ছয় শতাধিক স্টোন ক্রাশার ধ্বংস করছে পরিবেশ

আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০১৯, ২১:৪০

পর্যটনসমৃদ্ধ সিলেটের বিভিন্ন উপজেলায় ছয় শতাধিক পরিবেশবিধ্বংসী অবৈধ স্টোন ক্রাশার মেশিন চলছে বিনা বাধায়। যা মোট বৈধ ক্রাশার মেশিনের প্রায় তিন গুণ। বাতাসে পাথর কণা ছড়ানো ও শব্দ দূষণের কারণে প্রতিদিন আসা হাজার হাজার পর্যটক ও স্থানীয় লোকজন স্বাস্থ্যহানির শিকার হচ্ছেন। অন্যদিকে ক্রাশার মেশিনে কর্মরত শিশু ও নারী শ্রমিকরা নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। সিলেটের পর্যটন শিল্পে দেখা দিয়েছে অশনি সংকেত।

আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে এসব অবৈধ ক্রাশার মেশিনগুলো বিদ্যুত্ সংযোগ কীভাবে পেল তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, ‘যেখানে নির্মল পরিবেশ বজায় রাখা জরুরি, সেখানে বৈধ-অবৈধ উপায়ে পরিবেশ ধ্বংস চলছে দীর্ঘদিন থেকে।’

অন্যদিকে পাল্লা দিয়ে চলছে পাথুরে এলাকা কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় নদী খুঁড়ে ও টিলা কেটে অবৈধ পন্থায় পাথর উত্তোলন। মাঝে মাঝে অভিযান চললেও তা কাজে আসছে না। গত বৃহস্পতিবার কোম্পানীগঞ্জের শাহ আরফিন টিলায় টাস্কফোর্স দিনভর অভিযান চালিয়ে ১৫টি শ্যালো মেশিন, ৭টি লরি ট্রাক্টর ও ১ হাজার ৫০০ ফুট পাইপ ধ্বংস করেছে। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে শাহ আরফিনে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে পাথর উত্তোলন করায় অভিযানে নামে টাস্কফোর্স।

বিশেষ করে সিলেটের জাফলং, তামাবিলসহ বিভিন্ন সীমান্ত জনপদে পরিবেশ ধ্বংসকারী স্টোন ক্রাশার মেশিন বেড়েই চলছে। বেলার সিলেট বিভাগীয় সমন্বয়ক শাহ সাহেদা আখতার জানান, এসব স্টোন ক্রাশার মেশিন বসতঘর, বিদ্যালয়, মসজিদ, বাজারের আশপাশে অবস্থিত। ফলে এ থেকে উত্পন্ন বিপুল পরিমাণ পাথর কণা বাতাসে ছড়াচ্ছে এবং মানব দেহে ঢুকছে। মেশিনের অবিরাম বিকট শব্দ স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর। স্থানীয়রা জানান, তারা শ্বাসকষ্টসহ নানা সমস্যায় ভোগছেন।

সিলেটের জেলা প্রশাসক এম কাজী এমদাদুল ইসলাম বলেন, সিলেটের প্রকৃতিকে ধ্বংস করে যারা অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন ও ক্রাশার মেশিন চালাচ্ছে, তাদের বয়কট করতে হবে। অবৈধ পাথর উত্তোলন ও ক্রাশার মেশিন ব্যবহার বন্ধে প্রশাসনের সর্বাত্মক কার্যক্রম অব্যাহত রাখার আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, ‘এক্ষেত্রে সিলেট চেম্বারসহ সর্বমহলের সহযোগিতা প্রয়োজন। তিনি বলেন, উচ্চ আদালতে মামলা থাকায় পাথর উত্তোলন একবারে বন্ধ করা যাচ্ছে না।

এদিকে গত সপ্তাহে সিলেটের একটি অভিজাত হোটেলে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির উদ্যোগে ‘স্টোন ক্রাশার মেশিনের অবৈধ ব্যবহার; জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের বিপর্যয় রোধে করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্টিত হয়। সভায় সভাপতির বক্তব্যে বেলার প্রধান নির্বাহী এডভোকেট সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, সারাদেশের পাথর উত্তোলন থেকে সরকারের রাজস্ব আয় মাত্র ৩৬ কোটি টাকা। এই টাকার জন্য পরিবেশের এতো বড় ক্ষতি মেনে নেওয়া যায় না। জাফলংকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণার দাবি জানিয়ে বলেন, প্রকৃতি একবার ধ্বংস হলে তাকে ফিরিয়ে আনা যাবে না। নগণ্য সুবিধার জন্য এতবড় ক্ষতি ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বাস্তবতার মধ্যে পড়ে না। সেমিনারে ক্রাশার মেশিন স্থাপন, পাথর উত্তোলন করে পরিবেশের  ক্ষতি সাধন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত স্থানগুলো ধ্বংস করা, প্রশাসনের মাধ্যমে মোবাইল কোর্ট পরিচালনাসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা হয়।

সেমিনারে জেলা প্রশাসক অভিযান পরিচালনায় বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আদালতে মামলা থাকায় পাথর উত্তোলন একবারে বন্ধ করা যায় না। যখনই অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন ও ক্রাশার মেশিন চালানো হয় তখনই অভিযান চালিয়ে সেগুলো ধ্বংস করা হয়। তিনি জানান, দেশের মোট চাহিদার প্রায় ৮০ ভাগ পাথর আমদানি করা হয়। পরিবেশ রক্ষার জন্য সেই ২০ ভাগ পাথরও আমদানি করলে ভালো হয়। 

সিলেট থেকে পাথর উত্তোলন বন্ধে প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি রয়েছে উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, গত ডিসি সম্মেলনের সময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা হলে তিনি প্রয়োজনে সেসব বন্ধ করার পক্ষে মত দেন। জেলা প্রশাসক বলেন, শিগগিরই ক্রাশার মেশিনগুলো বিক্ষিপ্ত স্থান থেকে সরিয়ে গোয়াইনঘাটে ১৩৩ একর জমিতে ক্রাশার মেশিন জোন করা হবে।  তিনি  বলেন, পাথর উত্তোলন বন্ধ ও পর্যটন সুবিধা বৃদ্ধি করা গেলে এখানে কর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি হবে।