আফরীন সুমু
বাবুল কাকা আজব চরিত্রের মানুষ। তার হাল-হকিকত দেখলে এক বাক্যে তাকে কৃপণ বলা যায়। তবে তার বাড়িটা দেখলে আর সে কথা মনে হবে না। প্রচুর পয়সা খরচ করেছেন বাড়ির পেছনে। বাড়ি ঘেরা ছাই রঙের পরিষ্কার দেয়াল। বাড়িটাকে তিনি কাচের শো-পিসের মতো যত্ন করে রাখেন। যে লোক বছরে একটার বেশি লুঙ্গি কেনেন না, সেই লোক বাড়ির জন্য একজন দারোয়ান রেখেছেন। যার কাজ বাড়ি দেখাশোনা নয়, বাড়ির দেয়াল দেখাশোনা করা। রাস্তার পাশের বাড়ি থাকলে নানা উত্পাত। কেউ থুথু ফেলবে তো দেয়ালে ফেলবে। কেউ পানের পিক ফেললে ঐ দেয়ালেই ফেলবে। হাতের চুনটুকু পর্যন্ত দেয়ালে লেপ্টে দিয়ে যাবে। বিজ্ঞাপনওয়ালারা তো আছেই। ভোজবাজির মতো বিজ্ঞাপন লাগিয়ে রেখে চলে যায়। বাবুল কাকা নিজে খুবই অপরিচ্ছন্ন মানুষ। জামাকাপড় মনে হয় মাসেও একবার ধৌত করেন না। ব্রাশ করেন না ঠিকমতো। মুখে গন্ধ। অথচ তার বাড়ি থাকা চাই ঝকঝকে তকতকে। বাউন্ডারির দেয়ালটা এই নিয়ে তৃতীয়বার রং করালেন। এবার বাবুল কাকার জেদ ধরে গেল। দেয়াল কি করে নোংরা হয় তিনি দেখে নেবেন।
সকালে আমরা এলাকাবাসী অত্যন্ত বিস্মিত হলাম। কারণ বাবুল কাকা একটা ভয়ংকর দর্শন অ্যালসেশিয়ান কুকুর কিনে এনেছেন। আমরা ভাবলাম এই কুকুর পালার খরচ সম্পর্কে উনি বোধহয় অবগত নন। কিন্তু আমাদের ধারণা ভুল। উনি মনিরের দোকানে এসে আধকাপ চা চাইলেন। এখন থেকে উনি প্রতিবার এক কাপের বদলে আধকাপ চা খাবেন। কুকুরটার পেছনে অনেক খরচ হচ্ছে। কুকুরটা আনার পর বাবুল কাকাকে অনেকখানি নিশ্চিত দেখা গেল। বাঘা কুকুর তার বাড়ির দেয়ালে হাত দেয়া দূরে থাক পাশ ঘেঁষে কেউ হেঁটে গেলেও ওটা রাগী গলায় ঘড়ঘড় করে ওঠে।
এক দুপুরবেলা। চারদিক নিরিবিলি। লুঙ্গিপরা এক ফিটফাট ভদ্রলোক হেঁটে আসছিলেন। ফিটফাট ভদ্রলোক বললাম, কারণ তিনি লুঙ্গির ওপর চকচকে একটা কোট গায়ে দিয়েছেন। জুতাজোড়াও নতুন বলে মনে হচ্ছে। ভদ্রলোক বাবুল কাকার বাড়ির সামনে এসে থামলেন। নিচ পেটে প্রচণ্ড চাপ ধরে আছে। হালকা হওয়া দরকার। উনি একটু এদিক-ওদিক তাকিয়ে বাবুল কাকার বাড়ির দেয়ালের দিকে মুখ করে বসে গেলেন। আচমকা কোথা থেকে অ্যালসেশিয়ানটা গর্জন করতে করতে ছুটে এলো। অমন বাঘা কুকুর ভদ্রলোক বোধহয় জীবনে দেখেননি। কিসের নিম্নচাপ কিসের কী! ভদ্রলোক জান হাতে নিয়ে ছুটলেন। কুকুরটাও ছুটছে। কিছুদূর যেতেই ভদ্রলোকের একপাটি জুতা গেল খুলে। ভদ্রলোক দেখলেন জুতা তুলতে গেলে সর্বনাশ। ডাইরেক্ট নাভির গোঁড়ায় সাতটা ইঞ্জেকশন। তিনি জুতার মায়া ত্যাগ করে ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে ছুটছেন। ছুটতে ছুটতে একটা দোকান পর্যন্ত আসার পর দেখলেন কুকুরটা আর আসছে না দূর থেকে ঘেউ ঘেউ করছে। লোকটা দোকানিকে বলল, ‘এমুন কুত্তা মাইনষে পালে কন দেহি?’ দোকানে স্বয়ং উপস্থিত বাবুল কাকা। লোকটা বলল, ‘নতুন জুতাজোরা কিনছি, দুইমাস পরি নাই। হালার কুত্তায় এক পাটি লয়া গেল গা। কী করি কন দেহি ভাইজান?’ বাবুল কাকা বললেন, ‘জুতা ফিরত পাইতে পারেন। তয় কন তো কী করছিলেন ঐখানে গিয়া। কুত্ত ক্ষেপল ক্যান?’ লোকটি বলল, ‘আর বইলেন না, একটু মুতে ধরছিল...’ লোকটিকে কথা শেষ করতে না দিয়ে বাবুল কাকা বললেন, ‘কুত্তাটা বড়ই শয়তান। জুতা ফিরত পাইবার আশা নাই। জুতা ছাড়াই বাড়িত যান। আর যেইহানে সেইহানে মুতার আগে দেইখা লইয়েন কুত্তা মুত্তা আছেনি। নইলে এইবার জুতা গেছে পরেরবার ইজ্জত লইয়া টান দিব।’
বাবুল কাকা আনন্দিত মনে বাড়ির দিকে রওনা দিলেন। g
