এর দশকে যখন দেশটির সরকার পতন হয় তখন তাদের সমুদ্র উপকূলে বিভিন্ন ইউরোপিয় জাহাজ ঘুরতো এবং তাদের গতিবিধির কোনো সঠিক ঠিকানা ছিল না।

জাহাজগুলো থেকে অনেক ব্যারেল তীরে আসতো। সেই ব্যারেলগুলোতে থাকতো অনেক তেজস্ক্রিয় পদার্থ। তেজস্ক্রিয়তায় অনেক পশুপাখি মারা যায়। মানুষ অনেক রোগে আক্রান্ত হতে থাকে। গর্ভবতী নারীরা বিকলাঙ্গ বাচ্চা প্রসব করে। বিভিন্ন হাসপাতালের বর্জ্য ও রাসায়নিক বর্জ্যে ভরা থাকতো এই ব্যারেলগুলো। এক সময় এই দেশটির উপকূল এসব ব্যারেলে ভরে যায়। এই দেশটিকে বর্জ্য ফেলার স্তুপে পরিণত করে ইউরোপের দেশগুলো। ব্যারেলে থাকা বিভিন্ন ধাতু মানুষের অনেক ক্ষতি করে। তেজস্ক্রিয়তায় তাদের জীবন হয়ে পড়ে প্রায় অচল।

সোমালিয়ার মানুষদের সামুদ্রিক মাছের ভাণ্ডারও প্রায় ফুরিয়ে গিয়েছিল। এর কারণ ইউরোপের অনেক জাহাজ এসে এখান থেকে বড় বড় মাছ ধরে নিয়ে চলে যেত। এই এলাকার জেলেরা মাছ পেত না। তাই জেলেরা তাদের স্পিডবোড নিয়ে এসব মাছ ধরা জাহাজ তাড়িয়ে দেওয়ার কথা ভাবে। তারা ব্যারেলের বিরুদ্ধেও সোচ্চার হয়। জাহাজগুলো এই মাছ বে-আইনিভাবে ধরতো। কারণ এই উপকূলে মাছ ধরার কোনো এখতিয়ারই তাদের ছিল না। তাদের ওপর ট্যাক্স আরোপ করার কথাও চিন্তা করা হয়। কিন্তু কিছুতেই এসবের সঙ্গে মোকাবিলা করা সম্ভব হচ্ছিল না। তাই একবার ব্যারেল ফেলা অবস্থায় কয়েকটা জাহাজ আটকানো হয়। এভাবেই তাদের এই পেশা শুরু হয়। পরবর্তীতে তারা জাহাজ আটক করা শুরু করে এবং জাহাজের নাবিকদের আটকে তাদের থেকে মুক্তিপণ আদায় করা শুরু করে।

জলদস্যুরা নিজেদের একটা বড় দল তৈরি করার কথা ভাবে। এজন্য স্থানীয় জেলে ও এক সময়ের সেনাবাহিনীর সদস্যরা মিলে আলাদা জলদস্যুদের দল বানিয়ে ফেলে। সমুদ্র নিয়ে তাদের ভালো জ্ঞান থাকায় তারা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে থাকে। আন্তর্জাতিক সমুদ্র পথে চলা জাহাজের হুমকি হয়ে ওঠে এরা। তবে এখানকার বেশিরভাগ মানুষই এই জলদস্যুদের ভালো মনে করে। এর কারণ সমুদ্র প্রতিরক্ষার এটিই সবচেয়ে সেরা উপায় তাদের কাছে। জলদস্যুরাও নিজেদের নিয়ে অনেক গর্ববোধ করে। তাদের মতে, অন্যায়ের প্রতিবাদেই আজ তারা এই রাস্তা বেছে নিয়েছে। ২০০৭ সালের পর জলদস্যুর হার আগের চেয়ে দ্বিগুণ হয়ে যায়। এখন আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের জন্য এখন কিছুটা কমেছে। সোমালিয়ার এই জলদস্যুরা সামান্য মাছ ধরার নৌকা করেও বড় বড় জাহাজ ছিনতাই করে থাকে।