শাহনেওয়াজের ভুঁড়ি

আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০১৯, ১৮:০৩

সাইফুল ইসলাম জুয়েল-এর

আজ সন্ধ্যায় তোতা চাকলাদারের চায়ের দোকানে সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে হিরুর চা খেতে যাওয়াটাই যেন কাল হয়েছে!

চায়ের কাপে কেবল একটা চুমুক দিয়েছে ও, এমন সময় বুখারী ভাইয়ের আগমন। চায়ের কাপে রীতিমতো ঝড় তুললেন তিনি। সেই ঝড়ের নাম—হিরুর ভুঁড়ি!

হিরুকে দেখা মাত্রই রি রি করে উঠলেন। ‘কী সর্বনাশ, কী সর্বনাশ!’

সকলে অবাক। ‘সর্বনাশের কী হলো? চায়ের কাপে কি মাছির বদলে তেলাপোকা পড়েছে!’

বুখারী ভাই চোখ বড় বড় করে বললেন, ‘হিরুর এটা কি ভুঁড়ি নাকি মাইড (বিশালাকারের মাটির পাত্র)!’

মুহূর্তেই সবার চোখ চলে গেল হিরুর পেটের দিকে। সকলে এমনভাবে দেখছে—যেন জীবনেও জিনিসটা দেখেনি কেউ! সকলেই যে এমন একটা খাদ্য গুদাম নিয়ে চব্বিশ ঘণ্টা ঘুরে বেড়ায়, সে খবর কে রাখে! তাছাড়া, হিরুর ভুঁড়ির আকৃতিটা যে খুব বিতিকিচ্ছিরি পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, তাও কিন্তু নয়। কেবল মাত্র তার ভুঁড়ির কুঁড়ি ফুটতে শুরু করেছে। এখনই কিনা লোকটার শকুনি চোখে পড়ে গেল!

হিরু মুচকি হেসে বলল, ‘নারীর চুড়ি আর পুরুষের ভুঁড়ি।’

বুখারী ভাই বললেন, ‘ভুঁড়ি মোটেও পুরুষের গর্ব করার বিষয় নয়, হিরু। হতে হলে আমার মতো তথা বাঁশের টুনির (কঞ্চির) ন্যায় শুকনো হও।’

বুখারী ভাই ছোটবেলা থেকেই ভীষণ চিকনা। গ্রামাঞ্চলে কচি বাঁশকে টুনি বলে। বুখারী ভাই ছোটবেলায় তো বটে, এখনো সেই টুনির মতোই রয়ে গেছেন। ছোটবেলায় পোলাপান তাকে টুনি বা টুনটুনি বলে ক্ষ্যাপাত। নামটা ঘোচাতে তিনি অনেক কিছুই করেছেন। কিন্তু তখন কাজের কাজ কিচ্ছু হয়নি, যেটা হয়েছে এত বছর পরে। এখন জিরো ফিগারের চল। সেই সুযোগে বুখারী ভাই মাইনাস জিরো ফিগারের পক্ষে বেশ জোরালো প্রচারণা চালিয়েছেন। সে কাজে যে তিনি বেশ সফল হয়েছেন, তা তার টুনটুনি নাম দূর হওয়ার মাধ্যমেই টের পাওয়া যায়। সেই ছোটবেলায় ‘মটু’ হতে চাওনেওয়ালা বুখারী ভাই এখন উঠেপড়ে লেগেছেন ভুড়িওয়ালাদের বিরুদ্ধে। তার সর্বশেষ শিকার স্বয়ং হিরু।

হিরুও ব্যাপারটা বুঝতে পারল। বুখারী ভাই এভাবে তুখোড় ফর্মে খেলে গেলে ও এখান থেকে ভুঁড়ি নিয়ে যেতে পারবে বটে, বাট মানসম্মান নিয়ে যেতে টানাটানি লেগে যাবে!

হিরু চোখে মুখে যথাসম্ভব হাসিহাসি ভাব রেখে বলার চেষ্টা করল, ‘তবে কি জানো বুখারী ভাই, মানুষ কিন্তু ট্রেন্ডি জিনিসকেই বেশি ফলো করে। সে কারণে এখন তোমার আশপাশে যত মানুষজন আছে, দেখবে তাদের শতকরা বিরানব্বই জনেরই ভুঁড়ি রয়েছে।’

হিরুর কথায় বুখারী ভাইয়ের মাঝে কোনো প্রতিক্রিয়া জন্ম না দিলেও, অন্যরা এতক্ষণে নিজেদের ভুঁড়িটা আবিষ্কার করতে পারল।

বুখারী ভাই শ্লেষ মাখানো কণ্ঠে বললেন, ‘ভষ্যিতে যখন উষ্ণায়নের ফলে পৃথিবীর অনেক জায়গা সাগরজলে তলিয়ে যাবে, জনসংখ্যার চাপে পৃথিবী পৃষ্ঠ হবে, তখন কিন্তু তোমাদের ওই ভুঁড়িগুলো কাজে দিবে। তোমাদের ভুঁড়ি দিয়েই তৈরি হবে এক একটা নতুন দ্বীপ!’

হিরুর বুঝতে বাকি রইল না—আজ বুখারী ভাই ভুলক্রমেও অন্য কোনো প্রসঙ্গে যাবেন না। তিনি নিজে ভুঁড়িধারী না হলে কি হবে, মাথায় ভুরি ভুরি ‘ভুঁড়ি চিন্তা’ নিয়েই এখানে হাজির হয়েছেন। সুতরাং লাগাম টেনে না ধরলে চলছেই না!

ও বলল, ‘আমাদের আর কী ভুঁড়ি বুখারী ভাই। তুমি কি শাহনেওয়াজের ভুঁড়িটা দেখেছ কখনো?’

‘এই শাহনেওয়াজটা আবার কে?’ বুখারী ভাই মনে মনে আওড়ালেন। কিন্তু, তিনি যে শাহনেওয়াজকে চিনেন না, সেটা প্রকাশ করলেন না। এমন ভাব করলেন, যেন শাহনেওয়াজ তার ন্যাংটাকালের দোস্ত!

চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে তিনি কেবল ‘উহুম হুম’ শব্দ করলেন।

হিরু বলে চলল, ‘এখন যদি কেউ শাহনেওয়াজের ভুঁড়িটা দেখে, তবে সে এভারেস্টকেও কম উচ্চতর মনে করবে!’

‘এই যা! এটা আবার কেমন কথা!’ বুখারী ভাই যেন ভীষম খেলেন।

‘তাহলে আর বলছি কী বুখারী ভাই। শাহনেওয়াজও কিন্তু ছোটবেলায় ‘টুনী’ সাইজ ছিলো।’ ইচ্ছাকৃতভাবে শব্দটা তুলে হিরু বুখারী ভাইয়ের মুখভঙ্গি খেয়াল করে আবার বলতে শুরু করল, ‘সেই শাহনেওয়াজের আজ সে কী বিশালাকৃতির ভুঁড়ি! একটা ঘোড়া টানা সাতদিন দৌড়েও তার সমান দূরত্ব অতিক্রম করতে পারবে না।’

‘এই এই, তুই কিন্তু এবারে গুল মারতে শুরু করেছিস!’ বুখারী ভাই বিষয়টা ধরতে পারলেন।

হিরু মুচকি হেসে বলল, ‘তাহলে শোনো, আসল কথাই বলি। চিকনচাকন শাহনেওয়াজ যখন ভার্সিটির ছাত্র, তখনো তাকে স্কুুলের স্টুডেন্ট বলেই চালিয়ে দেওয়া যেত! বহুবার সে ট্রেনে হাফটিকিটে ভ্রমণ করেছে। তারপর, ভার্সিটি জীবন শেষ করারও বহু বছর পর অব্দি সে বাসভাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে স্টুডেন্ট বলে অর্ধেকেই চালিয়ে দিয়েছে। সেই শাহনেওয়াজের যখন ভুঁড়ি জন্মাল, তখন বন্ধুবান্ধব, ছোটভাই-বড়োভাই—মোদ্দাকথা হলো, পরিচিত কেউই চিনতে পারল না ওকে। আর কয়েক বছরের গ্যাপ দিয়ে যাদের সাথে ওর দেখা-সাক্ষাত্ হলো, তারা তখন ওকে দেখে কনফিউশনে পড়ে গেল—আদৌ কি ওকে তারা চেনে! বড়োরা ভাবে, এ বোধহয় তাদেরও সিনিয়র ছিল! সিনিয়ররা কেউ কেউ ওকে ভাই পর্যন্তও ডেকে বসেছে!’

‘তারপর?’

‘বিয়েটা ও চিকনা অবস্থাতেই সেরে ফেলেছিল। কিন্তু ওর যখন ভুঁড়ি হলো, তখন শ্বশুর পক্ষ থেকে দলে দলে লোকজন এসে ওকে দেখে যেতে লাগল, ঠিক যেমনি করে মানুষ হাসপাতালে নতুন জন্ম নেওয়া বাচ্চা ও তার মাকে দেখতে যায়!’

‘তারপর?’

‘এই ভুঁড়ি নিয়ে শাহনেওয়াজ একবার ওদের গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিল। গ্রামের বাড়ি, বোঝোই তো—বুড়ো-বুড়িতে ভর্তি! তাদের সকলেরই এক কথা, শাহনেওয়াজ শহরে থেকে একদমই স্বাস্থ্যের যত্নআত্তি করছে না। একেবারে শুকিয়ে গেছে ছেলেটা! তবে, নিজের এই ভুঁড়ির ক্রমাগত উন্নতিতে শাহনেওয়াজ যারপরনাই বিরক্ত। ওর বউ কিন্তু খুব খুশি। বাসায় তার নিত্যনতুন তৈরিকৃত রেসিপির একমাত্র ভোজক (খাদক) শাহনেওয়াজের এহেন স্বাস্থ্যোন্নতি নাকি প্রমাণ করে দেয়—তার হাতে কী পরিমাণ জাদু আছে! বউয়ের হাতের রান্না খেয়েই নাকি শাহনেওয়াজ এমন ‘সুষম স্বাস্থ্যের’ অধিকারী হয়েছে!’

অন্যরা গভীর মনোযোগের সহিত শাহনেওয়াজকে নিয়ে হিরুর বলা গল্প শুনছিল। খুব সহজে তাদের বিস্ময়ের ঘোর কাটল না। তবে বুখারী ভাই ঠিকই মুখ খুললেন। ‘দেখলে তো, এজন্যই বলি ভুঁড়ি মোটেও ভালো কিছু নয়!’

হিরু বিরক্তির ভান করে বলল, ‘আরে, বাকিটা শুনবে তো। শাহনেওয়াজের ভুঁড়ি নিয়ে গল্পের কি শেষ আছে কোনো!’

‘বল্, শুনি।’ বুখারী ভাই তাচ্ছিল্যের ভাব দেখিয়ে বললেন।

হিরু বলতে শুরু করল, ‘শাহনেওয়াজ ছোটবেলা থেকেই একটা রসকষহীন ছেলে হিসেবে পরিচিত ছিল। কোনোকিছুর সাথেও ছিল না, পাছেও না। ডুবে যাওয়ার ভয়ে সাঁতার কাটা শেখেনি। পড়ে যাওয়ার ভয়ে মাঠে দৌড়ায়নি কখনো। ক্লাসে ফার্স্ট তো বটেই, কোনো কিছুইতেই কখনো ফার্স্ট হয়নি। তো, একবার ওদের ওখানের গ্রাম্যমেলায় একটা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হলো। কে বেশিক্ষণ হাঁসের মতো এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে। প্রথম তিনজনকে বাম্পার পুরস্কার দেওয়া হবে। শর্ত হলো, একটা পা তুলে রাখতে হবে। কোনো নড়াচড়া করা যাবে না। হাত দিয়েও কোনো কিছু ধরা যাবে না। তো, এ উপলক্ষে মোটামুটি উত্সবমুখর একটা পরিবেশের সৃষ্টি হলো। গ্রামের সকলেই এক পা উচিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। মজার ব্যাপার হলো, ওই প্রতিযোগিতায় ফার্স্ট হয়েছিল—বিশাল ভুঁড়িধারী ও এতক্ষণ ধরে আমাদের আলোচ্য ব্যক্তিত্ব শাহনেওয়াজ! অন্য কেউ দুই-তিন ঘণ্টার বেশি পারেনি। অন্যদিকে, বারো ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকার পরে স্বয়ং আয়োজকেরাই জোর করে ওকে দুই পায়ে দাঁড় করায়।’

‘অ্যাঁ!’ উপস্থিত সকলে বিস্মিত। একজন তো বলেই বসল, ‘অত বড় পেট নিয়ে এক পায়ে কিভাবে এতক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল?’

‘শাহনেওয়াজ এক পায়ে দাঁড়িয়ে তার ভুঁড়িটাকে একটা লাঠি দিয়ে ঠেস দিয়ে রেখেছিল, ব্যাস!’

‘এভাবে তো হবে না।’ অন্যরা এমনভাবে বিরোধিতা করল যেন প্রতিযোগিতাটা মাত্রই হলো!

হিরু বলল, ‘শাহনেওয়াজ কোনো নিয়ম ভঙ্গ করেনি। বরং নিয়মের মধ্যে থেকেই সে জীবনে প্রথমবারের মতো কোনো প্রতিযোগিতায় প্রথম হতে পেরেছিল। আর সেটা কেবল ওর স্পেশাল সম্পদ ওই ভুঁড়ির কারণেই সম্ভব হয়েছিল।’

কয়েক মিনিটের নীরবতা। বুখারী ভাই-ই পুনরায় আড়মোড়া ভাঙলেন। ‘তুমি যতই ভুঁড়ির গুণকীর্তন করো না কেন, হিরু, আমি জানি বেলা শেষে তুমিও আমার মতোই হতো চাও।’

হিরু কুটিল হাসি হেসে বলল, ‘কেমন? খেয়ে খেয়ে ভুঁড়িধারী?’

‘আমি বেশি খাই? আমি ভুঁড়িধারী?’ বুখারী ভাই অবাক হয়ে বললেন।

হিরু স্বাভাবিকভাবেই বলল, ‘তোমার নামের একেবারে মাঝখানেই ‘খা’ শব্দটা রয়েছে। আর ওটা বাদ দিয়ে দুই পাশের শব্দ দুটা নিলে দাঁড়ায়—বুরী, যা উচ্চারণে ‘ভুঁড়ি’ শোনায়। তার মানে তুমিও ভুঁড়িধারী, অর্থাত্ ‘বুরী’ নামধারী!’

বুখারী ভাই থ মেরে রাগে গজরাতে গজরাতে শেষমেশ উঠে চলেই গেলেন।

 

এর প্রায় তিন মাস পরে আবারও সেই তোতা চাকলাদারের চায়ের দোকানে বুখারী ভাইয়ের সঙ্গে হিরুর দেখা। গত তিন মাসে হিরু অনেক ওজন ঝড়িয়েছে। অন্যদিকে, বুখারী ভাই রীতিমতো একখানা ড্রাম সাইজের ভুঁড়ি নিয়ে বসে আছেন।

হিরুকে দেখে বুখারী ভাই পেটে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, ‘বুঝলে হিরু, ছোটবেলার সেই মোটু হওয়ার ইচ্ছেটা অবশেষে পূরণ হলো।’

পাছে হিরু কিছু বলে তাই কালবিলম্ব না করে উঠে চলে গেলেন তিনি।

হিরুর চ্যালারা অবাক। বুখারী ভাইয়ের এত্তবড় ভুঁড়ি! ওদের যেন বিশ্বাসই হচ্ছে না।

‘দেখলে তো!’ হিরুকে কেবল এটুকুই বলল ওরা।

হিরু মুচকি হেসে বলল, ‘কী, শাহনেওয়াজের ভুঁড়ি?’

‘হিরু ভাই, সত্যি করে বলো তো—এই শাহনেওয়াজটা কে? কই, আমরা কখনো তো তাকে দেখলাম না। আগে কখনো তার নামটাও শুনিনি।’

হিরু বুখারী ভাইয়ের চলে যাওয়ার পানে তাকিয়ে আনমনে বলল, ওই যে, ‘শাহনেওয়াজ ভাই তার ভুঁড়ি নিয়ে চলে যাচ্ছেন...!’   g