দক্ষ জনশক্তির বিকল্প নেই : নাজমুল করিম
চা করিজীবী পরিবারে আমার জন্ম। ব্যবসায়ী পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠা হয়নি, কিন্তু শিক্ষাজীবন থেকে ব্যবসায়ী হওয়ার স্বপ্ন লালন করতাম; উদ্যোক্তা হব—এই ছিল প্রত্যয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাবলিক এডমিনিস্ট্রেশনে সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়েছি। অন্যরা যখন বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে কিংবা চাকরি খুঁজে বেড়াচ্ছে, তখন আমি ভাবতাম, কোন খাতে কীসের ব্যবসা করব। পুঁজির স্বল্পতা ছিল। শুরুতে ঠিকাদারি ব্যবসায় আর্থিক ক্ষতি, এরপর পার্টনারশিপ, একক বিনিয়োগে গার্মেন্টস ব্যবসায় তিক্ত অভিজ্ঞতা। এরপর সেবা খাতের ইন্ডেটিং, ইম্পোর্টিং ও স্টক্টিস্ট হিসেবে সেবাদানে ‘ব্রিজ কেমি’র প্রতিষ্ঠা এবং সিরামিক শিল্প খাতকে রাখা হয়েছিল অগ্রাধিকারে। কথাগুলো একজন উদ্যোক্তার। তিনি নাজমুল করিম। পৈতৃক নিবাস ফেনী হলেও পিতার চাকরির সুবাদে জন্ম ও বেড়ে ওঠা বন্দরনগরী চট্টগ্রামে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জনপ্রশাসনে কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। এরপর উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার ‘লালিত স্বপ্নের বন্দর’ অভিযাত্রায় গভীর মনোনিবেশ। শুরুতে ‘বিজনেস কম্পাস’-এর সঠিক নির্দেশনা পেতে ভুল করেন। ফলে ১৯৯৮ থেকে ২০০৪ সাল—এ সময়ে এই তরুণ উদ্যোক্তা নাজমুল করিমের জীবনপুঞ্জির হাইলাইটস হলো, শুরুতেই ঠিকাদারি ব্যবসায় আর্থিক ক্ষতির মুখে প্রায় সর্বস্বান্ত। অতঃপর পার্টনারশিপ, তিক্ত অভিজ্ঞতার নোনা স্বাদ; কিছুটা হতোদ্যম; তবু দমে যাওয়া নয়। গড়ে তুললেন ব্রিজ কেমি। তারপর...১৬ বছর ধরে শুধু সাফল্যের গল্প।
বললেন, ইন্ডেন্টর, ইম্পোর্টার ও স্টকিস্ট হিসেবে বর্তমানে আমরা সিরামিক, টেক্সটাইল, রাবার ও সিমেন্টশিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কাজ করছি। ঢাকা ও চট্টগ্রাম অফিস মিলিয়ে শতাধিক লোক চব্বিশ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন সেবা দিয়ে যাচ্ছি। উত্পাদন কার্যক্রমে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনটির কখন কোন কাঁচামাল, কেমিক্যালস, স্পেয়ার পার্টস কিংবা কোন ফরেন এক্সপার্টের টেকনিক্যাল সাপোর্ট দরকার হলো—একান্ত নির্ভরতায় শিল্পকারখানাগুলো থেকে যখন জানানো হয়, তখন ব্রিজ কেমির চৌকস দল তাদের সেবায় নিয়োজিত হয়। এভাবে বাজারে আমাদের একটি সুনাম তৈরি হয়েছে এবং ক্লায়েন্টদের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়েছি। বর্তমানে পঞ্চাশের অধিক বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান এবং দেড় শতাধিক শিল্পকারখানা আমাদের ক্লায়েন্টের তালিকায় যুক্ত হয়েছে এবং তাদের সন্তুষ্ট করতে পেরেছি। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রংপুর মিলিয়ে ব্রিজ কেমির রয়েছে পাঁচটি ওয়্যার হাউজ।
তার মতে, প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে বাংলাদেশের। বিশ্বমানের পণ্য তৈরি হচ্ছে এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে প্রচুর অর্থ আসছে। প্রতিবছর এই খাতে দু-তিনটি প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগে আসছে। কিন্তু সমস্যা হলো, সম্ভাবনার বিবেচনায় বিকাশের ধারা সমুন্নত রাখতে যে পরিমাণ দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা আবশ্যক, তা হচ্ছে না। ফলে প্রায় প্রতিটি সিরামিক কারখানায় উচ্চতর দক্ষতাসম্পন্ন বিদেশি নিয়োগে বাধ্য হচ্ছে। তুলনামূলক কয়েক গুণ অধিক অর্থ ও সুবিধা দেওয়া হচ্ছে বিদেশিদের। নতুন শ্রমশক্তি তৈরির জন্য বেশ কয়েকটি ইনস্টিটিউট গড়ে তোলাসহ কাঁচামাল কিংবা ফিনিশড প্রডাক্টের মান যাচাইয়ের জন্য উন্নতমানের ল্যাব গড়ে তোলা প্রয়োজন। উপরন্তু ৯৮ শতাংশ আমদানিনির্ভর কাঁচামালের শুল্কহার কমিয়ে আনা আবশ্যক। তাতে প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় টিকতে পারবে বাংলাদেশ। তেমনি প্রণোদনামূলক নগদ সহায়তা ও সুবিধা দিতে হবে শিল্পকারখানাগুলোকে।
নতুন উদ্যোক্তার জন্য আপনার পরামর্শ কী জানতে চাইলে নাজমুল করিম বলেন, উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রথমে থাকা চাই আত্মপ্রত্যয় এবং কঠিন পরিশ্রম করার মানসিকতা। নিজের শিক্ষা, কর্মদক্ষতা ও আগ্রহের বিষয়গুলোকে গভীর পর্যবেক্ষণে আনতে হবে। পণ্য কিংবা সেবা খাত যা-ই হোক না কেন, এর বর্তমান বাজার ও ভবিষ্যত্ চাহিদার বিষয়ে ধারণা থাকা আবশ্যক। যে খাতে যে ব্যবসায় উদ্যোগ নিতে যাচ্ছেন, সে বিষয়ে জানার পরিধি বাড়িয়ে নিতে হবে। ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতায় দল গঠন ও পরিচালনায় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে প্রতিনিয়ত। তবে এটি আবশ্যক, যে খাতে আপনি ব্যবসায় উদ্যোগ নিতে যাচ্ছেন, তেমন কোনো প্রতিষ্ঠানে কিছুদিন কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করা। তবে উদ্যোক্তা হিসেবে সাফল্য পেতে হলে নিরন্তর প্রয়াসী হতে হবে; দমে যাওয়া কিংবা হাল ছেড়ে দেওয়া চলবে না কখনো।
— জসিম উদ্দিন
