সত্যজিত্ বিশ্বাস
সব মহল্লাতেই একজন করে সবজান্তা শমসের থাকে। আমাদের পাড়ায় আছে দীপ। যেকোনো বিষয়ে, যেকোনো পরিস্থিতিতেই তার সবজান্তা স্বকীয়তার ছাপ। পাড়ার টং দোকানে বসে ছোট কাচের গ্লাস ভরা চা নিয়ে, সেই গ্লাস আবার একটা খালি কাপের মধ্যে রেখে কাপের ডাণ্ডায় তর্জনী ঢুকিয়ে চুমুক দিতে দিতে দেশের তাবত সমস্যা নিয়ে ভাবে সে। চা নাকি গ্লাসে খেতে মজা বেশি। গ্লাসের তো আর ডাণ্ডা হয় না, তাই খালি কাপের মধ্যে গ্লাস রেখে আয়েশ করে এই চা খাওয়া।
সবকিছুকে সিস্টেম করার অসামান্য বুদ্ধি নিয়ে জন্মালেও কেন জানি দাঁতগুলোর কাছে নিজেই সিস্টেম হয়ে বসে আছে। সময় পেলেই দাঁতের ফাঁক-ফোঁকরে শলা, কাঠি, আলপিন, সেফটিপিন; মোট কথা, সামনে যা পাওয়া যায়, তাই দিয়েই জমে থাকা লুকায়িত সম্পদ দক্ষ সার্জনের মতো অপারেশন করে বের করে চোখ বুঁজে জাবর কাটে।
একদিন দেখি রাস্তার মোড়ে বসে জুতা সেলাই করতে থাকা মুচির পাশে বসে কী জানি বোঝাচ্ছে মুচিকে। ভাবলাম, বুঝি জুতা সেলাই করতে এসেছে। কাছে গিয়ে দেখি, জুতা সেলাই-টেলাই কিছু না, মুচির কাছ থেকে অনুনয়-বিনয় করে কিছু টোন সুতা নিচ্ছে। কারণ জিজ্ঞাসা করতেই মুচকি হেসে বলল, ‘সময় মতোই টের পাবি।’
পরদিন সময় মতোই টের পেলাম, দীপ কী জিনিস। বাসায় বসে আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজের উপরের মাড়ির এবড়ো-খেবড়ো দাঁতগুলোকে সুতা দিয়ে বেঁধে এমনভাবে ওয়ারিং করেছে, যেকোনো প্রফেশনাল ডেনটিস্টও ভড়কে যাবে।
কিন্তু এত কিছুর পরেও দাঁতের যন্ত্রণা তার পিছু ছাড়ছিল না। একদিন তাই আমাদের আফসোস করে বলল, ‘বুঝলি রে দোস্ত, এ খোদার অবিচার। চোখ, কান, নাক, হাত, পা- সব কিছু দিয়েছে একটা নাহলে দুটো করে। কিন্তু দাঁতের বেলা? একটা-দুইটা না, এক্কেবারে বত্রিশটা। এত্তগুলো দাঁত দেখে রাখা কি মুখের কাজ?’
দাঁতের ডাক্তারকে দীপ ভয় পায় যমের মতো। সেই ছোটবেলায় একবার দাঁতের ডাক্তারের কাছে গিয়েছিল পোকা খাওয়া দাঁত তুলতে। ডাক্তার মাড়িতে ইনজেকশন দেওয়া মাত্রই সেই যে ‘মাগো’ বলে দৌড় লাগিয়েছিল, সেই দৌড় থামিয়েছিল বাসার বাথরুমে ঢুকে।
তবে এবারের অবস্থা মারাত্মক। দাঁতের ব্যথায় সারাদিন গালে হাত দিয়ে ছটফট করতে করতে আর কাউকে না পেয়ে আমাকে জাপটে ধরে রওনা দিল দাঁতের ডাক্তারের চেম্বারে। ডাক্তারের কাছে গোঙাতে গোঙাতে অনেকক্ষণ ধরে তার পোকা খাওয়া দাঁতের অতীত ইতিহাস বর্ণনা করল। ডাক্তার সাহেব চোখ বুজে মন দিয়ে সব শুনলেন (নাকি মাঝখানে একটু ঝিমিয়ে নিলেন কে জানে)। তারপর একটা বড় হাই তুলে ডাক্তার সাহেব সাহস দিয়ে বললেন, ‘আপনার ভয়ের কোনো কারণ নেই। আমি তো আছি, আমার ওপর ভরসা রাখুন। নিন, এবার সোজা হয়ে সিটে শুয়ে পড়ুন তো।’
অপরিচিত কারো ওপর ভরসা রাখার ছেলে দীপ না। ডাক্তার সাহেব হাতে ফোরসেপ নিয়ে দীপের দিকে ঝুঁকতেই দীপ হাত তুলে বাঁধা দিল। দাঁত তোলার সিটে শুয়েই আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুই এক কাজ কর তো, ফোন দে সবাইকে। পাড়া থেকে সব বন্ধুরা যেন চলে আসে এখানে। তোরা সবাই পাশে থাকলে আমার সাহসটা বাড়বে।’ ডাক্তার সাহেব অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কেন, ওরা এসে কী করবে?’ দীপ লাফ দিয়ে উঠে বলল, ‘ওরা খেয়াল রাখবে, কোন শালা আমার দাঁতে ব্যথা দিয়ে দাঁত তোলে। আমি ব্যথায় উঁ-উঁ করলেই ওরা ঝাঁপিয়ে পড়বে।’
এক হাতে ফোরসেপ আর অন্য হাতে মিরর নিয়ে ডাক্তার সাহেব হা করে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। g
