অয়েজুল হক
মোফাজ্জল হোসেন বইপড়ুয়া মানুষ। বই পড়তে শুরু করলে খাওয়া ঘুমের কথা ভুলে যান। চাকরি থেকে অবসরে। স্ত্রী রোজিনা বেগমের হাতে সংসারের দায়ভার তুলে দিয়ে বাকি জীবন বই পড়ে কাটাবেন বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। বরাবরই বিদঘুটে লোকটাকে রোজিনা বেগমের অপছন্দ। বর্তমানে তার কাজকর্মে অতিষ্ঠ। প্রতিদিন তার ঘর সাতবার গোছাতে হয়। আজ ছয়বার হয়েছে। দুপুরের দিকে এসে দেখেন এলোমেলো, ছড়ানো-ছিটানো ঘরভর্তি বই। রোজিনা বেগমের মাথায় রাগ উঠে যায়। চিত্কার করে বলেন, ‘ঘরের কী অবস্থা করেছ?’
মোফাজ্জল হোসেন বই পড়ায় মনোযোগী। পড়ার সময় সাধারণত তিনি কারো কথার জবাব দেন না। ‘খাওয়া নেই, গোসল নেই উনি সাধক হয়েছেন। বই সাধক!’ মোফাজ্জল হোসেন নিরুত্তর। তার মুখের ভেতর আস্ত একটা বই মুড়ে ঢুকিয়ে দিলে ভালো হতো। রোজিনা বেগম ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। দুপুর গড়িয়ে বিকাল, রিতা মেয়েটা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সাজগোজ করেছে। মুখে বিড়বিড় করে গান গাইছে। কাছ ঘেঁষে দাঁড়িয়েও গানের শব্দ বোঝা যায় না। মাকে পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মুখ ঘুরিয়ে সুর করে বলে, ‘তুমি হলে বিচারক। বিচার করো গো আমি কত সুন্দর। যদি পারো তোমার খোপায় দেব ফুলমালা।’
মেয়ের ন্যাকামি দেখে বিগড়ানো মেজাজ আরো বিগড়ে যায়, ‘তুই সুন্দর হলে অসুন্দর কে?’
‘কী আমি অসুন্দর?’ রিতার দরাজ গলা। ‘আমি সুন্দরী প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়ে তোমাকে দেখিয়ে দেব...’ কথা শেষ করেই রিতা হনহন করে বেরিয়ে যায়।
তার মুখে দেড় ইঞ্চি মেকআপ। দেখতে সুন্দর না হলেও সে সুন্দরী প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে। রিতার ধারণা, সে সুন্দরী প্রতিযোগিতায় অবশ্যই প্রথম হবে। পৃথিবীর সব মেয়েই নিজেকে সবচেয়ে বেশি সুন্দরী মনে করে।
ছেলে রায়হান হয়েছে আরেক সাধক। ঘুপচি মেরে ঘরের ভেতর পড়ে আছে। অক্টোবরের শেষের দিকে তার ঘুপচির পরিমাণ বেড়ে গেছে। ঘুপ মেরে ভূত সাধনা করছে। প্রথমে বলেছিল ৩১ অক্টোবর ভূত দিবস। ভূতের দল নাচ-গান করবে। ভূত দিবস নিয়েও তার আপত্তি। ভূত রজনী বা ভূত রাত্রি হওয়া উচিত ছিল। ভূতেরা অন্ধকার পছন্দ করে। রাত পছন্দ করে। রাতেই তারা বের হয়। ভূত রজনীতে রায়হান ভূতের সাথে ভূতরাত্রি পালন করবে। অক্টোবর চলে গেলেও রায়হান প্রায় দিনরাত রুমের ভেতর সটানভাবে পড়ে আছে। দরজায় টোকা দিতেই ভেতর থেকে ভেসে আসে, ‘হুম ভূত, গুম ভূত, ফুম ভূত, কোন ভূত রে?’
রোজিনা বেগমের মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড়। বাড়িটাকে পাগলের আখড়া মনে হয়। বিরক্ত গলায় বলেন, ‘বিকাল হয়ে গেল, ভাত খাবি না?’
রায়হান ভেতর থেকে বলে, ‘ভূতেরা ভাত খায় না। হাড় খায়, ছাই খায়। আছে এগুলো?’
রোজিনা বেগম কিছুটা অসহায়, অস্থির। তিনি নিজেও না খেয়ে নিজের রুমের ভেতর এসে বিছানায় গা এলিয়ে দেন।
রিতা আসে রাত দশটার পরে। সুন্দরী প্রতিযোগিতায় বাদ পড়ে যাওয়ায় মনের কষ্টে পিকুকে ফোন করে। পিকু রিতার প্রেমিক।
‘হ্যালো পিকু।’
‘হু।’
‘তুমি যে চৌদ্দবার বলো—আমি পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি সুন্দরী।’
‘হ্যাঁ, বলি। ওই যে একটা গান আছে না, তুমি চাঁদের চেয়েও সুন্দর...’
‘স্টুপিড।’
‘গালি দিচ্ছ কেন?’
‘সুন্দরী প্রতিযোগিতায় আমি বাদ পড়েছি। মেজাজ খারাপ।’
‘ওদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ দিতে পার। তোমাকে কেন বাদ দেওয়া হলো, সে ব্যাপারে প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করা যেতে পারে। প্রতিবাদ, বিক্ষোভ সমাবেশ, অনশন কর্মসূচির আয়োজন—সব পথ খোলা। কী কী করতে হবে বলো।’
রিতা মোবাইল আছড়ে ফেলে। শব্দ শুনে রোজিনা বেগম ছুটে আসেন। দেয়ালের বাড়ি খেয়ে দামি মোবাইলটা খণ্ডবিখণ্ড হয়ে মেঝেতে পড়ে আছে। আর কত! খেঁকিয়ে উঠে বলেন, ‘মোবাইল কিনতে টাকা লাগে না?’
‘মা, কথা বলো না। আমার মেজাজ কিন্তু চরম খারাপ।’
মোফাজ্জল হোসেন খাবার খাচ্ছিলেন। চিত্কার শুনে এগিয়ে যান। তাকে দেখে রোজিনা বেগম বলেন, ‘এই যে নাটের গুরু। নিজে এক পাগল বাড়ির সবগুলোকে পাগল করে ছাড়বে।’
বাবাকে দেখে রিতা আহ্লাদী গলায় বলে, ‘বাবা আমি কি সুন্দর নই?’
‘অবশ্যই সুন্দর। পৃথিবীর সবকিছুই সুন্দর। সুন্দর বুঝতে সুন্দর একটা চোখ থাকা দরকার।’
‘আমার সুন্দর বোঝার চোখ নেই? তোমার মেয়ে সুন্দর?’
মোফাজ্জল হোসেন বলেন, ‘সুন্দরের কোনো ব্যাখ্যা নেই। আফ্রিকায় কুচকুচে কালো, বিদঘুটে মুখাবয়বের মেয়েও সুন্দরী প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়। রিতা সে তুলনায় যথেষ্ট সুন্দরী।’
সারাদিনের রাগ পুষে বিছানায় এপাশ ওপাশ করেন। রাত দুটোর দিকে সামান্য তন্দ্রা ভাব আসে। ঠিক সে সময় নিচতলায় প্রতিদিনের রুটিন ওয়ার্ক শুরু হয়। বাড়ি ভাড়া দেওয়ার শর্তই হলো নবদম্পতি হতে হবে। কোনো ছেলেপেলে থাকলে হবে না। শর্তানুযায়ী নব বিবাহিত রিয়াজ-সুমনা জুটির কাছে নিচতলা ভাড়া দিয়েছেন। দুজনের এই সুখী পরিবার থেকে প্রতিদিন রাত দুটোর দিকে থালাবাটি আছড়ে ফেলার শব্দের সঙ্গে চিত্কার ভেসে আসছে। বিকট শব্দে ঘুম থেকে রোজিনা বেগম ধড়ফড়িয়ে জেগে উঠলেও বাড়ির অন্যলোকের এ নিয়ে কোনো বিকার নেই। মোফাজ্জল সাহেবকে ঘটনা জানালে তিনি নির্বিকারভাবে বলেন, ‘কারো ব্যক্তিগত ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়।’
রোজিনা বেগমের কাছে গোটা পরিবেশ অসহ্য লাগে। মনে হয়, এখানে থাকলে তিনি নির্ঘাত পাগল হয়ে যাবেন। মরেও যেতে পারেন। বাবার বাড়ি চলে যাবেন। রোজিনা বেগমের ভাই বড় সরকারি কর্মকর্তা। তাকে ফোনে নিজের অসহায়ত্বের কথা খুলে বলতেই তিনি বলেন, ‘চিন্তা করিস না। বাড়িতে একটা শুদ্ধি অভিযান চালাতে হবে। একদিনে সব ঠিক হয়ে যাবে।’
‘কিসের শুদ্ধি অভিযান?’
‘এসব জেনে তোর লাভ নেই। আমি থানায় বলে দিচ্ছি, তুই শুধু দেখবি কী হয়।’
সকাল হতেই এক ঝাঁক পুলিশ হাজির। তাদের নিয়ে রোজিনা বেগম বীরদর্পে মোফাজ্জল হোসেনের রুমের দিকে এগিয়ে যান।
‘এই কী করেন?’
মোফাজ্জল হোসেন বইয়ের ভেতর ডুবে আছেন। একজন গিয়ে ওনাকে টেনে হিঁচড়ে খাট থেকে নামান। চোখের সামনে একগাদা পুলিশ দেখে মোফাজ্জল হোসেন কিছুটা অবাক হয়ে বলেন, ‘কী হয়েছে? ডিস্টার্ব করেন কেন?
‘আপনি মানুষ হত্যার চক্রান্তকারী।’ বন্দুক উঁচিয়ে একজন বলেন, ‘ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট।’
হত্যা, চক্রান্তকারী, অ্যারেস্ট, পুলিশ, বন্দুক সব মিলিয়ে মোফাজ্জল হোসেনের গলা শুকিয়ে আসে। হেঁচকি দিতে শুরু করেন। ‘আমি বইপড়ুয়া মানুষ। হিক। হিক। হিইক।’
‘এত হেঁচকি দিচ্ছেন কেন?’
‘কারণ তো বলতে পারব না। তবে বিজ্ঞানীরা শত শত বছর ধরে চেষ্টা করছেন। কারণ বের করতে পারছেন না। হিক হিক।’
‘আপনি হিক হিক করা বন্ধ করুন।’
‘বন্ধ করা তো আমার হাতে না। হেঁচকির সময় শ্বাসনালীতে সামান্য খিঁচুনির মতো হয়, যার ফলে শ্বাসযন্ত্রে দ্রুত বাতাস প্রবেশ করে। তখন ভোকাল কর্ড হঠাত্ বন্ধ হয়ে ‘হিক’ শব্দ তৈরি হয়। হিক হিক।’
রায়হান চিল্লাপাল্লা শুনে বাবার রুমের কাছে এসে দাঁড়ায়। ভেতরের বিপজ্জনক কথাবার্তা শুনে আধা ন্যাংটো অবস্থায় দৌড়ে পালিয়ে যায়। রিতা ভাইকে খালি গায়ে দৌড়ে পালতে দেখে অবস্থা গুরুতর ভেবে সেও রায়হানের পেছনে পেছনে হুজুগে দৌড়াতে থাকে।
রোজিনা বেগম ছেলেমেয়ে দুজনকে পড়িমরি করে পালাতে দেখে বলেন, ‘লাভ হবে না। শুদ্ধি অভিযান সবে শুরু।’ g
