অণুগল্প

মুখোমুখি মরিতে

আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৭:৫৫

 

হঠাত্ গর্জন : হল্ট্।

থমকে দাঁড়াবে কি ওরা? দাঁড়াতে এসেছে কি?

পাঁচজনের দল। পাঁচ মুক্তিযোদ্ধা। ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিন মমতাজ। তিনিই নেতা এ অভিযানের। সাথে লেফটেন্যান্ট মান্নান। সুবেদার আবদুল হাই। ল্যান্সনায়েক আবুল হাশেম। ল্যান্সনায়েক ইউসুফ। তাঁরা শত্রু এলাকা কামালপুরের পেটের ভেতর।

ঘুটঘুট্টি রাত। চারপাশের কিছুই দেখা যায় না। চুপিচুপি এসেছিল দলটি। শত্রু ঘাঁটি রেকি করতে। এরপরও টের পেয়ে গেল দুশমন। পাঁচজনের পায়ের খসখস আওয়াজে সম্ভবত।

এর কদিন আগে বিকেলে এই ঘাঁটি রেকি করতে এসেছিল মুক্তিযোদ্ধাদের আরো একটি দল। হাফিজ উদ্দিনের নেতৃত্বে। তারা নিয়েছিল কৃষকের ছদ্ম আবরণ, মালকোচ মেরে লুঙ্গি পরা। উদোম গা। মাথায় গামছা বাঁধা। হাতে ধান কাটার কাস্তে। ওদিকে আবার কোমরে লুকোনো পিস্তল। গুটিগুটি পায়ে তারা এগিয়ে যাচ্ছিল ঘাঁটির দিকে। ঘাঁটির চারপাশে ধানিখেত। ফসল তোলার কাজ চলছে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কিষাণরা ধান কাটছে। তারা অবাক হয়ে তাকাল নবাগত এই কৃষকদের দিকে। পরস্পর মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে নাগল। কর্মরত এক কৃষক সামনে এসে হাতজোড় করে দাঁড়াল। বিনয়ের সাথে নিবেদন করল : আপনারা আর সামনে যাবেন না। এখন চলে যান। নইলে আমরা সবাই মারা যাব।

হাফিজরা বুঝতে পেরেছিল, ছদ্মবেশ তাদেরকে আড়াল করতে পারেনি, কৃষকও বানায়নি। ঠিকই তাদের চিনে ফেলেছে লোকজন। শত্রু ঘাঁটির এক শ গজ দূর থেকে ব্যর্থ মনে ফিরে এল তারা।

তারই জের ধরে সালাহউদ্দিনের নেতৃত্বে আজকের রেকি। দুদিন পর মুক্তিযোদ্ধারা ব্যাপকভাবে আক্রমণ করবে এই শত্রুসেনার ঘাঁটিতে।

জামালপুর তখন মহকুমা। তার উত্তরে ভারত ঘেঁষে গ্রামটি কামালপুর। ওপারেই ভারত বলে পাকসেনারা এখানে গড়ে তুলেছে তাদের শক্ত ঘাঁটি। তাদের দুর্ধর্ষ বালুচ রেজিমেন্ট মোতায়েন এখানে। এ ঘাঁটিরই খবরাখবর নিতে সালাহউদ্দিনরা এসেছেন রাতের আঁধারে।

দুঃসাহসী সালাহউদ্দিন। বুকে বুঝি তাঁর ভয়-ডর কিছুই নেই। কোথাও জনমনিষ্যির সাড়া নেই।  গুটিগুটি পায়ে তিনি চলে এলেন হানাদার বাহিনীর বাংকারের ২৫ গজের মধ্যে।

আর এসময়ই বেমক্কা—হল্ট্।

অন্ধকার ফুঁড়ে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে দুই পাকিস্তানি সৈন্য। দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে কলেবরে তারা দৈত্যের মতো। থমকে দাঁড়ালেন সালাহউদ্দিন। মুহূর্ত মাত্র।

প্রতিপক্ষকে কিছু বুঝতে দিতে না দিয়েই তিনি অকুতোভয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন ওদের একজনের ওপর। প্রথমে সে হকচকিয়ে যায়। বাঙালি মুক্তিযোদ্ধার হামলা বুঝতে পেরে সে আত্মরক্ষার উদ্যোগ নেয়।

দ্বিতীয় জন হতভম্ব। কী করবে বুঝে উঠতেই পারে না। অন্ধকারে সে বিমূঢ় দাঁড়িয়ে থাকে।

আর ওদিকে চলছে দুজনের ধ্বস্তাধ্বস্তি। মল্লযুদ্ধ। দানব একসময় মাটির উপর সালাহউদ্দিনকে ফেলে দিল। তাঁর উপর সওয়ার হয়ে গলা টিপে ধরল। প্রাণপণে প্রতিরোধ চালিয়ে যাচ্ছেন সালাহউদ্দিন। এর মধ্যেই এগিয়ে এসেছেন সুবেদার আবদুল হাই। অন্ধকারের মধ্যেও ঘটনাটা তিনি আঁচ করতে পেরেছেন। কিন্তু ঠাহর করতে পারছেন না  কে উপরে আর কে নিচে। তিনি না বুঝেই উপরজনের অর্থাত্ পাকসেনার পিঠে স্টেনের ব্যারেল ঠেকিয়ে দিলেন। ফিসফিস করে বললেন : স্যার, উপরে কে?

সালাহউদ্দিন জবাব দিলেন : আমি।

পাকিস্তানি সেনা বুঝতে পারল তার বিপদ। ফাঁদে পড়েছে সে। সে এক লাফে উঠে পড়ে পালানোর জন্য দৌড় দেয়। সঙ্গে সঙ্গে হাইয়ের স্টেনের গর্জন। পাকিস্তানি দুই সেনাই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে ধরাশায়ী।

রেকি পার্টি তাদের শিবিরে ফিরে আসে। বীরদর্পে বিজয় গর্বে। হাতে তাদের শত্রুপক্ষ বালুচ সেনার দুটি জিথ্রি রাইফেল ও ফৌজি ক্যাপ।